• হাসপাতালের আগে রাহুলকে ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার তত্ত্ব খারিজ
    আনন্দবাজার | ০৩ এপ্রিল ২০২৬
  • তলিয়ে যাওয়ার কতক্ষণ পরে অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্ধার করা হয়েছিল? তার পরে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেরিই বা হয়েছিল কেন? তালসারিতে ধারাবাহিকের শুটিং করতে গিয়ে অভিনেতার মৃত্যুর ঘটনায় এই প্রশ্নগুলি ঘুরছে। এ নিয়ে নতুন করে রহস্য তৈরি হয়েছে প্রযোজনা সংস্থা ‘ম্যাজিক মোমেন্টস মোশন পিকচার্স’-এর বুধবারের বিবৃতিতে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, রাহুলকে উদ্ধারের পরে একটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তখন তিনি বেঁচে ছিলেন। কিন্তু ওই ক্লিনিকে তখন কোনও চিকিৎসক ছিলেন না। দিঘা মোহনা থানার পুলিশ বৃহস্পতিবার দাবি করে, তালসারির ওই অংশে এমন কোনও ক্লিনিকই নেই। তা হলে এই দাবি করা হল কেন, উঠেছে সে প্রশ্নও।

    সূত্রের খবর, এ দিন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ‍্যায়ের বাড়ি গিয়েছিলেন রাহুলের স্ত্রী অভিনেত্রী প্রিয়ঙ্কা সরকার। সেখানে তাঁরা আগামী পদক্ষেপ কী হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে খবর।

    তদন্তের তথ্যানুসারে, বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে রাহুল এবং তাঁর সহ-অভিনেত্রী শ্বেতা মিশ্র তলিয়ে যাচ্ছেন বলে বোঝা যায়। অভিনেতাকে দিঘা স্টেট জেনারেল হাসপাতালে সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে নিয়ে যাওয়া হয় বলে পুলিশের কাছে দাবি দিঘা হাসপাতালের সুপারের। মাঝের এক ঘণ্টা কী ঘটেছিল, তারই তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ। তাতে তদন্তকারীদের অন্যতম সম্বল ড্রোনে তোলা একটি ফুটেজ। সেটিতেই তলিয়ে যাওয়ার এবং উদ্ধার শুরুর কিছু ফুটেজ ধরা পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান থেকে পুলিশ প্রাথমিক ভাবে নিশ্চিত, বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত রাহুলের উদ্ধারকাজ শুরু হয়নি। তাঁকে উদ্ধার করা ভগীরথ জেনা পুলিশকে জানান, নৌকো নিয়ে প্রথমে রাহুলের সহ-অভিনেত্রীর দিকে দড়ি ফেলেন তিনি। তাঁকে উদ্ধারের পরে রাহুলের খোঁজ শুরু হয়। তাঁকে পেয়ে, টেনে নৌকায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয় জেটিতে। সেখান থেকে গাড়িতে হাসপাতালে পাঠানো হয় রাহুলকে।

    পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে, তালসারি থেকে মেরিন ড্রাইভ দিয়ে উদয়পুর, তার পরে মূল রাস্তা ধরে দিঘার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় রাহুলকে। কিন্তু পুলিশেরই হিসেব, তালসারি থেকে ওই পথে দিঘার হাসপাতালে পৌঁছতে মিনিট কুড়ির বেশি লাগার কথা নয়। তা হলে এত বেশি সময় লাগল কেন? এর মধ্যেই প্রযোজনা সংস্থার তরফে স্থানীয় ক্লিনিকে রাহুলকে নিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে পুলিশের দাবি, তালসারি থেকে উদয়পুর পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভে কোনও ক্লিনিক নেই। ওড়িশার তালসারির ওই অংশের সবচেয়ে কাছে রয়েছে বাড় বড়িশা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। সেই সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি বিকেল ৪টে পর্যন্ত খোলা থাকে। তার পরে কিছু হলে এলাকার ভরসা দিঘার হাসপাতাল। ফলে, প্রযোজক সংস্থার দাবি নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে।

    এক পুলিশ অফিসারের মন্তব্য, ‘‘কেন হাসপাতালের আগে ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে, তা-ও তদন্ত করে দেখা হবে।’’ এখনও পর্যন্ত ১০ জনের বেশি প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান রেকর্ড করেছে পুলিশ। দিঘা মোহনা থানা সূত্রে খবর, তাঁরা সকলেই পুলিশকে জানিয়েছেন, রাহুল এবং শ্বেতা মিশ্র দু’জনেই সমুদ্রে পড়ে গিয়েছিলেন। তবে রবিবার বিকেলের ওই ঘটনার পর দিনই তমলুক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রাহুলের দেহের ময়না তদন্ত হলেও রাত পর্যন্ত তার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পুলিশ পায়নি।

    পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার অংশুমান সাহা এ দিন বলেন, ‘‘অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্তে যা-যা করা দরকার, সবই হয়ে গিয়েছে। তবে রাহুলের পরিবারে তরফে লিখিত অভিযোগ করা হয়নি। ময়না তদন্তের রিপোর্ট হাতে পেলে যদি সে রকম কিছু জানা যায়, তা হলে সেই মতো পদক্ষেপ করা হবে।’’

    এ দিকে রাহুলের মৃত্যুর বিচার চেয়ে টালিগঞ্জ পাড়া পথে নামার ডাক দিয়েছে। শনিবার টেকনিশিয়ানস স্টুডিয়ো থেকে রাধা স্টুডিয়ো পর্যন্ত হাঁটার কথা ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক-অভিনেতাদের। ইম্পা, ফেডারেশন, আর্টিস্ট ফোরাম, ধারাবাহিকের প্রযোজক সংগঠনকে এ নিয়ে চিঠিও দিয়েছেন ইন্ডাস্ট্রির একাংশ। সেই চিঠিতে সই রয়েছে যিশু সেনগুপ্ত, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, স্বরূপ বিশ্বাস, কৌশিক সেন, শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়, শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের। এই পদযাত্রা থেকে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং ক্ষতিপূরণেরও দাবি করা হবে। ওই দিন তিন ঘণ্টা শুটিং বন্ধ রাখারও দাবি জানানো হয়েছে।

    যদিও রাহুলের পরিবার বা আর্টিস্ট ফোরাম থেকে পুলিশি তদন্তের দাবি জানানো হয়নি। আর্টিস্ট ফোরাম বুধবার যে বিবৃতি প্রকাশ করেছিল, সেখানেও পুলিশি তদন্ত প্রসঙ্গে কিছুই বলা হয়নি বলে ক্ষুব্ধ ইন্ডাস্ট্রির একাংশ। শুধু প্রযোজনা সংস্থার কাছ থেকে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দাবি করা হয়েছে ওই বিবৃতিতে। বিষয়টি ‘লঘু করে দেখানো’র জন্য সমালোচিত হয়েছে আর্টিস্ট ফোরাম। প্রযোজক রানা সরকার বলেন, “এটা একটা দায়সারা বিবৃতি।” পরিচালক-অভিনেতা জয়দীপ মুখোপাধ্যায় সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আর্টিস্ট ফোরামের বিবৃতি দেখে মনে হচ্ছে, কেউ সত্যিটা সামনে আনতে চাইছেন না। সবাই গা বাঁচাতে তৎপর’। সুদীপা চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘রাহুলকে শ্রদ্ধা আর সমবেদনা জানানোর নামে গা বাঁচিয়ে চলার স্বভাবটা এ বার ছাড়ুন...’।

    এর মধ্যেই আর্টিস্ট ফোরামের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ বৃদ্ধি পেয়েছে তারা ‘জাস্টিস ফর রাহুল’ মিছিলে যোগদান সম্পর্কে বিবৃতি দেওয়ায়। তাতে বলা হয়েছে, ওই মিছিলে তাদের সরকারি ভাবে অংশগ্রহণ করতে আহ্বান জানানো হয়নি। লেখা হয়েছে, ‘আমরা সংগঠক হিসাবে এই মিছিলের আহ্বায়কও নই, অংশগ্রহণকারীও নই’। কোনও অভিনেতা ব্যক্তিগত ভাবে যেতে চাইলে আপত্তি নেই। ইন্ডাস্ট্রির একতা নিয়ে যে প্রশ্ন ওঠে, এই মৃত্যুর ঘটনাতেও তা আরও একবার সামনে চলে এল বলে মনে করছেন অনেকেই।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)