• প্রশাসন, সিস্টেমের সঙ্গে ঠোকাঠুকি লাগতেই পারে, এই অন্তর্ঘাতেই তো আমরা বেঁচে আছি: অনির্বাণ
    আনন্দবাজার | ১০ মার্চ ২০২৬
  • শেষ তাঁকে দেখা গিয়েছে ‘রঘুডাকাত’ ছবিতে। তার পর থেকে আলোচনায় বার বার উঠে এসেছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য। কিন্তু ফের কবে ছবিতে ফিরবেন, তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা। অভিনেতাকে প্রশ্ন করা হলেও, প্রতি বারের মতো এ বার তাঁর উত্তর, “আমার কোনও ধারণা নেই।” তবে ছবির পর্দায় না থাকলেও, মঞ্চে আছেন তিনি। মঞ্চের ‘হুলিগানইজ়‌্‌ম’-এর জন্য কি আরও ছবির সঙ্গে বাড়ছে দূরত্ব? আনন্দবাজার ডট কম-কে কী জানালেন অনির্বাণ?

    সম্প্রতি কলামন্দিরে হয়ে গেল ‘হুলিগানইজ়‌্‌ম’-এর অনুষ্ঠান। গত বছর তাঁর গান-মঞ্চে রাজনীতির জগতের তিন ‘ঘোষ’-এর উল্লেখ থাকায় বিতর্কে জড়িয়েছিলেন অনির্বাণ। সম্প্রতি অনুষ্ঠানেও গানের মাধ্যমে নানা সামাজিক বিষয় নিয়ে ‘ব্যঙ্গ’ উঠে আসে। গানের মাধ্যমে চাঁচাছোলা বক্তব্যের প্রভাবের কারণেও কি অভিনেতা অনির্বাণ কোণঠাসা? তাঁর বক্তব্য, “আমি মনে করি না, ‘হুলিগানইজ়‌্‌ম’-এর জন্য কোনও সংঘাত তৈরি হয় আমার অভিনয়ে।” পাল্টা প্রশ্ন করেন, “আমরা বিতর্কিত বার্তা রাখি বলেই কি এই প্রশ্ন উঠছে?” তার পর নিজেই বলেন, “আমি মূলত আগে একজন অভিনেতা। অন্তর থেকে অভিনেতা হিসাবেই নিজেকে মানি। আমি অভিনয় করতে পারছি না, সেটা অন্য ব্যাপার। সে দ্বন্দ্ব অন্য জায়গায়। সে কথার পুনরাবৃত্তি আর করতে চাই না। আমার দর্শক বা শ্রোতা কখনওই ‘হুলিগানইজ়‌্‌ম’ ও অভিনয়ের মধ্যে কোনও সংঘাত দেখেন না।”

    ‘হুলিগানইজ়‌্‌ম’-এর গানে ‘বিতর্কিত’ বার্তার সঙ্গে অভিনয়ের সংঘাত নেই বলেই মানেন অনির্বাণ। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে একটি গানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘এ পরবাসে’ গানের সঙ্গে তাঁরা মিলিয়েছেন তাঁদেরই একটি গান, যেখানে ‘মস্তি’ করার প্রসঙ্গ ঘুরে ফিরে আসে। আর একটি গান ‘সংস্কৃতির হাঁড়ি ফেটে যাবে’-তে ব্যবহার করা হয়েছে ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে’ ও ‘আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে’র সুর। এতে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হতে পারে, এমন আশঙ্কা ছিল না? প্রশ্ন করতেই অনির্বাণের বক্তব্য, “এগুলো তো আমাদেরই সংস্কৃতি। রবীন্দ্রনাথের গান, সেখান থেকে আমরা আমাদের র‌্যাপে চলে যাচ্ছি। আসলে সবটাই একটা কিছু বলার চেষ্টা। সংস্কৃতি স্থির বা স্থবির নয়। পাথরের মতো রয়ে গিয়েছে, এমন নয়। যুগের পর যুগ ধরে মানুষ সেটা নিয়ে চর্চা করে চলেছেন। সেই সময়টাকে ছেঁকে নিয়ে একটু দেখে নেওয়া, একটু ঠাট্টা করা বা একটু ফিরে দেখা, বা মজা করা, এটুকুই।”

    এই মজা আসলে নিজেদের নিয়েই করা, জানান অনির্বাণ। তাঁর কথায়, “রবীন্দ্রসঙ্গীত কাদের ঐতিহ্য? আমাদেরই তো! অর্থাৎ এই এক্সপেরিমেন্ট তো আমাদের নিজেদের নিয়েই। দেবরাজ যখন রবীন্দ্রসঙ্গীতের অংশটুকু গেয়েছে, একেবারে রবীন্দ্রসঙ্গীতের মতোই কিন্তু গেয়েছে। সেটাকে কিন্তু ব্যঙ্গ করা হয়নি। দুটো সঙ্গীতের মধ্যে আদানপ্রদান দেখানো হয়েছে। তবে সেই আদানপ্রদান সুখকর না কি অস্বস্তির, তা দর্শক-শ্রোতা বুঝবেন।”

    পছন্দ না হলে সমালোচনা হবে, প্রতিক্রিয়া আসবে। তা নিয়ে অসুবিধা নেই বলে জানান অভিনেতা তথা গায়ক। গত ১০ বছরের অভিনয়জীবনে ‘ট্রোলড’ হওয়ার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন বলেও জানান তিনি। অনির্বাণের কথায়, “দীর্ঘ দিন হয়ে গেল বিনোদনজগতে। তাই ট্রোল বা কটাক্ষ এ সব ভয় পেলে আর চলবে না। তা হলে হয়তো বাড়ি থেকেই বেরোনো যাবে না।”

    এই প্রসঙ্গেই ‘হুলিগানইজ়্‌ম’-এর তৈরি ভাবমূর্তি নিয়েও কথা বলেন অনির্বাণ। ‘হুলিগানইজ়্‌ম’ শুধুই ‘বিপ্লব’ করে। এমন একটা ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে, বিশ্বাস করেন অনির্বাণও। তবে তিনি মনে করেন, এই ধারণা বদলাতে হবে। অভিনেতার স্বীকারোক্তি, “‘মেলার গান’ আসলে ‘হুলিগানইজ়্‌ম’কে ছাপিয়ে গিয়েছিল। এর পরে সেই ভাইরাল ক্লিপ। তিন ঘোষকে নিয়ে করা গান। সেখান থেকে আমাদের পরিচয় হল, ‘আরে বাবা! মঞ্চে উঠে নেতাদের নাম বলে দিচ্ছে। খিল্লি করে দিচ্ছে। তার মানে এরা নিশ্চয়ই বিপ্লবী বা প্রতিবাদী।’ এই ধারণাগুলো টপকে টপকে আমাদের চলতে হচ্ছে। আমরা আসলে চাই, নানা রকমের কথা ও গান দর্শকশ্রোতার কাছে পৌঁছোক। কিন্তু নিজেদের জন্যই কিছু ‘তকমা’ তৈরি হচ্ছে। আবার নিজেদেরই সেই ‘তকমা’ ভাঙতে হচ্ছে।”

    অনির্বাণ আগেও জানিয়েছেন, তাঁদের ব্যান্ডের উদ্দেশ্য অন্তর্ঘাত আনা। সিস্টেমের মধ্যে থেকে এখনও সেটাই করছেন তাঁরা। কিন্তু সিস্টেমের মধ্যে থেকে কি তা সম্ভব? অভিনেতার উত্তর, “আমরা জানি, সিস্টেম আমরা বদলাতে পারব না। কেউই পারবে না। দেশে, রাজ্যে, পৃথিবীতে নেতামন্ত্রীরা যে খেল দেখাচ্ছেন! আমরাও তো অমর নই। সিস্টেম বদলানো তাই আমাদের কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। সিস্টেম বদলানোর স্বপ্নও আর দেখি না। কোনও দিন বদলাবে, এই আশাও আর করি না।”

    কিন্তু তা-ও এখনও অন্তর্ঘাতের স্বপ্ন দেখেন অনির্বাণ ও ‘হুলিগানইজ়ম’। অভিনেতার কথায়, “এই অন্তর্ঘাত বা ঠোকাঠুকিটা নিজেদের সঙ্গে নিজেদের। অথবা সিস্টেম, প্রশাসন, ব্যবস্থা বা সমাজের সঙ্গেও এই ঠোকাঠুকি লাগতে পারে। এই অন্তর্ঘাতেই আমাদের অস্তিত্ব জীবিত থাকবে। এখানেই আমাদের বেঁচে থাকা। না হলে আর কী লাভ রইল?”
  • Link to this news (আনন্দবাজার)