• ফর্ম ৬ ঢুকছে, মানলেন মনোজ! ভিন্‌রাজ্যবাসীদের নাম তোলার চক্রান্ত হচ্ছে, জ্ঞানেশকে মমতার চিঠি, সিইও অফিস ঘিরে ধুন্ধুমার
    আনন্দবাজার | ০১ এপ্রিল ২০২৬
  • ফর্ম ৬ জমা করে পশ্চিমবঙ্গের তালিকায় ভিন্‌রাজ্যের ভোটারদেরঢোকাচ্ছে বিজেপি— তৃণমূলের নতুন অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। অভিযোগ,রাজ্যের নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতরে বস্তা বস্তা ফর্ম ৬ আসছে!

    সোমবার সিইওঅফিসে গিয়ে একই অভিযোগ জানিয়েছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেকবন্দ্যোপাধ্যায়। অনেকের মনে প্রশ্ন উঠেছিল, সত্যিই কি সিইও অফিসে ফর্ম ৬ ঢুকছে?মঙ্গলবার রাজ্যের সিইও মনোজ আগরওয়াল জানান, অনেক নথিই সিইও দফতরে আসে। তার মধ্যেফর্ম ৬-ও রয়েছে। তবে তিনি নিয়ম দেখিয়ে আশ্বস্ত করেছেন, ফর্ম ৬ জমা করলে কোন কোনভোটারের নাম উঠবে, কাদের উঠবে না।

    পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এখন ফর্ম ৬ নিয়ে সরগরম। সোমবার সিইওঅফিস থেকে বেরিয়ে অভিষেক অভিযোগ করেছিলেন নিজেদের ভোট সুরক্ষিত করতে বাইরের ভোটারদেরপশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় ঠাঁই দেওয়ার চেষ্টা করছে বিজেপি। সে জন্যই সোমবারবস্তাভর্তি ফর্ম ৬ নিয়ে সিইও দফতরে জমা দিয়ে গিয়েছেন কয়েক জন। মঙ্গলবারও একইঅভিযোগ তোলা হয় তৃণমূলের তরফে। ফর্ম ৬ ‘চালান’-এর অভিযোগে ধুন্ধুমার পরিস্থিতি তৈরি হয় সিইও অফিসের বাইরে। তৃণমূলপন্থী বিএলও-দের অভিযোগ, এক যুবক ব্যাগভর্তি ফর্ম৬ নিয়ে সিইও অফিসে এসেছেন। এ সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে সিইও জানান, প্রার্থীদেরমনোনয়নপত্র জমার শেষ তারিখের ১০ দিন আগে পর্যন্ত যা ফর্ম জমা পড়বে, তা যদিনিষ্পত্তি হয়ে যোগ্য বিবেচিত হয়, তবে ভোটার তালিকায় জায়গা পাবে। এবং তারা এ বারেরবিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন।

    মনোজের ব্যাখ্যা

    সিইও অফিসে ফর্ম ৬ আসছে, তা একপ্রকার মেনে নিয়েছেন মনোজ।তিনি বলেন, ‘‘এটা সরকারি অফিস। এখানে রোজ অনেকেই অনেক কিছু জমা দেন। অনেকে ইমেলকরেন। আমাদের অফিসে একটি নির্দিষ্ট দফতর রয়েছে, যেখানে ওই সব নথি জমা করা হয়। তারমধ্যে ফর্ম ৬ থাকতেই পারে।’’ তিনি বুঝিয়ে দেন, সিইও অফিসে ফর্ম ৬ জমা করা যেতেইপারে। তবে তা যাচাই করার পরেই যোগ্যদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মনোজস্পষ্ট জানান, নতুন ভোটারের নাম তালিকায় তোলার কাজ সিইও অফিস করে না। দায়িত্ব থাকেইআরও-দের উপর।

    পশ্চিমবঙ্গে দু’দফায় ভোটগ্রহণ হবে। রাজ্যে প্রথম দফার ভোটহবে আগামী ২৩ এপ্রিল। দ্বিতীয় দফায় ভোট হবে ২৯ এপ্রিল। প্রথম দফার ভোটে প্রার্থীদেরমনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ৬ এপ্রিল। দ্বিতীয় দফার ৯ এপ্রিল। সিইও জানিয়েছেন, প্রথমদফায় নতুন ভোটারদের জন্য ২৭ মার্চ পর্যন্ত জমা পড়া ফর্ম ৬ গৃহীত হবে। আর দ্বিতীয়দফার ক্ষেত্রে ৩০ মার্চ। অর্থাৎ, প্রথম দফায় যেখানে ভোট হবে, সেই সব জায়গার কেউযদি ২৭ তারিখ বা তার আগে ফর্ম ৬ পূরণ করে নতুন নাম তোলার আবেদন করেন, তবেই সেইফর্ম বিবেচিত হবে। আর দ্বিতীয় দফার ক্ষেত্রে সেটা ৩০ মার্চ। তার পরে কোনও ফর্ম জমাপড়লে, তা এখনও বিবেচনা করা হবে না। অর্থাৎ, তাঁদের তথ্য নিষ্পত্তি হবে না, নামওউঠবে না ভোটার তালিকায়।

    তবে সিইও বার বার স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ফর্ম ৬ জমা করলেইকারও ভোটার তালিকায় নাম উঠবে, তার কোনও অর্থ নেই। ফর্ম জমা পড়ার পরে তা খতিয়েদেখবেন সংশ্লিষ্ট ইআরও। পরিদর্শন করে নথি যাচাই করবেন। যোগ্য হলে তবেই নাম উঠবেভোটার তালিকায়।

    তৃণমূলের প্রশ্ন ও হুঁশিয়ারি

    তৃণমূল মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী বলেন, ‘‘তৃণমূল ৬ নম্বর ফর্ম নিয়ে সিইও দফতরের ভিডিয়ো প্রকাশ্যে এনেছে বলে আজকে নির্বাচন কমিশন তারিখের কথা বলছে। এত দিনে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে কমিশন বিজেপির দালালের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। কে গ্যারান্টি দেবে যে, পুরনো তারিখে নতুন ফর্ম ঢোকাবে না?’’ এ প্রসঙ্গেই অরূপ উত্থাপন করেন নোয়াপাড়া বিধানসভার একটি ঘটনা। নোয়াপাড়ার বিজেপির বিএলএ-১ নিজের প্যাডে চিঠি লিখে কয়েকশো ৬ নম্বর ফর্ম পাঠিয়েছেন বলে অভিযোগ। তা পাঠানো হয়েছে সোমবারের তারিখে। অরূপের প্রশ্ন, ‘‘শেষ মুহূর্তে কী এমন হল যে, তড়িঘড়ি ফর্ম জমা দিতে হচ্ছে। এ ব্যাপারে সিইওর দফতরকেই খোলসা করতে হবে। আর যদি বাইরের ভোটার ঢোকে, তা হলে গণ প্রতিরোধের মুখে পড়তে হবে।’’

    সিইও অফিসের বাইরে ধুন্ধুমার

    মঙ্গলবার বেলার দিকে আচমকাই স্ট্র্যান্ড রোডে নতুন সিইও অফিসেরসামনে হাজির হন তৃণমূলপন্থী বেশ কয়েক জন বিএলও। তাঁদের অভিযোগ, একযুবক নাকি ব্যাগভর্তি ফর্ম ৬ নিয়ে সিইও অফিসে জমা দিতে এসেছিলেন! তিনি পূর্বমেদিনীপুরের বাসিন্দা। তাঁকে ধরে তৃণমূলপন্থী বিএলও-রা টানাটানি শুরু করেন।ক্যামেরায় ধরা পড়েছে, এক যুবক একতাড়া কাগজ নিয়ে সিইও অফিসেঢুকছেন। সিইও অফিসে ফর্ম ৬ জমা করার অভিযোগকে ঘিরে যখন তৃণমূলপন্থী বিএলও-রাবিক্ষোভ শুরু করেন, তখন হঠাৎই সেখানে উপস্থিত হন বিজেপিকর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ, এক বিজেপি কর্মীকে মারধর করা হয়েছে।সেই অভিযোগকে কেন্দ্র করে পাল্টা বিক্ষোভ শুরু করে বিজেপি।

    সময় যত গড়ায় উত্তেজনা ততই বাড়তে থাকে। দু’পক্ষেরবিক্ষোভের মাঝে ‘ঢাল’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী। ব্যারিকেড করেদেওয়া হয়, যাতে কোনও পক্ষই একে অপরের দিকে না-যেতে পারে। একই সঙ্গে বিক্ষোভ তুলেনেওয়ার আবেদনও করা হয়। তবে পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হতে থাকে। স্লোগান, পাল্টাস্লোগানে তপ্ত হয়ে ওঠে সিইও অফিসের সামনের রাস্তা। অভিযোগ, অবস্থান বিক্ষোভেরমধ্যেই কেউ কেউ পুলিশের দেওয়া গার্ডরেল টপকানোর চেষ্টা করেন। পুলিশ তাঁদের আটকেদেয়। পরে বিজেপির তরফে অভিযোগ করা হয়, তারা যেখানে বিক্ষোভদেখাচ্ছিল, সে দিক থেকে একদল তৃণমূল কর্মী হাতে দলীয় পতাকানিয়ে চড়াও হন। সিইও অফিসের সামনে থাকা বিজেপি কর্মীদের মারধর করা হয় বলে অভিযোগ।পাল্টা একই অভিযোগ শোনা যায় তৃণমূলের তরফেও। শেষে ভিড় সরাতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে।তৃণমূলের তরফে পরে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযোগে তারা জানায়, বেআইনি ভাবেবিজেপির কর্মী-সমর্থকেরা সিইও অফিসে ফর্ম ৬ জমা দিয়েছেন। তৃণমূল এ সংক্রান্ত কিছুছবিও পোস্ট করেন সমাজমাধ্যমে।

    তবে সিইও মনোজ সন্ধ্যার সাংবাদিক বৈঠকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন,মঙ্গলবার থেকে জমা পড়া ফর্ম ৬ আসন্ন বিধানসভা ভোটে বিবেচনা হবে না।

    জ্ঞানেশকে মমতার পত্রাঘাত

    মঙ্গলবার আবার দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশকুমারকে চিঠি লেখেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই চিঠির মোদ্দাকথা ছিল ফর্ম ৬ নিয়ে অভিযোগ। চিঠিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের উদ্দেশে মমতা লেখেন, ‘বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে খবর পাওয়া গিয়েছে যে, সিইও অফিস(রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের কার্যালয়) এবং বিভিন্ন জেলায় প্রচুর সংখ্যায়ফর্ম-৬ জমা দিচ্ছেন বিজেপির এজেন্টরা। এটা ভোটার তালিকায় নাম তোলার রুটিনপ্রক্রিয়া বলে মনে হচ্ছে না। বরং রাজ্যের বাসিন্দা নন, এমনমানুষদের নাম ভোটার তালিকায় ঢোকানোর অপচেষ্টা করা হচ্ছে।’ মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য,পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা নন এবং রাজ্যের সঙ্গে কোনও রকম সম্পর্ক নেই,এমন মানুষদের নাম ভোটার তালিকায় ঢোকানোর চেষ্টা চলছে। একই ধরনের কাজবিহার, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র এবংদিল্লির নির্বাচনেও হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করেন তৃণমূলনেত্রী।

    শুধু চিঠিতে নয়, মঙ্গলবার পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনারজনসভা থেকেও একই অভিযোগ করেন মমতা। বিজেপি এবং কমিশনকে নিশানা করে তিনি বলেন, “এত লোকের নাম বাদ গিয়েছে, সেই নামগুলো এখনও তোলা হল না। আর নতুন করে বিহার,রাজস্থান, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশথেকে নাম এনে ঢোকাচ্ছে।”ওই সভায় তিনি এ-ও বলেন যে, “লক্ষ রাখুন কোথায় কী হচ্ছে। আমরাপ্রমাণ করে দিয়েছি বস্তা বস্তা কাগজ জমা পড়েছে। কালকেও নির্বাচন কমিশনে ৩০ হাজারনাম জমা দিয়েছে। তারা বাংলার কেউ নয়। কেন দিয়েছে? কারণ ওরাবাংলাকে বধ করতে চায়।” একই অভিযোগ তুলে মঙ্গলবারও সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেন অভিষেক।

    অভিষেকের সিইও অভিযান

    সোমবার সন্ধ্যায় রাজ্যের সিইও কার্যালয়ে অভিষেক যান। সিইও দফতরেঢোকার সময়ে জানিয়ে যান, বড় চুরি ধরা পড়েছে। বেশ কিছু ক্ষণ পরবেরিয়ে আসেন তিনি। তার পর সিইও দফতরের বাইরের সাংবাদিক বৈঠক করে কমিশনের বিরুদ্ধেঅভিযোগের পর অভিযোগ করেন। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের অভিযোগ, নিজেদের ভোট সুরক্ষিত করতে বাইরের ভোটারদের পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায়ঠাঁই দেওয়ার চেষ্টা করছে বিজেপি। সিইও মনোজকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি বলেন সিইওঅফিসের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ প্রকাশ করতে। তবে সোমবার সিইও দফতরের তরফে জানানো হয়,পুরনো অফিসের কাগজপত্র বস্তায় করে আসছে নতুন অফিসে। তবে সিইও অফিসে ফর্ম ৬ ঢোকারবিষয়টা মঙ্গলবার একপ্রকার মেনে নেন মনোজ।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)