• ‘পুজোয় বউ ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে গেল আমার বন্ধুর সঙ্গে! রাতে ফিরলই না, কী করব?’
    হিন্দুস্তান টাইমস | ০৩ অক্টোবর ২০২২
  • এসব কথা কাউকে জানিয়ে পরামর্শ নিতে মোটেই ভালো লাগে না। কিন্তু অনেক কষ্ট নিয়ে লিখতে বাধ্য হচ্ছি।

    গত বছরের পুজোর সময়ের কথা। এর আগে বলে রাখা দরকার, আমাদের বিয়ের বিষয়টি। আমার বিয়ে হয়েছে ঠিক ১২ বছর হল। আমাদের একটি মেয়ে আছে। এখন মেয়ের বয়স ৯ বছর। আমার স্ত্রী আমার চেয়ে বয়সে অনেকটাই ছোট। এক সময় আমি ছিলাম ওর গৃহশিক্ষক। সেখান থেকেই আলাপ। তার পরে প্রেম। এবং শেষ পর্যন্ত বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে।

    আমার স্ত্রী বেশ দাপুটে। প্রেমের সময়ে তো বটেই, বিয়ের পরেও ওর হাতটুকু ধরতেও আমার ভয় লাগত। কোনও দিন জিজ্ঞাসা না করে ওর হাত ধরেছি বলে তো মনে পড়েনি। ওর কথাই আমাদের সম্পর্কের শেষ কথা। বাড়ির সব বিষয়ে সিদ্ধান্তও নেয় ও-ই। আমার কথার খুব একটা দাম নেই। আমি যে খুব কিছু বলতে যাই, এমনও নয়। বলার অর্থও নেই। কারণ আমার কথা শেষ পর্যন্ত টিকবেই না। তাই চুপচাপই থাকি।

    এভাবেই গত ১২টি বছর কেটে গিয়েছে। ময়ে বড় হয়েছে। আমার আ আমার স্ত্রীর মধ্যে যে বেশ ভালো রকমের শারীরিক সম্পর্ক আছে, এমনটাও বলা যাবে না। কারণ আমার স্ত্রী কখনও ইচ্ছা দেখান না। সত্যি বলতে, বেশ কয়েক বছর ধরেই আমাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্কের জায়গাটি প্রায় শূন্য হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তা নিয়ে আমার কোনও অভিযোগ নেই। আমি ভালোই আছি।

    আমি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি। চাকরি থেকে ফিরে নিজের মতো থাকি। কখনও বই পড়ি, কখনও টিভি দেখি, কখনও গান শুনি। রাতে দিব্যি ঘুমোই। তবে মেয়ের সঙ্গে অনেকটা সময় কাটাই।

    কিন্তু এবার একটা আপত্তির জায়গায় আসি। আমার স্ত্রীর সঙ্গে আমার বন্ধুদের সম্পর্ক খুব ভালো। মানে, যাঁরা আমার পুরুষ বন্ধু, তাঁদের কথা বলছি। আমার কোনও দিনই বিশেষ মহিলা বন্ধু নেই। কিন্তু পুরুষ বন্ধুর সংখ্যা অনেক। বাড়িতেও তাঁদের যাতায়াত আছে। আমার স্ত্রী তাঁদের অনেকেরই রীতিমতো ভালো বন্ধু হয়ে গিয়েছে। সামনাসামনি দেখা, আড্ডা তো আছেই, তার সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়াতেও যোগাযোগ আছে। শুধু তাই নয়, আমার বহু বন্ধুর সঙ্গে আমার হয়তো ফোনে কথা হয় না, কিন্তু আমার স্ত্রীর হয়। এর মধ্যে লুকোছাপার কিছু নেই। কারণ এই বিষয়গুলি আমার স্ত্রী আমার থেকে লুকোয় না।

    আমি এমনিতে খোলা মনের মানুষ। কারও স্ত্রী মানেই যে, তিনি আলাদা করে আর কারও সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না, এমন তো হতে পারে না। তাই আমি এই বিষয়গুলিতে কখনও বাধা দিইনি।

    আমার স্ত্রী একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। কাজের প্রয়োজনেই ওকে কলকাতার এদিক সেদিক করে বেড়াতে হয়। ওর থেকেই শুনেছি, আমার কোনও কোনও বন্ধুর সঙ্গে ওর মাঝে সাঝে দেখাও হত। ওরা রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে খাওয়াদাওয়াও করেছে। তা নিয়েও আমি কখনও কোনও কথা বলিনি। এটাও খুবই স্বাভাবিক মনে হয়েছে আমার কাচে।

    কিন্তু গত বছরের পুজোর সময়ে এমন একটি ঘটনা ঘটল, যা আমাকে রীতিমতো হতাশ করে দিল। আমি বুঝে উঠতে পারছি না, এর পরে কী করা উচিত।

    গত বছর পুজোর অষ্টমীর রাত। আমি নিজে খুব একটা ঠাকুর দেখতে যাই না। আমার স্ত্রীও যে ঠাকুর দেখতে যেতে খুব একটা আগ্রহী, এমনটা আগে কখনও মনে হয়নি। সেই সন্ধ্যায় হঠাৎ আমাদের বাড়িতে হাজির আমারই এক বাল্যবন্ধু। নাম করছি না, কিন্তু এই বন্ধুর আমদের বাড়িতে নিত্য যাতায়াত। আমার যে ক’জন বন্ধুর সঙ্গে আমার স্ত্রীর খুব ভালো বন্ধুত্ব, এই মানুষটি সেই দলেই।

    সেই বন্ধু বাড়িতে আসার পরে দাবি করল, আমরা যেন সবাই মিলে একসঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাই। কিন্তু আমার মোটেই বেরোনোর ইচ্ছা ছিল না। তাই আমি গোড়াতেই ‘না’ বলে দিলাম। আমাদের মেয়েও বলল, ওর বেরোতে ইচ্ছা করছে না। এর পরে আমি ভেবেছিলাম, আমার স্ত্রীও হয়তো বলবে, বেরোবে না। কিন্তু বিষয়টি তা হল না। প্রথমেই বলল, ওর বেরোনের ষোলো আনা ইচ্ছা আছে। তার পরে বলল, আর কেউ না গেলে ও আমার বন্ধুর সঙ্গে ঘুরে আসতে আগ্রহী। বিষয়টি যথেষ্ট হাসি মুখেই বলল।

    এর পরে আমাকে চমকে দিয়ে এক ঘণ্টার মধ্যে তৈরি হয়ে ওরা দু’জন সন্ধ্যায় বেরিয়ে গেল। এমনকী সেই রাতে আর বাড়িই ফিরল না। ফিরল পর দিন ভোরে। ফিরে আসা ইস্তকও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।

    আমি কোনও দিন এই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করিনি। প্রশ্ন করলেই কী না কী বলবে— সেই ভয়ে জিজ্ঞাসা করিনি। মনের মধ্যে অস্বস্তি নিয়েই একটা বছর কাটিয়ে দিয়েছি। এমন ভাব করে গিয়েছি, পুরোটাই আমার কাছে স্বাভাবিক। আমি একবারও বলছি না, আমার স্ত্রীর সঙ্গে ওই বন্ধুর প্রেম চলছে, বা অন্য কিছু। কিন্তু বিষয়টি মন থেকে মেনে নিতে পারিনি।

    এক বছর কেটে গিয়েছে। আবার একটা অষ্টমী। মনের মধ্যে অস্বস্তিটা এক ফোঁটা কমেনি। কী করা উচিত আমার?

    বিশেষজ্ঞের জবাব:

    সম্পর্কবিদ মৌমিতা গুপ্ত এই বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য:

    প্রথমেই বলা দরকার, আপনি বহু ক্ষেত্রে যে মুক্ত মনের পরিচ দিয়েছেন এবং আপনার স্ত্রীকে কোনও রকম সন্দেহ করেননি তা প্রশংসার্হ। এমন খোলা মনের মানুষ সত্যিই বিরল। কিন্তু আপনার কি পুরোটাই ঠিক? মোটেও তা নয়। কোনও মানুষই পুরোপুরি ঠিক বা ভুল হতে পারেন না। আসলে ঠিক বা ভুল বলে কিছু হয়ও না। এক এক জনের দৃষ্টিকোণ থেকে এক একটা জিনিস ঠিক বা ভুল হয়ে যায়।

    সে কথা যাক। আপাতত বলা যাক, আপনি আগাগোড়াই একটি ভুল করে গিয়েছেন। মানে, যেটি আপনার দৃষ্টিকোণ বা দৃষ্টিভঙ্গী থেকে দেখলে ভুল বলেই মনে হওয়া উচিত। কোনও কিছু নিয়ে আপনার আপত্তি থাকতেই পারে বা অস্বস্তি হতেই পারে। সেটি খোলাখুলি জানানো উচিত ছিল গোড়াতেই। সেটি না করাটাই আপনার বড় ভুল।

    আপনি লিখেছেন, আপনি চাকরি করেন। অফিস থেকে বাড়ি ফিরে নিজের জগতে ঢুকে পড়েন। কে বলতে পারেন, আপনার স্ত্রী হয়তো আপনার মধ্যে কখনও একজন বন্ধু বা সময় কাটানোর সঙ্গী খুঁজে ছিলেন। আপনি সেই বন্ধু না হয়ে ওঠায়, উনি হয়তো অন্যত্র বন্ধুত্ব খুঁজে নিয়েছেন।

    আপনার পুরুষ বন্ধুদের সঙ্গে আপনার স্ত্রীর ভালো বন্ধুত্ব আছেই বলেই যে, তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক আছে, এমনটা আপনি ভাবেননি। অন্তত তাই বলেছেন। এটিও ভালো ভাবনা। আপনাকে বলা উচিত, এক এক জন মানুষের বন্ধু খোঁজার ধরন এক এক রকমের হয়। অনেক পুরুষ আছেন, যাঁরা মহিলাদের মধ্যে বেশি ভালো বন্ধুর সন্ধান পান। তাঁরাও যে খুব প্রেমের জন্য মহিলাদের সঙ্গে মিশতে যান, এমনটি নাও হতে পারে। এটি মানসিকতার ধরনের কারণে হয়। আপনার স্ত্রীর ক্ষেত্রেও হয়তো তাই। পুরুষরা তাঁর বেশি ভালো বন্ধু হয়ে ওঠেন।

    এবার আসা যাক পুজোয় ঘুরতে যাওয়ার কথায়। এই বিষয়টি যে আপনার খারাপ লেগেছে, সেটি আপনার পরের দিনই ভালো করে বুঝিয়ে বলা উচিত ছিল। আপনার কথা শুনে মনে হয়েছে, আপনার স্ত্রী যেমন স্বাধীনচেতা মানসিকতার এবং আপনি যেভাবে বিশ্বাস করে তাঁকে সেই স্বাধীনতা দিয়েছেন, তাতে বিষয়টি তাঁর কাছে খুব একটা অস্বাভাবিক লাগেনি। বরং বিষয়টি এমনই হওয়া উচিত— এটাই হয়তো তিনি ভেবে নিয়েছেন। তাই আপনার খারাপ লাগার কথাটা এখনই জানানো উচিত। বুঝিয়ে বলা উচিত, কেন এক বছর ধরে আপনি এই প্রসঙ্গটি তোলেননি।

    শেষে বলব, স্ত্রী-প্রেমিকা-প্রেমিক-বর, এমনকী খুব ভালো বন্ধুর হাত ধরতেও অনুমতি নিতে হয় না। বরং অনুমতি নেওয়াটাই অদ্ভুত এবং কিছু ক্ষেত্রে তা উলটো দিকের মানুষটির জন্য অস্বস্তিকর।

    তাই একটাই পরামর্শ দেব। বিয়ের ১২ বছর পরে আপনার আর স্ত্রীর থেকে অনুমতি নেওয়ার নেই, তাঁকে কাছে টেনে নেওয়ার আছে। সেটি করুন। সমস্যা অনেক কমে যাবে। কেটে যাবে সব অস্বস্তি।
  • Link to this news (হিন্দুস্তান টাইমস)