‘রবি দাদু যে ঘরে রেওয়াজ করতেন সেই ঘর এখনও ফাঁকা, রয়েছে তাঁর জীবনের দুই অনুপ্রেরণার ছবি’
আনন্দবাজার | ০৮ এপ্রিল ২০২৬
বেঁচে থাকলে রবি দাদুর বয়স হত ১০৬। সকলের কাছে উনি পণ্ডিত রবিশঙ্কর। কিন্তু আমার কাছে রবিদাদু। যখন কলকাতায় আসতেন, পাম অ্যাভিনিউয়ে লালা শ্রীধরজির বাড়িতে থাকতেন। দাদুর সঙ্গে সেখানেই দেখা করতে যেতাম। তখন আমি ও অনুষ্কা দু’জনেই ছোট। আসলে দাদুর সঙ্গে এত এত সুখস্মৃতি, যে কোনটা ছেড়ে কোনটা বলব! সত্যি বলতে আমাদের পরিবারে সকলেই এক এক জন পাহাড়সম ব্যক্তিত্ব। কিন্তু তাঁদের যে এই পরিমাণ খ্যাতি, প্রজ্ঞা কোনওটার কখনও আস্ফালন দেখিনি।
আসলে দাদুকে তো খুব বেশি কাছে পেতাম না। কারণ, তিনি সারা বিশ্বে ভ্রমণ করতেন। আজ কলকাতায়, তো পরমুহূর্তে আবার বিশ্বের অন্য কোনও প্রান্তে। যত দিন রবিদাদু কলকাতায় থাকতেন, কী যে আনন্দ! বার বার সেই সময়টার অপেক্ষায় বসে থাকতাম আমরা। রবিদাদু শিশুদের বড্ড ভালবাসতেন। তিনি ছোট ছোট বাচ্চার সঙ্গে ভীষণ ভাল ভাবে মিশতে পারতেন।
তবে একটা স্মৃতি ভীষণ মনে পড়ে। ১৯৯৯ সালের কথা। শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীতে রবিদাদুর একটা অনুষ্ঠান। কলকাতা থেকে আমরা সকলে গিয়েছি। সেই সময়ে ট্রেনের একটা গোটা কোচ বুক করে যাওয়া হয়েছিল। রবি দাদুর সেই সময় অনেকটা বয়স। কড়া ডায়েটে থাকতেন, শরীর ও বয়সের কারণে। এ দিকে, শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসে যাচ্ছি আর ঝালমুড়ি খাব না, সেটা তো হবে না! তো অনেক ঝালমুড়ি কেনা হয়েছে। আর ওঁর তো ঝালমুড়ি ভীষণ পছন্দ। শরীরের কারণে চাইতেও পারছেন না। ট্রেনে আমার পিছনের সিটে বসেছিলেন রবি দাদু। শেষে নিজের লোভ সংবরণ না করতে পেরে পিছনের সিট থেকে চুপিচুপি হাত বাড়িয়ে ঝালমুড়ি চাইছেন। এ ভাবে চলল আমাদের ট্রেনের সফর! এটা এখন মনে পড়লেই খুব আনন্দ পাই।
আমার ছোটবেলার প্রায় পুরোটাই কেটেছে দিদিমা অমলাশঙ্করের (আমার নিজের দাদু উদয়শঙ্করের স্ত্রী) কাছে। কারণ বাবা-মা বেশিরভাগ সময়েই কাজের জন্য বিদেশে থাকতেন। রবি দাদুরও দেশ বিদেশে অনুষ্ঠান লেগেই থাকত। তাই উনি কলকাতায় এলে কত রথী-মহারথী ওঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। কিন্তু এর ফাঁকে ফাঁকেও কিন্তু উনি এসে আমাদের সঙ্গে সময় কাটাতেন। আর আমি ও অনুষ্কা খেলে বেড়াতাম, দৌড়ে বেড়াতাম। রবি দাদু কিন্তু খুব রসিকও ছিলেন। শান্তিনিকেতনেই একটা মজার ঘটনা আমার আজও মনে আছে। সেই প্রথম আমাদের শান্তিনিকেতনের বাড়িতে ওঁর যাওয়া। তিনতলা বা়ড়ির সমস্ত ঘর ঘুরে দেখেছিলেন। তখন আমার কাছে একটা খেলনা বানর ছিল। সেটা দেখে রবি দাদু হাসতে হাসতে বলে উঠেছিলেন ‘ঘরেতে বানর এলো বনবনিয়ে’! সেই শুনে আমরাও হেসে উঠি।
সত্যি বলতে আমার নিজের দাদু উদয়শঙ্কর, যিনি ‘পারফর্মিং আর্ট’-কে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। শিল্পের ক্ষেত্রে ওঁর জন্যই বিশ্বের দরবারে আমাদের সকলের জন্য দরজা খুলে গিয়েছিল। আমার নিজের দাদু সারা বিশ্বে ঘুরছেন নাচের গ্রুপ নিয়ে। রবি দাদু তাঁর দলে তখন এক জন শিল্পী হিসাবে কাজ করছেন। তখনই আমার দাদুর মনে হয়েছিল, এ বার তাঁর প্রথাগত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন।
তখন বাবা আলাউদ্দিন খাঁয়ের কাছে রবি দাদুকে পাঠানো হয়। রবি দাদু যে ঘরে রেওয়াজ করতেন, সেই ঘরে এখনও কিছু নেই। শুধু দুটো ছবি রাখা। এক দিকে আলাউদ্দিন খাঁয়ের ছবি। অন্য দিকে উদয়শঙ্করের ছবি। এই দু’জনই ছিলেন ওঁর জীবনের অনুপ্রেরণা। তবে আমার একটা আফসোস যে, আমার কখনও ওঁর রেওয়াজ দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু শুনেছি, যখন উনি রেওয়াজ করতেন, এই পারিপার্শ্বিকতা থেকে ঊর্ধ্বে উঠে যেতেন। আসলে আমাদের পরিবারের কেউ ধার্মিক নন, কিন্তু ভীষণরকম আধ্যাত্মিক।