মায়ের মতো আগলাতে হবে ভোটবাক্স! বদল নয়, বদলার বার্তা দিয়ে মমতার হুঁশিয়ারি, ‘এই বার দুরন্ত খেলা হবে’!
আনন্দবাজার | ০৬ এপ্রিল ২০২৬
৩৪ বছরের বামশাসনের সমাপ্তি ঘটানোর আগে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্লোগান দিয়েছিলেন, ‘বদলা নয়, বদল চাই’। ২০১১ সালে তাঁর দল ক্ষমতায় এসে পাড়ার মোড়ে-মোড়ে, ট্রাফিক সিগন্যালে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজিয়েছিল। বার্তা ছিল স্পষ্ট— প্রতিহিংসার রাজনীতি করবে না তৃণমূল। যারা ইতিমধ্যেই ক্ষমতাচ্যুত, তাদের উপর ‘বদলা’ নেওয়া হবে না। ১৫ বছর পর আরও এক নির্বাচনের মুখে সেই স্লোগানে বদল আনলেন তৃণমূলনেত্রী। এ বার তাঁর বার্তা, বদলা হবে। কিন্তু সেই বদলা হবে গণতান্ত্রিক উপায়ে। ভোটবাক্সে যার প্রভাব পড়বে। তাই, ভোটবাক্সকে ‘মায়ের মতো’ পাহারা দিতে হবে বলে কর্মীদের বার্তা দিলেন ‘মা-মাটি-মানুষের’ সরকারের প্রধান।
রবিবার নির্বাচনী প্রচারে তৃণমূলনেত্রী ছিলেন মুর্শিদাবাদে। তাঁর প্রথম সভাটি ছিল শমসেরগঞ্জে। তার পর মুর্শিদাবাদ বিধানসভা কেন্দ্রের জিয়াগঞ্জের সভা করেন। অন্যান্য নির্বাচনী সভার মতো মুর্শিদাবাদেও মমতার নিশানায় ছিল বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশন। প্রসঙ্গ সেই ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া নিয়ে কমিশন এবং বিজেপিকে এক পঙ্ক্তিতে ফেলে আক্রমণ করেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘অনেকের নাম বাদ দিয়েছে। অনেক মানুষ মারা গিয়েছেন। এ বার বদলা নেওয়ার পালা। তাই এই খেলার নাম ‘দুরন্ত খেলা’। সব জায়গায় ওদের লোক আছে। কিন্তু মানুষ আমাদের সঙ্গে আছে। ভোটের বাক্সে এ বার বদলা হবে।’’
আবার এক বার ইভিএম কারচুপির আশঙ্কা করে মমতা কর্মীদের বার্তা দিয়েছেন, ভোটের শেষ পর্যন্ত সকলকে অপেক্ষা করতে হবে। প্রয়োজনে বুথে পাহারা দিয়ে পড়ে থাকতে হবে। তাঁর পরামর্শ, ‘‘ইভিএম খারাপ করে দিলে অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু তাতে আর ভোট করতে দেবেন না। সারানোর নাম করে ‘চিপ’ ঢুকিয়ে দেবে। ওরা পারে না এমন কোনও কাজ নেই। ভোটের পর ভোটবাক্সকে মায়ের মতো পাহারা দেবেন।’’
শুধু বিজেপি নয়, জোড়া সভা থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে একহাত নিয়েছেন তৃণমূলনেত্রী মমতা। তিনি বলেন, ‘‘ভবানীপুরে কাল (শনিবার) কেন্দ্রীয় বাহিনী অসভ্যতা করেছে। আপত্তিকর ভাবে ‘চেক’ করা হয়েছে এক মহিলাকে।’’ বিরোধীদের নিশানার পর দলের নেতা এবং কর্মীদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন তৃণমূলনেত্রী। বিশেষ করে টিকিট নিয়ে দলের একাংশের ক্ষোভের প্রেক্ষিতে মমতার বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি জানান, দল এবং মানুষের কাজ করলে তবেই ভোটে লড়ার টিকিট দেয় তৃণমূল। তবে ‘একটি-দুটো’ ক্ষেত্রে বয়সও ‘ফ্যাক্টর’ হতে পারে। মমতা বলেন, ‘‘সম্মানের সঙ্গে যাঁরা দল করবেন, তাঁদের সসম্মানে সেই জায়গা ফিরিয়ে দেব।’’ ওই সময়ে ফরাক্কার বিদায়ী বিধায়ক মনিরুল ইসলামকে নিশানা করেছেন তিনি। মনিরুলকে এ বার তৃণমূল প্রার্থী করেনি। তাই কংগ্রেসের হয়ে তিনি মনোনয়ন জমা দিয়েছেন বলে শোনা গিয়েছে। শমসেরগঞ্জের তৃণমূল প্রার্থী নূর আলম এবং ফরাক্কার প্রার্থী আমিরুল ইসলামের সমর্থনে সভা থেকে মমতা বলেন, ‘‘ফরাক্কার বিধায়ককে বলছি, শুনেছি, তিনি মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। আমি তাঁকে বলছি, প্রত্যাহার করে নিতে। না করলে আমি জঙ্গিপুর সাংগঠনিক জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি ও সাংসদ খলিলুর রহমানকে বলছি, দল থেকে তাঁকে বহিষ্কার করতে।”
টিকিট না পাওয়া মনিরুল শনিবার জঙ্গিপুর মহকুমা শাসকের দফতরে কংগ্রেসের হয়ে মনোনয়ন জমা দেন। ওই কেন্দ্রে কংগ্রেস প্রার্থী মাহাতাব শেখের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাতিল হয়েছে। মনিরুল জানিয়েছেনন, কংগ্রেস প্রার্থীর ভোটার তালিকায় নাম উঠলে তিনি ফরাক্কাবাসীর উন্নয়নের স্বার্থে নির্দল প্রার্থী হিসাবেও লড়াই করবেন। তবে রবিবারই অধীর চৌধুরী জানান, ফরাক্কায় কংগ্রেসের প্রার্থী মাহাতাব-ই। এ সব শুনে মনিরুল বলছেন, ভোটে তিনি লড়বেনই। তাঁর কথায়, ‘‘কারও হুমকির কাছে মাথানত করব না। বললে আমি নিজেই পদত্যাগ করব। দলে (তৃণমূলে) আমার তো কোনও পদ নেই, একমাত্র সংখ্যালঘু সেলের রাজ্য সহ-সভাপতি ছাড়া। সেই পদও ছেড়ে দেব। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা আমি করবই। আমি তো চুরি, তোলাবাজি কিছুই করিনি। তা হলে কেন আমাকে দল টিকিট দিল না?”
অন্য দিকে, গত সপ্তাহে তাঁর বিধানসভা এলাকায় শুভেন্দু অধিকারীর সমর্থনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের রোড শো ঘিরে যে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, সে নিয়ে মুখ খুলেছেন মমতা। ইতিমধ্যে ওই ঘটনায় পদক্ষেপ করেছে নির্বাচন কমিশন। তবে মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, ভবানীপুরে সে দিন তৃণমূল ‘বনাম’ বিজেপি ছিল না। বিজেপির ‘ব্যবহারের’ প্রতিবাদ করেছেন ভবানীপুরবাসী। তিনি বলেন, ‘‘ভবানীপুরে আমার বাড়ির সামনে হামলা হয়। এমনকি, আমার পোস্টারে থুতু দেওয়া হয়েছিল। জুতো দেখানো হয় অভিষেকের বাড়ির দিকে। স্থানীয় লোকজনই এর প্রতিবাদ করেছেন। এর পিছনে কোনও রাজনীতি নেই।’’ তৃণমূলনেত্রী এ-ও অভিযোগ করেন, বাইরে থেকে লোক এনে মনোনয়নপত্র জমা দিতে গিয়েছিলেন তাঁর ভবানীপুরের প্রতিদ্বন্দ্বী শুভেন্দু।