• অনলাইন আর্জির সমস্যায় দিশাহারা বাদ-পড়ারা
    আনন্দবাজার | ০৬ এপ্রিল ২০২৬
  • ভোটার তালিকায় নাম তুলতে ট্রাইবুনালের ভরসায় থাকা অনেক ভোটারই অনলাইনে আবেদন ব‍্যবস্থা নিয়ে ঘোর সঙ্কটে পড়েছেন। বিশেষত অনলাইন আবেদন পর্বে কোনও নথি জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি বলে তাঁরা বিচলিত। এ ছাড়া, খুঁটিয়ে আবেদন করতে বলা হয়েছে ১০০০টি বর্ণ ব‍্যবহার করে। ১০০০টি বর্ণ মানে টেনেটুনে ২০০টি শব্দ। এই শ’দুয়েক শব্দে নির্বাচন কমিশন নির্দিষ্ট লজিক‍্যাল ডিসক্রিপ‍্যান্সি (এলডি) বা তথ‍্যগ্রাহ‍্য অসঙ্গতির ব‍্যাখ‍্যা অল্পশিক্ষিত কারও পক্ষে খুবই কঠিন বলে মনে করছেন দিশাহারা মানুষকে সাহায্য করতে নামা আইনজ্ঞেরা।

    অসমে এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জি তৈরির পর থেকেই গত ৬-৭ বছর ধরে এ রাজ‍্যে স্টেট আর্কাইভসের দফতরে হত‍্যে দিয়ে পড়েছেন প্রান্তিক গাঁয়ের মানুষ। নানা দুর্বিপাকে ‍যাঁদের পুরনো নথি হারিয়েছে বা না-হারালেও স্রেফ আশঙ্কার বশে তাঁরা কয়েক প্রজন্ম ধরে এ দেশের মানুষ বোঝাতে অনেকেই তৎপর হন। ১৯৫২ বা ১৯৫৭ সালের ভোটার নথি খুঁজে বার করেন তাঁরা। এত দিন এসআইআর পর্বে সেই সব নথি পেশ করার সুযোগ ছিল না। কিন্তু এখন ট্রাইবুনালে সুপ্রিম কোর্ট ফের আবেদনকারীদের তথ‍্য দেখে তাঁদের কথা শোনার নির্দেশ দিলে অনেকেই আরও বাড়তি নথিসুদ্ধ এ রাজ‍্যের পুরনো বাসিন্দা হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণে মরিয়া হয়েছেন। অনলাইনে বাড়তি নথি দেওয়ার সুযোগ না-থাকায় অনেক আবেদনকারীকেই সশরীরে অফলাইনে আবেদন জমা দিতে বলছেন আইনজ্ঞ বা তাঁদের পরামর্শদাতারা।

    অনেক কেন্দ্রেই যেখানে নথি জমা দেওয়ার কথা সেখানেই ঢাকঢোল পিটিয়ে মনোনয়ন জমা দিচ্ছেন ওজনদার প্রার্থীরা। তাতেও বিস্তর সময় নষ্ট হচ্ছে বলে কারও কারও অভিযোগ। সবর ইনস্টিটিউটের মতো সংস্থার তরফে নানা ভাবে আবেদন করতে গিয়ে বিপন্ন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের আবেদনে সাহায্য করা হচ্ছে। এগিয়ে এসেছেন আরও অনেকে। ন‍্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব জুরিডিক‍্যাল সায়েন্সের অধ‍্যাপক সরফরাজ আহমেদ খানের মতে, “এই ট্রাইবুনালে বিচারবিভাগীয় আধিকারিক বা বিচারকেরা প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। এর আগে বিবেচনাধীনদের নাম বাদ যাওয়ার ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে বেশ কিছু ক্ষেত্রেই সাধারণ মানবিক বোধ প্রয়োগ করলেই সমস‍্যা মিটে যেত। নিয়মের গেরোয় জটিলতা তৈরি করা হয়েছে। ট্রাইবুনালের সামনে সবার সুবিচার লক্ষ‍্য হওয়া উচিত।” হাই কোর্টের আইনজীবী তারিক কোয়াসিমুদ্দিনও বলেন, “আশার কথা, সুপ্রিম কোর্ট সব আবেদনকারীর নথি ভাল ভাবে দেখতে বলেছে।”

    তবে ট্রাইবুনালের সামনে সময় কম নিয়ে চিন্তিত আইনজ্ঞেরা। সে ক্ষেত্রে এর আগের ভোটের ভোটার তালিকায় নাম থাকলেই বাদ পড়াদের এ বার ভোট দিতে পারা উচিত বলে অনেকের অভিমত।

    মেটিয়াবুরজ বিধানসভায় ৭০ হাজার বিবেচনাধীনের অনেকেরই ভাগ্য ঝুলে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা পূর্বতন সাংসদ সামিরুল ইসলাম এবং হাই কোর্টের আইনজীবী রঘুনাথ চক্রবর্তীর পরামর্শে ট্রাইবুনালে অনলাইনে আবেদনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পার্ক সার্কাসে এক মাস ধরে অবস্থানরত ধর্না মঞ্চও সব রাজনৈতিক দলকে খোলা চিঠিতে জানিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মের গেরোয় প্রান্তিক মানুষ বা ন‍্যায‍্য ভোটার বাদ পড়েছেন।

    আগে তিন বার ভোটে প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্ব সামলেছেন ঘাটালের কলেজ শিক্ষক কাজী তাজউদ্দিন। হুগলির খানাকুলের তিনি ভোটার। পাসপোর্ট, আধার-সহ সব নথি নিয়ে রীতিমতো আটঘাট বেঁধে শুনানিতে থাকলেও ভোটার তালিকায় তাঁর নাম নেই। তাজউদ্দিনেরা ৭ ভাই, তিন বোন। সবার ছোট তাজউদ্দিন এবং তাঁর ভাই মিরাজউদ্দিনের নাম শুধু বাদ। এক সঙ্গে ছ’ভাই-বোন থাকলেই অনেকে বাদ পড়ছেন ভোটার তালিকা থেকে। তাজউদ্দিনদের ক্ষেত্রে বাদ পড়ার আর কোনও কারণ কেউ খুঁজে পাচ্ছেন না।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)