শনিবারের ধুন্ধুমার! দুই পক্ষের দুই মুখ ফের সম্মুখসমরে, মোদী বনাম মমতা তরজায় সঙ্গতে দুই সেনাপতি শাহ এবং অভিষেক
আনন্দবাজার | ১২ এপ্রিল ২০২৬
এক দিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্য দিকে, নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ। নির্বাচনমুখী পশ্চিমবঙ্গে শনিবার যুযুধান দু’পক্ষ তৃণমূল এবং বিজেপি সর্বশক্তি নিয়ে নামল ভোটের প্রচারে।
ভোটের প্রচারে দুই শিবিরের কেউ কাউকে এক ইঞ্চিও জমি ছাড়তে নারাজ। জেলায় জেলায় ঘুরলেন দুই দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। তৃণমূলনেত্রী মমতা এবং দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা অভিষেক সম্মিলিত ভাবে করলেন পাঁচটি জনসভা, একটি রোড শো। প্রচারের ময়দানে তৃণমূলের দুই সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে দৃশ্যত টক্কর দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। বিজেপির দুই শীর্ষনেতাও জেলায় জেলায় ঘুরে প্রচার সারলেন। রোড শো করলেন। হল ছয় জনসভা এবং এক রোড শো।
শাহ শুক্রবার থেকেই রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গে। সভা করেছেন। রোড শো করেছেন। শনিবার রাজ্যে এসেছেন মোদীও। এক দিকে মমতা এবং তাঁর সেনাপতি অভিষেক, অন্য দিকে মোদী এবং তাঁর সেনাপতি শাহ— আক্রমণ এবং প্রতি আক্রমণের ঝাঁজ তুঙ্গে উঠল শনিবারের প্রচারে। শনিবার মোদীর প্রচার কর্মসূচি ছিল পূর্ব বর্ধমানে। একই দিনে পূর্ব বর্ধমান জেলারই অপর প্রান্তে প্রচার করেন অভিষেক। একই দিনে আবার বাঁকুড়া জেলার দুই ভিন্ন প্রান্তে সভা করলেন মমতা এবং শাহও। মোদী যখন পূর্ব বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, দক্ষিণ দিনাজপুর ঘুরে ঘুরে আক্রমণ শানাচ্ছেন তৃণমূলকে, তখন বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রামের সভা থেকে বিজেপি-কে পাল্টা আক্রমণে বিঁধলেন মমতা। শাহ আবার তোপ দাগলেন বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ঘুরে ঘুরে। অভিষেকও শনিবার ঘুরে ঘুরে বিজেপি-কে নিশানা করলেন পূর্ব বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ থেকে।
শনিবার মোদী পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া, মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর এবং দক্ষিণ দিনাজপুরে কুশমণ্ডিতে সভা করেন। সন্ধ্যায় শিলিগুড়িতে পৌঁছে একটি রোড শো-ও করেন তিনি। অন্য দিকে, মুর্শিদাবাদের রেজিনগর, বীরভূমের সাঁইথিয়ায় সভা করলেন অভিষেক। শেষে পূর্ব বর্ধমানের মেমারিতে করলেন রোড শো-ও। রোড শো শেষে গাড়ির উপরে দাঁড়িয়ে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে বার্তা দিলেন। অন্য দিকে, তৃণমূলনেত্রী মমতা শনিবার সভা করলেন বাঁকুড়ার বড়জোড়ায়। ঝাড়গ্রাম এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশিয়ারিতেও সভা করেন তিনি। একই দিনে বাঁকুড়ার ওন্দা এবং ছাতনায় জোড়া জনসভা সারলেন শাহ। পরে পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডিতেও জনসভা করেন তিনি। আক্রমণ এবং পাল্টা আক্রমণে উঠে এল রাজ্যে এসআইআর-এ প্রসঙ্গও। মোদী-শাহেরা দেখাতে চাইলেন এসআইআর-এর ‘সুফল’, মমতা-অভিষেকেরা করলেন প্রক্রিয়ার সমালোচনা। কী কী উঠে এল শনিবারের প্রচারে?
এ বারের বিধানসভা ভোটে তৃণমূল এবং বিজেপি উভয় শিবিরের কাছেই অন্যতম বড় ‘অস্ত্র’ হল এসআইআর। বিজেপির দাবি, এসআইআর-এর মাধ্যমে ভুয়ো ভোটার এবং অনুপ্রবেশকারীদের নাম বাদ গিয়েছে। অন্য দিকে তৃণমূলের দাবি, এসআইআর-এর নাম করে পশ্চিমবঙ্গবাসীকে ‘হেনস্থা’ করা হচ্ছে। নির্বাচনী প্রচার পর্বে প্রায় প্রতিদিনই এই বিষয়টি উঠে আসছে। শনিবারও তা-ই হল। মমতা এবং তৃণমূলকে আক্রমণ শানিয়ে শাহ বলেন , “নির্বাচন কমিশন এসআইআর করছে। অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছে। আর মমতা দিদির সমস্যা শুরু হয়ে গিয়েছে। এটা তো সবে শুরু হয়েছে। এখন ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। আমাদের সরকার গড়ুন, আমরা ওদের পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাড়াব।” অন্য দিকে অভিষেক পাল্টা বিজেপি-কে বিঁধে প্রশ্ন তুলেছেন হিন্দু ভোটারদের নাম বাদ যাওয়া নিয়ে। হিন্দুত্বের কথা বললেও কী ভাবে এসআইআর-এর পরে প্রায় ৫৮ লক্ষ হিন্দুর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেল, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক।
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সফরের সময়ে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে ‘অপমানের অভিযোগ’ ঘিরে তুঙ্গে উঠেছিল রাজ্য রাজনীতি। তার আঁচ গিয়ে পড়ে দিল্লিতেও। এ বার ভোটের প্রচারে রাষ্ট্রপতির প্রসঙ্গ টেনে ফের তৃণমূলকে বিঁধলেন মোদী। শনিবার তিনি বলেন, ‘‘বাংলার রাজবংশী সমাজ, সাঁওতাল সমাজের ভূমিকা রয়েছে ভারতের উন্নতিতে। অনেক নায়ক রয়েছেন। তাঁদের জন্য আমরা গর্বিত।” একই সঙ্গে রাজ্যের শাসকদলকে আক্রমণ শানিয়ে তাঁর তোপ, “তৃণমূল সাঁওতাল সমাজকে অপমান করে। রাষ্ট্রপতি মুর্মু এসেছিলেন কিছু দিন আগে। তৃণমূল সংবিধানের মর্যাদা দেয়নি। আদিবাসী সমাজকে অপমান করেছে। তৃণমূলকে সবক শেখানো দরকার। তৃণমূল কখনও আদিবাসী উন্নয়নের শরিক হয়নি।’’ সাঁওতাল এবং রাজবংশীদের অবহেলার অভিযোগে শাহও বিঁধেছেন তৃণমূলকে।
আদিবাসী সমাজের উদ্দেশে কেশিয়ারির সভা থেকে বার্তা দেন মমতাও। বিজেপি-কে বিঁধে তিনি বলেন, ‘‘ক’বার আদিবাসীদের উৎসবে এসেছে? আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে প্রতি বার আমি এসেছি। মনে রাখবেন, জঙ্গলের অধিকার আদিবাসীদের ফিরিয়ে দিয়েছি। আমরা আইন করে বলেছি জোর করে আদিবাসীদের জমি দখল করা যাবে না। সাধারণ মানুষের জমিও কেউ জোর করে দখল করতে পারেন না।’’ ঝাড়গ্রামের জামদা ময়দানের সভা থেকেও আদিবাসীদের ধর্ম সংক্রান্ত প্রশ্ন তোলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা। তাঁর প্রতিশ্রুতি, বিধানসভা ভোটে জিতে তৃণমূল ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করলে আদিবাসীদের সারি-সরনা ধর্মকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নাম না করে ‘বিরসা মুন্ডার মূর্তিতে মালা বিতর্কে’র পুরনো প্রসঙ্গও তোলেন তিনি।
বিজেপিশাসিত উত্তরাখণ্ডে ইতিমধ্যে অভিন্ন দেওয়ান বিধি চালু হয়েছে। গুজরাতের বিধানসভাতেও এই সংক্রান্ত বিল পাশ হয়েছে। একই পথে এগোচ্ছে বিজেপিশাসিত মধ্যপ্রদেশও। এ বার পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলে এ রাজ্যেও অভিন্ন দেওয়ান বিধি চালু হবে বলে জানিয়েছেন অমিত শাহ। শনিবার বাঘমুন্ডির সভা থেকে সেই বার্তা দিয়েছেন তিনি। পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশিয়ারির সভা থেকে অভিন্ন দেওয়ান বিধি নিয়ে বিজেপি-কে আক্রমণ শানিয়েছেন মমতাও। তিনি বলেন, ‘‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড মানে কী? একটাই বিজেপি, একটাই নীতি। একটাই বিজেপি, একটাই বিধর্ম। একটাই বিজেপি, সর্বধর্মের সর্বনাশ। আমরা পুরোপুরি এটার বিরোধিতা করব। এখন সবাই যখন নির্বাচনে ব্যস্ত আছে, এখন বিলগুলি আনতে হচ্ছে? আজকে তুমি বিল পাশ করবে, কালকে তুমি ক্ষমতায় থাকবে না। আমরা বাতিল করে দেব। তুমি যা যা স্বেচ্ছাচারী বিল করেছ, সব বাতিল করে দেব আমরা।’’
শনিবার জঙ্গিপুরের সভা থেকে নাম না করে রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ টানেন মোদী। তিনি বলেন, ‘‘যুবসমাজকে ঠকিয়েছে তৃণমূল। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তে দেখা গেল, শিক্ষামন্ত্রীর ঘনিষ্ঠের বাড়িতে কোটি কোটি নগদ টাকা! বিজেপি ক্ষমতায় এলে এগুলো আর চলবে না। সব হিসাব হবে।’’ ঘটনাচক্রে শনিবারই সকালে পার্থের নাকতলার বাড়িতে ফের হানা দেয় ইডি। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা তাঁর বাড়িতে ছিলেন ইডির আধিকারিকেরা।