• সমস্ত মামলায় জামিন সারদাকর্তা সুদীপ্ত সেনের! ১২ বছর ১১ মাস পরে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পাচ্ছেন তিনি, ঘটনাচক্রে, ভোটের মুখেই
    আনন্দবাজার | ০৮ এপ্রিল ২০২৬
  • সব মামলায় জামিন পেয়ে জেল থেকে মুক্তি পেতে চলেছেন সারদাকর্তা সুদীপ্ত সেন। ১২ বছর ১১ মাস জেলবন্দি তিনি। বর্তমানে প্রেসিডেন্সি জেলে রয়েছেন। ঘটনাচক্রে, আর কয়েক দিন বাদেই রাজ্যে ভোট। তার আগে সারদাকর্তার মুক্তির বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই জোর আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে।

    হাই কোর্টের বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজের ডিভিশন বেঞ্চ বুধবার রায় ঘোষণা করে তাঁকে রাজ্য পুলিশের হাতে থাকা দু’টি মামলায় জামিন দিয়েছে। ফলে তাঁর জেল থেকে বেরোনোর কোনও আইনি বাধা রইল না। তবে জামিনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্ত আরোপ করেছে আদালত। সম্ভবত বৃহস্পতিবার জেল থেকে ছাড়া পাবেন রাজ্যে চিটফান্ড কেলেঙ্কারিতে প্রধান অভিযুক্ত সুদীপ্ত সেন।

    সারদাকর্তার জামিন প্রসঙ্গে বেলেঘাটার তৃণমূল প্রার্থী কুণাল ঘোষ বলেন, ‘‘কারও জামিন হওয়া বা না-হওয়া আইন-আদালতের বিষয়। জামিন পাওয়া আইনের মধ্যেই পড়ে। সুদীপ্ত সেন জামিনের আবেদন করেছিলেন। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেছে। সুতরাং এটা নিয়ে আপাতত আলাদা করে কোনও ব্যাখ্যা বা মন্তব্যের কিছু নেই।’’

    আদালতের ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, মামলার বর্তমান অবস্থা দেখে আদালত মনে করছে অভিযুক্তকে জামিন দেওয়া উচিত। এত দিন বিচার ছাড়া জেলে রাখা অন্যায়। রাষ্ট্রের ভুলের জন্য কোনও আসামিকে শাস্তি দেওয়া যায় না। সুদীপ্তকে জামিনের একাধিক শর্তও দিয়েছে আদালত। হাই কোর্ট জানায়, মামলাকারীকে পাসপোর্ট জমা দিতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে যেতে হলে আদালতের অনুমতি লাগবে। বাড়ির ঠিকানা বদলালে তদন্তকারী অফিসারকে জানাতে হবে। কোনও আর্থিক কোম্পানির ব্যবসায় জড়িত থাকতে পারবেন না। এই মামলার সঙ্গে যুক্ত সাক্ষীদের প্রভাবিত করা যাবে না। এ ছাড়াও মোবাইল সব সময় 'লাইভ লোকেশন'-সহ চালু রাখতে হবে। সুদীপ্তকে মাসে এক বার থানায় হাজিরাও দিতে হবে। বিচারপ্রক্রিয়ায় সব রকম সহযোগিতাও করতে হবে সুদীপ্তকে।

    ২০১৩ সালে সারদা চিটফান্ড গ্রুপের কর্তা সুদীপ্তের বিরুদ্ধে বারাসত থানায় দু'টি মামলা দায়ের হয়। তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ এবং বহু মানুষের আমানত আত্মসাৎ অভিযোগ ওঠে। সুদীপ্তের আইনজীবী সাবির আহমেদ এবং সুজয় সরকারের বক্তব্য, তাঁর মক্কেল গর প্রায় ১৩ বছর ধরে জেলে রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে মোট ৩৮৯টি মামলা দায়ের হয়েছিল। তার মধ্যে ৩৮৭টিতে ইতিমধ্যে জামিন পেয়েছেন। এই দু'টি মামলাই শুধু জেলে আটকে রাখা হয়েছে। তাঁদের যুক্তি, একটি মামলায় চার্জশিট দেওয়ার পরেও ১০ বছর ধরে কাগজপত্র দেওয়া হয়নি। আর অন্য মামলার মূল নথি হারিয়ে গিয়েছে। ফলে এই দুই মামলায় বিচার কার্যত বন্ধ। সারদা কর্তার আইনজীবীদের বক্তব্য, সুদীপ্তের বয়স ৬৪ বছর। তিনি গুরুতর অসুস্থ। এত দিন কাউকে জেলে রাখা সম্ভাব্য সাজার থেকেও বেশি শাস্তি দেওয়া। যা সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে লঙ্ঘন করে।

    রাজ্যের বক্তব্য, সারদা কেলেঙ্কারি খুবই গুরুতর। বহু মানুষ প্রতারিত হয়েছেন। তবে তারা স্বীকার করেছে যে একটি মামলার নথি হারিয়ে গিয়েছে। এই অবস্থায় বিচার এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই কড়া শর্তে জামিন দিলে আপত্তি নেই। অন্য দিকে, কোর্টে সিবিআই জানায়, তাদের অধীনে থাকা ৭৭টি মামলায় সবকটিতেই অভিযুক্ত জামিন পেয়েছেন। তদন্ত এখন প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন আর সুদীপ্তকে জেলে রাখার বিশেষ প্রয়োজন নেই।

    হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণ, এই মামলাটি বিচার ব্যবস্থার ব্যর্থতা। অভিযুক্তকে ১০ বছরেও কাগজ না দেওয়া গুরুতর ভুল। মামলার নথি হারানো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অভিযুক্তের দ্রুত বিচারের অধিকার লঙ্ঘন হয়েছে। যেখানে বিচার শুরুই হয়নি সেখানে কাউকে বিনা বিচারে ১৩ বছর জেলে রাখা আদালত মনে করছে অত্যন্ত বেশি। সাজা ছাড়াই শাস্তি পেয়ে গিয়েছেন অভিযুক্ত। দুই বিচারপতির বেঞ্চ জানায়, ৩৮৯টির মধ্যে ৩৮৭টিতে জামিন পেয়ে গিয়েছেন। বাকি দু'টিতে জামিন না দেওয়া অযৌক্তিক। হাই কোর্টের রায়, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষার জন্য জামিন পাওয়া উচিত। সুদীপ্তকে জামিনে মুক্ত করতে হবে। ৫,০০০ টাকার বন্ডে দু'জন জামিনদার মারফত তিনি জামিন পাবেন। পাশাপাশি, হাই কোর্টের নির্দেশ, একটি মামলার হারিয়ে যাওয়া নথি দ্রুত পুনর্গঠন করতে হবে। নিম্ন আদালতকে প্রায় প্রতি দিন বিচার চালানোর চেষ্টা করতে হবে।

    প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার সারদাকর্তারজামিন মামলায় রাজ্যকে তুলোধনা করে কলকাতা হাইকোর্ট। ভর্ৎসনা করা হয় সিবিআইকেও। তার পর রায়দান স্থগিত রাখে আদালত। তার পর আটকে থাকা মামলায় জামিন দিল আদালত।

    প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালে সারদাকাণ্ড প্রকাশ্যে আসার পরে দেবযানীকে নিয়ে কাশ্মীরের সোনমার্গে গা-ঢাকা দিয়েছিলেন সংস্থার কর্ণধার সুদীপ্ত। ওই বছরই কাশ্মীর থেকে গ্রেফতার করা হয় তাঁদের। তখন থেকে দু’জনই জেলে রয়েছেন। ২০২৩ সালে অবশ্য কয়েক ঘণ্টার জন্য প্যারোলে ছাড়া পেয়েছিলেন দেবযানী। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন থানায় প্রতারিতেরা অভিযোগ জানান সারদা অর্থলগ্নি সংস্থার বিরুদ্ধে। পরে তদন্তভার হাতে নিয়ে সিবিআইও মামলা রুজু করে। পাশাপাশি ইডি এবং সেবি-ও সুদীপ্তের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেছে।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)