মানবমুক্তির জন্য জিশুখ্রিস্টের আত্মবলিদানের স্মরণে পালিত হয় গুড ফ্রাইডে। তবে তার পরে আসা ইস্টার সানডে-তে জিশুর মৃত্যুঞ্জয়ী পুনরুত্থান এই বার্তাই দেয়, মৃত্যু মানেই শেষ নয়, বরং তা অনন্ত এক জীবনের প্রবেশদ্বার। শোকের কুয়াশা সরিয়ে এই জেগে ওঠাই এই দর্শনের মূল স্পন্দন। মূলত এই পুনরুত্থানের বিশ্বাস থেকেই চার্চের দেওয়ালে বা মেঝেতে খোদাই করা হয় গতায়ুদের স্মৃতিফলক। কলকাতার প্রাচীন গির্জাগুলিও এই রীতি বহন করে চলেছে। যেমন, সেন্ট অ্যান্ড্রু’জ় চার্চে চোখে পড়ে ঔপনিবেশিক আমলের স্কটিশ আধিকারিকদের স্মৃতিফলক। সেন্ট পল’স ক্যাথিড্রালের দেওয়ালে দেখা যায় ১৮৫৭-র অভ্যুত্থান ও বিশ্বযুদ্ধের সময় হারিয়ে যাওয়া মানুষের স্মৃতিলেখ। এই প্রেক্ষিতে সেন্ট জন’স চার্চের দেওয়ালকে শিল্প ও ইতিহাসের ‘ক্লাসরুম’ বললেও অত্যুক্তি হয় না।
এই গির্জার উত্তর-পশ্চিম দেওয়ালে বিশ্বযুদ্ধের কিছু ফলক রয়েছে, যেগুলি আগে ময়দানের ‘গ্লোরিয়াস ডেড’ সেনোটাফের উপর রাখা ছিল। সুরক্ষাজনিত কারণে পরে এগুলি এখানে স্থানান্তরিত করা হয়। দক্ষিণের দেওয়ালে রয়েছে জেমস অ্যাকিলিস কার্কপ্যাট্রিকের স্মৃতিফলক। মাত্র ৪১ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া কাটানো এই মানুষটিকে সমাহিত করা হয়েছিল শহরের নর্থ পার্ক স্ট্রিট সেমেটরিতে। সেই সমাধিস্থল কবেই অতীত, এখন শুধু রয়ে গেছে ‘হোয়াইট মুঘল’ হিসেবে পরিচিত মানুষটির স্মৃতি— এক ভারতীয় নারীকে ভালবেসে যিনি এ দেশেই সংসার পেতেছিলেন। ইতিহাসের গন্ধ ছাড়াও, ফলকটি (উপরে ডান দিকে) উল্লেখ্য তার সৌন্দর্যের জন্যও।
ভারতীয় সংস্কৃতি যে ঔপনিবেশিক শাসকদের জীবনশৈলী নানা ভাবে প্রভাবিত করেছিল, এই গির্জার আরও কিছু স্মৃতিফলকে সেই ছাপ স্পষ্ট। আলেকজ়ান্ডার কলভিনের স্মৃতিফলকে শাড়ি পরিহিতা, শোকাতুরা এক এদেশীয় মহিলার উপস্থিতির সঙ্গে কলসি ও মাদুরের মতো নিত্যব্যবহার্য বস্তুর চিত্রায়ণ সেই প্রভাবই তুলে ধরে। জর্জ ক্রুটেনডেনের স্মৃতিফলকেও মেলে এক ভারতীয় পরিবার ও প্রকৃতির ছবি (উপরের প্রথম দু’টি ছবি)। ইতিহাস-অনুসন্ধিৎসুদের নজর কাড়বেই।
এই গির্জার আরও এক দ্রষ্টব্য চোখে পড়ে না অনেকেরই। সারা শহরের মধ্যে সম্ভবত একমাত্র এই গির্জার বেদির নিচেই সমাহিত এক বিখ্যাত মানুষ। ১৮২২ সালে কলকাতার তৎকালীন বিশপ টমাস ফ্যানশ’ মিডলটন মারা যাওয়ার পর, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে এই গির্জার বেদির নীচে সমাহিত করা হয়। সেই সমাধিটি চিহ্নিত কালো পাথরের একটি ফলকে, যেখানে তাঁর নামের আদ্যক্ষর ‘টি.এফ.এম.’ এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে ‘ডি.ডি.’ অর্থাৎ ‘ডক্টরেট অব ডিভিনিটি’-ও খোদিত (মাঝের ছবি)। বিভিন্ন গির্জার এই ফলকগুলি গতায়ু বিশিষ্টদের জীবনকথা বলার পাশাপাশি জিশুর পুনরুত্থান ও পরকাল সংক্রান্ত বিশ্বাসকে দৃঢ় করে। বিদেহী আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করার কথা মনে করিয়ে দেয় ঈশ্বরবিশ্বাসীদের।
নতুন দৃষ্টি
গত শতাব্দীর কুড়ির দশকে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর উত্তাল সময়ে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন নাটক রক্তকরবী। পঞ্চাশের দশকে ‘বহুরূপী’র নির্মাণে তার স্মরণীয় মঞ্চায়ন ঘটে। এই নাটক ও নাট্য নিয়ে বহু আলোচনা ও বিতর্ক চলছে গত একশো বছর ধরে— এ নাটকের মূল সত্যের দিকে নতুন করে তাকানোর যেমন প্রয়োজন আছে, তেমনই নতুন সময়ের মঞ্চভাষায় কী করে গড়ে উঠতে পারে এক অন্যতর নাট্যভাষ্য, আলোচনার পরিসর আছে এই সব কিছু নিয়েই। ‘কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’-এর উদ্যোগে আয়োজিত ‘কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় (ছবি) স্মারক বক্তৃতা’র তৃতীয় বর্ষে ‘এখন রক্তকরবী’ শিরোনামে এই প্রসঙ্গেই বলবেন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব অশোক মুখোপাধ্যায়। সভামুখ্য অভিজিৎ সেন, কথা-সমন্বয়ে সৌমিত্র মিত্র; সঙ্গীতে শ্রাবণী সেন অগ্নিভ বন্দ্যোপাধ্যায় রাজশ্রী ভট্টাচার্য ও ঋতপা ভট্টাচার্য। রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচার, গোলপার্কের বিবেকানন্দ হল-এ, আজ বিকেল ৫টা থেকে।
স্মৃতিসরণি
সুরকার ও শিল্পী হিসেবে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, অখিলবন্ধু ঘোষের অবদান প্রশ্নাতীত। ‘আকাশপ্রদীপ জ্বলে’, ‘পাষাণের বুকে লিখো না’, ‘ওই যে আকাশের গায়’, ‘সে দিন চাঁদের আলো’য় আলোড়িত এ-প্রজন্মও। ‘প্রান্তরের গান আমার’-এ উৎপলা সেনের কণ্ঠের স্নিগ্ধ বিষাদ আজও ছোঁয় মন। স্মরণীয় কত গান; শ্রোতার মুগ্ধ শ্রবণ-অভিনন্দন ছাড়া আর কিছু পাননি ওঁরা। শতবর্ষের আলোয় তিন শিল্পী স্মরণে এগিয়ে এসেছে ‘ঠাকুরপুকুর সৃজনছন্দ’, গুণী তবলিয়া দীপঙ্কর আচার্যের নেতৃত্বে। শম্পা কুন্ডু লোপামুদ্রা মিত্রের সঙ্গে গাইবেন নবীন প্রতিভাধর শিল্পীরাও। হবে সমবেত গানও। ৫ এপ্রিল বিকেল সাড়ে ৫টায় বেহালা শরৎ সদন যেন স্মৃতিসরণি।
ঝর্না-ধারা
‘স্মার্ট’ হওয়ার দৌড়ে হাতের লেখার চর্চায় এখন যেন আলো কমে আসছে। ডিজিটাল দুনিয়ার দাপটে এতদিনের চেনা, নিত্যব্যবহার্য অ্যানালগ অস্ত্রও বদলাচ্ছে রূপ— এ সময় ঝর্না কলম তথা ফাউন্টেন পেন ও তার ব্যবহার কি স্রেফ শৌখিনতা? লেখালিখি নিয়ে এমন বহু প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে ‘পেন উৎসব’, আয়োজনে পেন ক্লাব। কলম, কালির অনুরাগীরা ছাড়াও ভিড় জমাবেন দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা কারিগর, সংগ্রাহকরা। প্রদর্শনীতে ইতিহাস ফিরে দেখার পাশাপাশি কেনাবেচা, ক্যালিগ্রাফি-চর্চা, বিরল সব সংগ্রহ দেখার সুবর্ণসুযোগ। নানা ধরনের প্রায় ৫০০০ ঝর্না কলম ও কালির পসরা নিয়ে থাকবেন দেশ-বিদেশের খ্যাত কলম-নির্মাতারা। আইসিসিআর-এ ৩-৫ এপ্রিল, রোজ ১২টা-৮টা।
লোক-সূত্র
পশ্চিমবঙ্গের ডোকরা, কাঁথা স্টিচের কাজ, পটচিত্র, টেরাকোটা, কাঠের মুখোশ। পাশাপাশি ঝাড়খণ্ডের কাশি ঘাসের শিল্পবস্তু, সেরাইকেলা ছৌ মুখোশ, ওড়িশার ময়ূরভঞ্জের ডোকরা ও সাবাইশিল্প, কোরাপুটের কোটপাড বস্ত্রশিল্প। সবই এক ছাদের নীচে, চোখের সামনে। ‘বাংলানাটক ডটকম’ শিল্প প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে বালিগঞ্জের দাগা নিকুঞ্জে গতকাল শুরু হয়েছে পূর্ব ভারতের হস্তশিল্পের দ্বিবার্ষিক প্রদর্শনী ‘দক্ষ’, চলবে ৫ এপ্রিল অবধি, ১১টা-৮টা। ঐতিহ্যের হাত এখানে ধরেছে সমসময়, গ্রামীণ লোকশিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেছেন নাগরিক ডিজ়াইনাররা। হবে প্রাসঙ্গিক আলোচনা, রোজ বিকেল ৪টা থেকে সন্ধে ৭টা লোকসংস্কৃতির অনুষ্ঠান— কোরাপুটের জনজাতি নাচ ও গান, সেরাইকেলা ও ময়ূরভঞ্জের ছৌ নাচ, বাংলার বাউল গান, চদর বদর পুতুলনাচ পরিবেশনাও।
মর্মে লাগে
১৯৬৮-তে প্রথম রেকর্ড ‘রয় যে কাঙাল শূন্য হাতে’। রেকর্ডে, রেডিয়োয় ভাবময় কণ্ঠের অভিব্যক্তিতে দশকের পরে দশক শুনিয়েছেন রবীন্দ্রসঙ্গীত, গড়েছেন বহু ছাত্রছাত্রী। আত্মপ্রচারহীন স্বপ্না ঘোষাল রয়ে গেছেন স্বনামখ্যাতদের আড়ালে, বরাবর। ‘বৈতালিক’-এর আয়োজনে ৮ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬টায় রবীন্দ্রসদনে সম্মানিত হবেন তিনি। এ আনন্দসন্দেশ সুরময় আরও, কারণ এই সন্ধ্যায় বেহালায় রবীন্দ্রসুর শোনাবেন দূর্বাদল চট্টোপাধ্যায়; সঙ্গে দেবারতি সোম ও স্বপন সোমের পরিচালনায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের গ্রন্থনায় নৃত্য-আলেখ্য ‘রং যেন মোর মর্মে লাগে’। একই দিনে গিরিশ মঞ্চে বিকেল ৫টায় ‘গান্ধর্বী’-র আয়োজনে বৃন্দগানে রবীন্দ্রযাপন, ব্রতী অরণি রবিছন্দম রবিচেতন প্রবাহিণী কাঁকুড়গাছি নিছনি ও শ্রাবণী সেন মিউজ়িক অ্যাকাডেমি-র সম্মেলক নিবেদনে। ‘এ গান আমার’ গীতি আলেখ্যে ফুটে উঠবে রবীন্দ্রগানে ছয় দশকের বিবর্তন-কথা।
প্রতিভূ
‘বেঙ্গল স্কুল’ চিত্রশৈলীর শিল্পী নরেন্দ্র চন্দ্র দে সরকার। জন্ম ১৯৩২-এ, শিল্পশিক্ষা সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে, সেখানেই পরে শিক্ষক ‘ইন্ডিয়ান স্টাইল অব পেন্টিং’ বিভাগে। ভারতীয় শৈলীর চিত্রচর্চায় বিষয় হিসেবে পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক ভাবনার পাশে সমকালীন সমাজজীবনও যুক্ত হয় ক্রমে, নরেন্দ্রবাবু এই বদলে যাওয়া সময়ের প্রতিভূ। তাঁর ছবিতে পৌরাণিক বিষয়ের সঙ্গে দেখা মেলে পারিবারিক (ছবিতে ‘বর বরণ’) ও শহুরে চিত্রালেখ্যও। মিতভাষী, নবতিপর শিল্পীর দিনযাপনের আশ্রয় ছবি আঁকা। রাজ্য সরকারের সম্মাননায় ভূষিত এই শিল্পীর পূর্বাপর কাজের এক প্রদর্শনী হয়েছিল কলকাতায় এ বছরের শুরুতেই। বহু সচিত্র দলিল, যেগুলো অতি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও দেখানো যায়নি, মূলত সেই কাজগুলি নিয়েই এ বার প্রদর্শনী ‘বেঙ্গল স্কুল অ্যান্ড দ্য মাস্টার’— মায়া আর্ট স্পেস গ্যালারিতে। ৭ এপ্রিল সন্ধেয় উদ্বোধন, ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত, রোজ ২-৮টা। আগামী ৮ এপ্রিল সন্ধে সাড়ে ৬টায় নিজ শিল্পযাত্রা-কথাও বলবেন তিনি।
জন্মদিনে
নাথবতী অনাথবৎ নামটি উচ্চারিত হলেই যাঁর ছবি মনে উদ্ভাসিত হয়, তিনি শাঁওলী মিত্র (ছবি)। বাংলা নাট্যের এক গৌরবময় অধ্যায়ের স্রষ্টা। ৫ এপ্রিল ৭৮তম জন্মদিন এই বিশিষ্ট নাট্যচিন্তকের, তাঁর প্রতিষ্ঠিত নাট্যদল ‘পঞ্চম বৈদিক’ এই দিনে তাঁর স্মরণে ও শ্রদ্ধায় ‘শাঁওলী মিত্র স্মারক সম্মান’ অর্পণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে, গত দু’বছরের মতো এ বারও। ভাঙা বনেদ, আবর্ত, জলছবি, মায়ের মতো, রক্ত কল্যাণ, স্বাহা, মানময়ী গার্লস স্কুল, যদি আর একবার-এর মতো উল্লেখযোগ্য প্রযোজনার রূপকার, ‘রঙরূপ’ নাট্যগোষ্ঠীর নির্দেশক সীমা মুখোপাধ্যায়কে সম্মাননায় ভূষিত করবেন বাবু দত্ত রায়। আগামী কাল রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় অনুষ্ঠান মধুসূদন মঞ্চে। পরে অর্পিতা ঘোষের নির্দেশনায় পঞ্চম বৈদিক-এর নাট্য-প্রযোজনা অ-পরাজিতা।
এক আধারে
সম্পাদক ও কবি, একাধারে। দশটি কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা দেবীপ্রসাদ ঘোষের তন্নিষ্ঠ সম্পাদনায় পাওয়া গেছে বাংলা ভাষায় চলচ্চিত্র চর্চার দীর্ঘ ইতিহাস; শিবরাম-শিশিরকুমার বিতর্ক, হরেন ঘোষ হেমেন্দ্রকুমার রায় ক্ষিতিমোহন সেন রানী চন্দের রচনাদি, কাননদেবীর আত্মকথন, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের চলচ্চিত্র ভাবনা: বঙ্গমননের উজ্জ্বল উদ্ধার। তিনি না থাকলে জানাই যেত না নরেন্দ্র দেব প্রতিষ্ঠিত ফিল্ম সোসাইটির কথা। বিস্মৃত তথ্য ও গ্রন্থের খোঁজে নানা গ্রন্থাগারে গিয়ে পুরনো বই, সংবাদপত্র ঘাঁটতেন। আর ছিল ওঁর সম্পাদিত কাগজ চিত্রসূত্র, প্রকাশনা ‘দৃশী’। চলচ্চিন্তা বইয়ের সূত্রে পেয়েছেন বিএফজেএ পুরস্কার। ফেব্রুয়ারিতে চলে গেলেন হঠাৎই, ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট সভাকক্ষে গত ১৪ মার্চ ওঁকে স্মরণ করলেন আত্মজনেরা, নর্থ ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি-র তত্ত্বাবধানে প্রকাশ পেল স্মরণিকা।