‘গোপন কথা’ ফাঁস হতেই হুমায়ুন কবীরের সঙ্গ ছাড়লেন আসাদউদ্দিন ওয়েইসি। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর দল মজলিস-ই ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (মিম) একক ভাবেই লড়াই করবে। শুক্রবার ভোরে সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করে এই ঘোষণা করা হয়েছে। পরে পোস্টটি শেয়ার করেন ওয়েইসি নিজেও।
শুক্রবার ওয়েইসির দলের তরফে ওই পোস্টে লেখা হয়, “মুসলিমদের আত্মসম্মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, এমন কোনও বিবৃতির সঙ্গে নিজেদের জড়াতে চায় না মিম। আজ থেকে মিম (হুমায়ুন) কবীরের দলের সঙ্গে জোট ভেঙে দিচ্ছে।”
ওয়েইসির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করা হলে হুমায়ুন বলেন, “ওঁর (ওয়েইসি) সিদ্ধান্ত উনি নিতেই পারেন। এই ব্যাপারে আমি কোনও মন্তব্য করতে রাজি নই। ওয়েইসি সাহেবকে আমি ব্যক্তিগত ভাবে সম্মান করি। ওঁর প্রতি আমার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা রয়েছে। ভবিষ্যতেও থাকবে। গত ২৫ মার্চ কলকাতায় আমার সঙ্গে সাংবাদিক বৈঠক করে উনি জোট গড়ে বিধানসভা নির্বাচনে লড়ার কথা বলেছিলেন। আমি যতদূর জানি, মোট ১৪টি আসনে ওঁর দল মনোনয়ন তুলেছে।” ‘গোপন’ ভিডিয়ো প্রসঙ্গে হুমায়ুন বলেন, “তৃণমূল একটা কারসাজি করেছে। আমার উল্টো দিকে কোন ব্যক্তি বসে, তা যাচাই করা হয়নি।” একই সঙ্গে তাঁর সংযোজন, “আমি ভীত নই, চিন্তিতও নই। আমার দল ১৮২টি আসনে লড়ছে। সেখানে যথাযথ ভাবে প্রচার চলবে। আমি আশাবাদী যে, আমরা উল্লেখযোগ্য ফলাফল করে দেখাব। মানুষ আমাকে সমর্থন করবে।” বৃহস্পতিবারই হুমায়ুন দাবি করেছিলেন, কৃত্রিম মেধা (এআই) ব্যবহার করে ভিডিয়োটি তৈরি করা হয়েছে। ভিডিয়োর সত্যতা প্রমাণ করতে না পারলে হাই কোর্টে মামলা করারও হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন ভরতপুরের বিদায়ী বিধায়ক।
প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার বেলায় কলকাতায় একটি সাংবাদিক বৈঠক করে আমজনতা উন্নয়ন পার্টির নেতা হুমায়ুনের ‘গোপন কথা’ ফাঁস করেছিল তৃণমূল। ভিডিয়োটিতে তারিখ উল্লেখ রয়েছে গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর। ১৯ মিনিটের ওই ভিডিয়োয় বিজেপির সঙ্গে হুমায়ুনের ‘গোপন আঁতাঁত’-এর কথা উঠে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তৃণমূলের ‘ফাঁস’ করা ওই ভিডিয়োয় ১০০০ কোটি টাকা চাইতে দেখা যাচ্ছে হুমায়ুনকে। তার মধ্যে ২০০ কোটি টাকা ‘যত দ্রুত সম্ভব’ দাবি করছেন তিনি। ভিডিয়োয় বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীকে ‘পুরো সাপোর্ট’ দেওয়ার কথা বলেছেন হুমায়ুন। (যদিও ওই ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম)
জোট ভাঙার জন্য নির্দিষ্ট কোনও ঘটনার কথা উল্লেখ না-করা হলেও মনে করা হচ্ছে, হুমায়ুনের ‘গোপন’ ভিডিয়ো ফাঁস হয়ে যাওয়ার কারণেই তাঁর সঙ্গে দূরত্ব বাড়াতে চাইছে ওয়েইসির দল। শুক্রবার ভোরে মিমের তরফে প্রকাশিত বিবৃতিতে আরও লেখা হয়েছে যে, “বাংলার মুসলিমেরা অন্যতম দরিদ্র, অবহেলিত এবং শোষিত সম্প্রদায়। বহু দশকের ধর্মনিরপেক্ষ শাসনেও তাদের জন্য কিছু করা হয়নি।” তার পরেই মিম-এর অবস্থান ব্যাখ্যা করে ওই বিবৃতিতে লেখা হয়েছে, “প্রান্তিক গোষ্ঠীকে স্বাধীন রাজনৈতিক স্বর পাইয়ে দিতে আমরা কোনও রাজ্যে নির্বাচনে লড়ে থাকি। আমরা পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে একক ভাবে লড়ব এবং কোনও দলের সঙ্গে জোট করব না।”
প্রসঙ্গত, ওয়েইসি এবং হুমায়ুনের হাত মেলানোর নেপথ্যে রাজ্যে সংখ্যালঘু ভোটের অঙ্ক কাজ করেছিল বলে মনে করেন অনেকে। হুমায়ুনকে পাশে নিয়ে হায়দরাবাদের সাংসদ ওয়েইসি বলেছিলেন, ‘‘আমরা এখানে বেশি আসন চাই না। এখানে আমাদের সঙ্গী (হুমায়ুন)-কে সঙ্গ দিতে এসেছি।’’ সাংবাদিক বৈঠকে ওয়েইসিকে ‘বড় ভাই’ বলে সম্বোধন করেছিলেন হুমায়ুন। ওই সাংবাদিক বৈঠকে হুমায়ুন জানিয়েছিলেন, ওয়েইসির সঙ্গে যৌথ ভাবে ২০টি সভা করবেন তিনি। ঘোষণা মোতাবেক, প্রথম সভাটি হয়েছিল গত ১ এপ্রিল বহরমপুরে। শেষ সভাটি হওয়ার কথা ছিল কলকাতায়। তার আগেই দুই দলের জোট ভাঙল।
রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল অবশ্য বার বারই অভিযোগ করে এসেছে যে, হুমায়ুন এবং ওয়েইসির দল ভোট কেটে বিজেপির সুবিধা করে দিতে চাইছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও একাধিক প্রচারসভায় নাম না করে হুমায়ুন এবং ওয়েইসিকে আক্রমণ করেছেন। মালদহের ঘটনার জন্যও ওই দুই দলকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সম্প্রতি নদিয়ার নাকাশিপাড়ার সভা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে তোপ দেখে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “মিম নামক একটি সাম্প্রদায়িক শক্তিকে নিয়ে আপনি বিহারে লড়াই করেছিলেন। এখানেও করছেন।”