মানিকচকের এনায়েতপুর মাঠের সভায় তখন মঞ্চের সামনে সারিতে বসে হাজারখানেক মহিলা। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে (এসআইআর) নাম বাদ যাওয়া প্রসঙ্গে সভামঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশ্ন— ‘‘কাদের নাম বাদ গিয়েছে, হাত তুলুন।’’
হাত তুললেন সভামঞ্চের সামনে থাকা সিংহভাগ মহিলাই। তা দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন মুখ্যমন্ত্রী। তোপ দাগলেন বিজেপি এং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। এনায়েতপুরের পাশাপাশি শনিবার সামসি ও গাজলের নির্বাচনী সভা থেকেও এসআইআর প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারকে কটাক্ষ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। পাল্টা সরব বিরোধীরাও।
এসআইআর প্রক্রিয়ায় ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় উত্তরবঙ্গের মধ্যে শীর্ষ স্থানে রয়েছে সংখ্যালঘু-প্রধান মালদহ। সে তালিকায় রয়েছেন ৮ লক্ষ ২৮ হাজার ২৮ জন ভোটার। এঁদের মধ্যে এখনও অন্তত ৬০%-এর নাম ‘বিবেচনাধীন’ হিসাবেই রয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রের দাবি। তালিকায় নাম বাদ ঘিরে বুধবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল মালদহ। সেই জেলার তিনটি সভা থেকে এ দিন এসআইআর প্রসঙ্গে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে নিশানা করেন মমতা। বলেন, ‘‘অমিত শাহকে ‘চ্যালেঞ্জ’ করছি। ক্ষমতা থাকলে এখানে এসে মিটিং করুন! সবার নাম ভোটার তালিকা থেকে কেটে দিয়েছে। ভোট কে দেবে? মানুষের পায়ে ধরে ক্ষমা চাওয়া উচিত!’’
দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘‘মিটিং-মিছিল পরে করবেন। আগে সবার নাম তুলুন। ট্রাইবুনালে আবেদন করুন। বিজেপিকে বিশ্বাস করি না। ক্ষমতায় এলে এনআরসি করে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেবে।’’ পাশাপাশি, তিনি বলেন, ‘‘তৃণমূল সরকার থাকলে একটা মানুষকেও ডিটেনশন ক্যাম্পে যেতে দেব না।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘বেছে বেছে সংখ্যালঘু, তফসিলি, মতুয়াদের নাম ভোটার তালিকা থেকে কাটা হয়েছে। এসআইআরে মৃতদের মধ্যে অর্ধেক হিন্দু, অর্ধেক মুসলিম রয়েছে। বিজেপিকে গণতান্ত্রিক ভাবে ভোট-বাক্সে জবাব দিন।’’
মানিকচকের এনায়েতপুরের সভায় ছিলেন আটগামার বাসিন্দা সানুয়ারা বিবি। বললেন, ‘‘রাজ্যে ২০০২ সালে ভোটের তালিকায় নাম থাকার পরেও এ বারের তালিকায় নাম নেই। পরিবারের আট জনের মধ্যে তিন জনেরই নাম বাদ!’’ আর এক জন মানজিলা বিবি বলেন, ‘‘আমার এবং শ্বশুর, জা, ননদ সবার নামই ভোটের তালিকা থেকে বাদ। আমাদের কী দোষ!’’
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া এবং মালদহের ঘটনা নিয়ে এ দিন সরব হয়েছেন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসুও। কলকাতায় তিনি বলেছেন, ‘‘নির্বাচন কমিশন নিষ্কর্মা। তারা আগে কেন পরিস্থিতি বুঝল না? নাম বাদ গেলে মানুষের ক্ষোভ তো হবেই। জেলাশাসকের দফতরে কেন ব্যবস্থা করল না, নিরাপত্তা রাখল না? এখন নাম বাদ যাওয়া অসহায় মানুষের সকলকে দুষ্কৃতী বলে দাগিয়ে দিলে হবে?’’ বিমানের আরও দাবি, ‘‘কমিশন অন্যায় করেছে। বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া যাবে না, আমরা দাবি করে এসেছি প্রথম থেকে। শুধু ধর্ম দেখে নাম কাটা হয়েছে, এমন নয়। মুসলিম হয়তো বেশি বাদ যাচ্ছে। কিন্তু অন্যেরাও আছেন। যোগ্য ভোটার ও প্রার্থীদের বিষয়টা ট্রাইবুনালে আগে নিষ্পত্তি করা উচিত।’’
মোথাবাড়ির ঘটনা প্রসঙ্গে আইএসএফের চেয়ারম্যান নওশাদ সিদ্দিকীও বলেছেন, “মুখ্যমন্ত্রী বলে দিলেন দাঙ্গা লেগেছে। কোথায় লেগেছে? কিছু মানুষ শান্তিপূর্ণ ভাবে আন্দোলন করছিলেন। যত দূর জানতে পেরেছি, আধিকারিকেরা তাঁদের পরে কথা বলবেন বলে বসিয়ে রাখেন। এই ভাবে দুপুরের কর্মসূচি রাত পর্যন্ত গড়ায়। তার পরে শান্তিপূর্ণ অবস্থানে নির্বিচারে লাঠি চালানো হয়। আমরা চাই, তদন্ত হোক। সত্য সামনে আসুক। সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলুন তদন্তকারীরা।” তাঁর দাবি, “মোথাবাড়ি ও সুজাপুরের ঘটনাকে এক করে মালদহকে বদনাম করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সুজাপুরে বিচারকদের আটক করে রাখার কথা বলা হচ্ছে, সে রকম কিছু হয়নি।”
মুখ্যমন্ত্রীর এ দিনের বক্তব্যের সমালোচনা করে বিজেপির তফসিলি মোর্চার রাজ্য সভাপতি তথা উত্তর মালদহের সাংসদ খগেন মুর্মু বলেন, ‘‘ভোটের স্বার্থে এসআইআর নিয়ে শুরু থেকেই বিরোধিতা করছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি যতই চেষ্টা করুন, এ বার আর ক্ষমতায় আসতে পারবেন না।’’ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এ দিন কোচবিহারে বলেছেন, ‘‘এসআইআর চলছে সব রাজ্যে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বিচারপতিরা ওই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছেন। সেখানে জাতীয় সড়ক যদি ১৫ ঘণ্টা অবরোধ করা হয় আর বিচারপতিদের গাড়িতে যদি পাথর ছোড়া হয়, তা হলে কোন এসআইআর প্রক্রিয়া এখানে চলছে দু'মাস ধরে? বিজেপির বিএলএ-২'রা আক্রান্ত হয়েছেন। যে ভাবে ফর্ম ৬ নিয়ে যাওয়া বিজেপি কর্মীদের উপরে আক্রমণ হয়েছে, এর নাম এসআইআর?’’ অন্য দিকে, কংগ্রেস নেত্রী মৌসম নূর বলেন, ‘‘এনআরসি-র ধাঁচে এসআইআর নিয়ে বিজেপি-তৃণমূল রাজনীতি করে ভোট ভাগাভাগি করতে চাইছে।’’