‘মৎস্যমুখী’ প্রচারে ঘি ঢাললেন মোদী! তৃণমূলের মাছ-তত্ত্ব নস্যাৎ করতে সওয়া পাঁচ মিনিট ধরে মৎস্য-চর্চা প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে
আনন্দবাজার | ১০ এপ্রিল ২০২৬
কাতলার মুখে দড়ি বেঁধে হাতে ঝুলিয়ে নিয়ে কেউ রাস্তায় ঘুরছিলেন। কেউ মাছবাজারে গিয়ে আঁশবটিতে বসছিলেন মাছ কাটতে। কেউ মাছ খেতে খেতে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন। কেউ জনতাকে সাক্ষী রেখে দরদান করে মাছ কিনছিলেন। এঁরা সকলেই এ বারের বিধানসভা নির্বাচনের বিজেপি প্রার্থী। বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাঙালির পাত থেকে মাছ-মাংস কেড়ে নেবে বলে যে তত্ত্ব তৃমমূল খাড়া করার চেষ্টা করছে, তা নস্যাৎ করার লক্ষ্যেই বিজেপি প্রার্থীদের এ রকম ‘মৎস্যমুখী’ প্রচারে নামার নির্দেশ দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। এ বার সে প্রচারের সুর বেঁধে দিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বললেন, ‘‘১৫ বছরের শাসনকালে তৃণমূল আপনাদের মাছও দিতে পারেনি। সেটাও বাইরে থেকে আনতে হচ্ছে।’’
বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গে মোদী তিনটি জনসভা করেছেন। প্রথম সভা ছিল পূর্ব মেদিনীপুরের হলদিয়ায়। সেখানে প্রধানমন্ত্রী ৩৩ মিনিটের মতো ভাষণ দেন। তার মধ্যে দু’দফায় সওয়া পাঁচ মিনিট ধরে তিনি শুধু পশ্চিমবঙ্গের মৎস্যজীবীদের কথা, মাছ চাষের কথা, বাঙালির পাতে মাছের পর্যাপ্ত জোগান রাখার জন্য নানা কেন্দ্রীয় উদ্যোগের কথা এবং রাজ্য সরকারের ‘অক্ষমতা’র কারণে রাজ্যে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি না-পাওয়ার কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর কথায়, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে সামনে বড় সম্ভাবনা রয়েছে মৎস্যচাষে উন্নতি করার, সমুদ্রজাত খাদ্যের উৎপাদনে উন্নতি করার। মেদিনীপুরের ক্ষেত্রে তো এটা বড় সক্ষমতা। কিন্তু পরিস্থিতি কেমন, তা জেনে আপনারা অবাক হবেন!’’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে মাছের এত চাহিদা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ এখনও মাছ চাষে আত্মনির্ভর নয়। আজও পশ্চিমবঙ্গ নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে অন্য রাজ্য থেকে মাছ আনায়।’’ মোদীর কটাক্ষ, ‘‘নিজেদের ১৫ বছরের শাসনে তৃণমূল আপনাদের মাছও দিতে পারেনি। সেটাও বাইরে থেকে আনতে হচ্ছে। এটা তৃণমূলের দুর্নীতির উদাহরণ।’’
বিজেপি বাঙালির পাত থেকে মাছ কেড়ে নেবে বলে যে তৃণমূল অভিযোগ করছে, সেই তৃণমূলের সরকারই বাঙালিকে পর্যাপ্ত মাছ জোগাতে ব্যর্থ— মোদী এ রকম বার্তাই দেওয়ার চেষ্টা করেন হলদিয়ার জনসভা থেকে। তার পরে বোঝানোর চেষ্টা করেন, যে কেন্দ্রীয় সরকার মৎস্যচাষ এবং মৎস্যজীবীদের উন্নয়নে কতটা সক্রিয়। তিনি বলেন, ‘‘গত ১১ বছরে ভারতের মাছ উৎপাদনের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। সমুদ্রজাত খাবর রফতানি দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু গোটা দেশে যা সাফল্যের সঙ্গে হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকারের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তৃণমূলের পাপের কারণে হয়নি।’’
বিজেপি বা এনডিএ সরকার যে সব রাজ্যে রয়েছে, সেখানে মাছ-মাংস খাওয়া বা বিক্রির উপরে বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে বলে তৃণমূল প্রচার চালাচ্ছে। মোদী সে প্রচারের কথা বৃহস্পতিবার উল্লেখ করেননি। কিন্তু তৃণমূলের অভিযোগের ঠিক বিপরীত বক্তব্য নিজের ভাষণে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘‘বিজেপি বা এনডিএ সরকার যেখানে যেখানে রয়েছে, সেখানে মাছ উৎপাদন দ্রুততার সঙ্গে বাড়ছে। আপনাদের প্রতিবেশী বিহারও এক সময়ে অন্য রাজ্য থেকে মাছ আনত। কিন্তু এনডিএ সরকারের নীতির কারণে বিহারে মাছ উৎপাদন দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। আজ বিহার অন্য রাজ্য থেকে মাছ আনায় না। বরং অন্য রাজ্যে পাঠায়।’’ মোদী দাবি করেন, ১০ বছর আগে অসমেও একই পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু বিজেপি জমানায় অসমও বিহারের মতোই মৎস্য উৎপাদনে ‘আত্মনির্ভর’ হয়েছে। অসমও এখন নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে অতিরিক্ত মাছ অন্যান্য রাজ্যে পাঠাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, গোটা দেশে মাছ উৎপাদনে যে উন্নতি করেছে, তার নেপথ্যে রয়েছে ‘প্রধানমন্ত্রী মৎস্য সম্পদ যোজনা’। কিন্তু সে প্রকল্পের নামে ‘পিএম’ (প্রধানমন্ত্রী) শব্দটি রয়েছে বলে এ রাজ্যের সরকার তা পশ্চিমবঙ্গে চালু হতে দিচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন। বিজেপি জমানায় কেন্দ্রীয় সরকারে পৃথক মৎস্য মন্ত্রক তৈরি এবং সে মন্ত্রকের জন্য ‘রেকর্ড বাজেট’ ঘোষণা হয়েছে বলে মোদী দাবি করেন।
সপ্তাহ খানেক ধরে পশ্চিমবঙ্গের এক জাঁক বিজেপি প্রার্থীর প্রচারে মাছের দাপট দেখা যাচ্ছিল। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশেই যে প্রার্থীরা তথা পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির নেতারা নিজেদের মৎস্যপ্রেমের ছবি তুলে ধরছিলেন, বিজেপি সূত্রেই তা জানা গিয়েছিল। তবে নেতৃত্বের নির্দেশেই যে তা হচ্ছে, সে কথা কেউ প্রকাশ্যে বলছিলেন না। বৃহস্পতিবার হলদিয়ার জনসভায় প্রধানমন্ত্রী যেমন ‘মৎস্যমুখী’ ভাষণ দিয়েছেন, তাতে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, তৃণমূলের তোলা মাছ-মাংস তত্ত্ব নস্যাৎ করতে দিল্লি এখন যথেষ্ট তৎপর।