ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় মোট প্রায় ৯১ লক্ষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার হিসাব সামনে আসার পরেই বিজেপিকে নিশানা করেছে তৃণমূল কংগ্রেস-সহ অবিজেপি দলগুলি। বিষয়টিকে ‘ভোটাধিকার লুট’ বলে সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উল্টো দিকে, এসআইআর-প্রক্রিয়ায় আস্থা রেখেই বাদ পড়া অংশকে নতুন করে ট্রাইবুনালে আবেদন করার কথা বলেছে বিজেপি। সেই সঙ্গে, অনুপ্রবেশ-প্রশ্নেও সুর চড়িয়েছে তারা। এই দুই ভাষ্যকে সামনে রেখেই আবর্তিত হল মঙ্গলবারের ভোট-প্রচারও।
নাম বাদ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার, বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনকে এক পঙ্ক্তিতে বসিয়ে সরব হয়েছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা। নদিয়া ও উত্তর ২৪ পরগনার তিনটি নির্বাচনী সভা থেকেই বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, “ভোটের অধিকার লুট করা হচ্ছে। ৯০ লক্ষ ভোটার তালিকায় জায়গা পাননি। প্রথম দফায় ৫৮ লক্ষ ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। সেই অধ্যায় এখনও খোলাই হয়নি।” তাঁর সংযোজন, “আপনাদের লাইনে দাঁড়াতে হয়েছিল। অপমান, অসম্মান করা হয়েছিল। বদলা নেবেন কি নেবেন না?”
সরব হয়েছে সিপিএমও। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘প্রথমে মৃত ও স্থানান্তরিত মিলে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছিল। কিন্তু পরের দফায় আরও যে প্রায় ৩২ লক্ষ নাম কাটা হয়েছে, তার কোনও যুক্তিই নেই। নির্বাচন কমিশন যেমন এর জন্য দায়ী, তেমনই এই নিয়ে বিজেপি ও তৃণমূলের রাজনীতির শিকার সাধারণ মানুষ। এই ৩২ লক্ষের জন্য আমরা লড়ে যাব। যত দূর যেতে হয়, যাব’’
কলকাতায় এসে এ দিন এআইসিসি-র প্রধান মুখপাত্র জয়রাম রমেশও বলেছেন, ‘‘এসআইআর একটা বিপজ্জনক অস্ত্র, যেটা বানানো হয়েছে বিজেপির জন্য। সংবিধানের অলঙ্করণ করেছিলেন নন্দলাল বসু। তাঁর পরিবারের লোকজনের নাম পর্যন্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে। সকল বৈধ ভোটারের নাম তালিকায় ফিরিয়ে আনতে হবে, এই দাবি আমাদের থাকবে।’’ তাঁর আরও অভিযোগ, ‘‘এক দিকে মেরুকরণের তত্ত্ব দিয়ে তার পাশাপাশি বিজেপি এখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামও বদনাম করছে। সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দিতে চাইছে।’’
এই আবহে কলকাতায় রাসবিহারী কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী স্বপন দাশগুপ্তের প্রচারে এসে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেছেন, “ভোটার তালিকায় অনুপ্রবেশকারী নয়, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের নাম থাকার কথা। রাজ্য অনুপ্রবেশকারীদের হাতে নয়, বাংলাভাষীদের হাতেই থাকা উচিত।” কার্যত একই সুর শোনা গিয়েছে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর মুখেও। পরবর্তী ধাপে আরও বাদ যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেছেন, “ঝাড়াই-বাছাই একটা হয়ে যাওয়া উচিত। বাংলাদেশি মুসলমানদের তালিকায় রাখা যাবে না। এখনও ২০ লক্ষ নথি যাচাই হতে বাকি রয়েছে। যিনি ভারতীয়, তাঁর নাম উঠবে। ট্রাইবুনালে আবেদন করবেন।” ভোটার তালিকার সঙ্গে অনুপ্রবেশকারীর যোগসূত্র টেনে একই সুর শোনা গিয়েছে রাজ্যে প্রচারে আসা বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধরি, উত্তরপ্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী কেশবপ্রসাদ মৌর্যদের মুখেও।
নাম বাদকে বিজেপির পরিকল্পনা বলে উল্লেখ করে আবার তোপ দেগেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। উত্তরবঙ্গের সভা থেকে তিনি উপস্থিত জনতাকে বলেছেন, “আপনারা কি ভুলে গিয়েছেন কী ভাবে অসমের ট্রাইবুনাল কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়ির মানুষের কাছে নোটিস পাঠিয়েছিল? রাজবংশীদের নামে নোটিস এসেছিল। মানুষকে লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য করা হয়েছিল।” প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে উদ্দেশে তাঁর সংযোজন, “বাঙালিদের অনুপ্রবেশকারী বলছেন। শেখ হাসিনাকে (বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী) ২০ মাস রেখে দিয়েছেন। বিজেপিকে বলব, শেখ হাসিনা অনুপ্রবেশকারী না কি শরণার্থী?” অভিষেক এ দিনও আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, “প্রত্যেকের নাম তুলব। হয়তো একটু সময় লাগবে। আমরা আদালতে গিয়েছি। কিন্তু বিচার ব্যবস্থার একাংশ ওঁদের সঙ্গে মিশে রয়েছে!” এই পরিস্থিতিতে তৃণমূলের রাজ্য সহ-সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদারও বলেছেন, “যাঁদের নাম ওঠেনি, তাঁরা অবৈধ প্রমাণিত হননি। তাই ট্রাইবুনালে আবেদনের সুযোগ আছে। একটা অসম্পূর্ণ ব্যবস্থার জন্য ভোটাধিকার বলি দেওয়ার কোনও সুযোগ সংবিধানে নেই।”