• সলিল-হেমাঙ্গদের গণসঙ্গীতের দিন ফুরোল? কেন্দ্র ধরে এআই দিয়ে ‘সং’ সাজাচ্ছে সিপিএম, প্রচারে নয়া উপকরণ ডিজে বক্স
    আনন্দবাজার | ০৬ এপ্রিল ২০২৬
  • জন হেনরি কিসিপিএমের পাঠ্যক্রম থেকে মুছে যেতে চলেছেন? যিনি যন্ত্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চেয়েছিলেন! যাঁর বীরগাথা বিভিন্ন ভাষায়অনূদিত হয়ে গণসঙ্গীত আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে। শুধু কি জনহেনরিই মুছে যেতে চলেছেন? না কি একইসঙ্গে হেমাঙ্গ বিশ্বাস,সলিল চৌধুরীদের ধ্রুপদী গণসঙ্গীতের দিনও ফুরিয়ে আসছে বামরাজনীতির পরিসরে? বিধানসভানির্বাচনে বামেদের প্রচারের নতুন আঙ্গিকে সেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্য নিয়েকেন্দ্র ধরে ধরে ‘থিম সং’ তৈরি করছে সিপিএম।

    ইতিমধ্যেই কোচবিহার, উত্তরপাড়া, শ্রীরামপুর, নোয়াপাড়া, পানিহাটি, ডোমকল-সহ বিভিন্ন কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থীদের সমর্থনে এআই নির্মিত গানপ্রকাশ্যে এসেছে। স্থানীয় স্তরের সিপিএম কর্মীরা গান লিখছেন। তার পরে সেই গানেরকথা সঁপে দেওয়া হচ্ছে এআই-এর কাছে। কী করতে হচ্ছে? হুগলিতে কেন্দ্র ধরে সিপিএমের গান বানানোর নেপথ্যে থাকা এক তরুণ নেতারকথায়, ‘‘গানের লিরিক্স আমরা দিয়েদিচ্ছি। তার পরে কেমন গলা হবে, ভারীনা সরু, হালকা ডিজে মিউজ়িক পাঞ্চকরা থাকবে কি না, রিদমটা দ্রুত হবেনা ধীরে, সেগুলো ওকে (এআই-কে)‘ব্রিফ’ করে দিচ্ছি। ব্যস, গানরেডি!’’ খুব পরিশ্রম করতে হচ্ছে? জবাবেসিপিএমের তরুণ নেতা রসিকতা করে বলেন, ‘‘বাধ্য কমরেডের মতো কাজ করছে এআই। বেশি বলতে হচ্ছে না। বুঝে যাচ্ছে।’’

    কোচবিহারের প্রণয়কার্য্যি থেকে উত্তরপাড়ার মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায় বা ডোমকলের মুস্তাফিজুর রহমান রানারপ্রচার গান-সহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে ‘ঢিঙ্কাচিকা’ তালের ছাপ রয়েছে।সম্ভবত তার জেরেই বামেদের প্রচারে অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে ডিজে বক্স। পানিহাটিতেকলতান দাশগুপ্তের সমর্থনে মিছিল হোক বা উত্তরপাড়ায় মিনাক্ষীর মিছিল, সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে ‘ছোটা হাতি’তে থরে থরেসাজানো ডিজে বক্স। তাতে বাজছে এআই নির্মিত ‘থিম সং’। গণসঙ্গীতের পুরনো ধাঁচ ভুললেওগণনৃত্যের নতুন ধারা দেখা যাচ্ছে। ডিজে বক্সে বাজছে এআই নির্মিত তালের গান। আর তার সঙ্গে হইহই করে নাচছেন সিপিএমের কর্মী-সমর্থকেরা। রবিবার সকালে উত্তরপাড়ায় দঙ্গল বেঁধেনাচ মিনাক্ষীর ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচারও করা হয়েছে।

    যদিও সবটাই এআই দিয়েহচ্ছে তা নয়। যেমন যাদবপুর এবং টালিগঞ্জের সিপিএম প্রার্থী যথাক্রমে বিকাশরঞ্জনভট্টাচার্য এবং পার্থপ্রতিম বিশ্বাসের সমর্থনে যে ‘থিম সং’ প্রকাশ হয়েছে, তা নির্মাণ করেছেন বাম মহলে গান বানানোর পরিচিতত্রয়ী রাহুল পাল, রিয়া দে এবংনীলাব্জ নিয়োগী। মানব মস্তিষ্কের মাধ্যমেই নির্মিত হয়েছে সেই গান। যদিও প্যারোডির আশ্রয়নিয়েছেন রাহুল-রিয়ারা। যাদবপুরের ক্ষেত্রে হ্যারি বেলাফন্টের ‘জামাইকাফেয়ারওয়েল’-এর সুরে। আর টালিগঞ্জের গান নির্মিত হয়েছে ‘জিনা ইসিকা নাম’-এর আদলে।দুই ক্ষেত্রেই গানের কথায় জায়গা পেয়েছে কলোনি এলাকায় বামেদের পুরনো লড়াইয়ের কথা।

    বাম রাজনীতিরইতিহাসে প্যারোডি নতুন নয়। সত্তরের দশকে ‘গুমনাম’ ছবির গানের অনুকরণে নতুননির্মাণ করেছিল গণনাট্যসংঘ। সাম্প্রতিক সময়ে ‘টুম্পা সোনা’র প্যারোডিও করেছিলবামেরা। যদিও তা ছিল ব্রিগেড সমাবেশের প্রচারের গান।

    তবে এ বারেরবিধানসভা ভোটে তুলনায় এআই-এর রমরমা দেখা যাচ্ছে বামেদের প্রচারের গানে। কোনও কোনওকেন্দ্রে তো একাধিক গান নির্মাণ করে ফেলেছেন সিপিএমের লোকজন। তবে এ ব্যাপারেগণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা রাখেনি সিপিএম। বরং বিকেন্দ্রীকরণের দৃষ্টিভঙ্গিতেই পুরোবিষয়টি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে স্থানীয় স্তরের সংগঠনের উপর। বাম রাজনীতিতে এই সংস্কৃতিকি খুব স্বাস্থ্যকর? ক্যালক্যাটাকয়্যারের কল্যাণ সেন বরাটের কথায়, ‘‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপর আমার কোনও শ্রদ্ধা নেই। একজন রক্তমাংসের মানুষযা পারেন, এআই তা পারে না। সে কারণেএই প্রবণতাকে আমি সমর্থন জানাচ্ছি না।’’ ঘোষিত ‘বামপন্থী শিল্পী’ শুভেন্দু মাইতিরকথায়, ‘‘এটা মোটেই শুভ সঙ্কেত নয়।মানুষ যন্ত্রের দাসত্ব করলে অধঃপতন অনিবার্য। দলের বকলস না-পরেও আমি নীতিগত ভাবেবামপন্থী। ভোট দিলে হয়তো বামেদেরই দেব। কিন্তু প্রযুক্তি কখনও মানুষের গানের জন্মদিতে পারে না।’’

    কিন্তু এই যুক্তিমানতে রাজি নয় সিপিএম। দলের ইতিহাসে প্রথম ‘ক্রিয়েটিভ টিম’এর মাথা হিসাবে রাজ্যকমিটিতে জায়গা পাওয়া ধ্রুবজ্যোতি চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘জন হেনরির সময়ে হাতুড়ির ঘায়ে ঘায়ে পাহাড় কাটা হত। এখন ডিনামাইট ফাটিয়েহয়। সময় বদলানোর সঙ্গে এটা সাধারণ বিষয়। এর মধ্যে কোনও বিতর্ক নেই।’’ ঘটনাচক্রে, ধ্রুব নিজেও গীতিকার। সৃজিত মুখোপাধ্যায়েরছবিতেও তিনি গান লিখেছেন। সিপিএম সূত্রের খবর, এআই দিয়ে গান বানানোর আরও একটি বড় কারণ হচ্ছে, এতে খরচ নেই। এই ‘দুর্দিনে’ সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিমত অনেকের।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)