মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ভোটের আগে অন্তর্বর্তী বাজেটে লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পে মহিলাদের মাসিক ভাতা ১,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৫০০ টাকা করে দিয়েছিলেন। তার জন্য এই খাতে বরাদ্দ ২৭,৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪২,৫০০ টাকা করতে হয়েছিল তৃণমূল সরকারকে। অমিত শাহ ঘোষণা করেছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে মহিলাদের প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে দেবে। সহজ হিসেবে এর অর্থ, তখন সরকারকে মহিলাদের ভাতা প্রকল্পে দ্বিগুণ অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। অর্থাৎ, ৮৫ হাজার কোটি টাকা।
ভোটের আগে তৃণমূল সরকার যুব-সাথী নামে বেকার ভাতা চালু করে মাসে ১,৫০০ টাকা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। তাতে বরাদ্দ হয়েছিল ৫ হাজার কোটি টাকা। বিজেপি ইস্তাহারে ঘোষণা করেছে, তারা ক্ষমতায় এলে দ্বিগুণ বেকার ভাতা বা ৩ হাজার টাকা দেবে। অর্থাৎ, সরকারকে তখন ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করতে হবে।
এত টাকা আসবে কোথা থেকে?
কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের অধীনস্থ সংস্থা ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক ফিনান্স অ্যান্ড পলিসি’ তার রিপোর্টে বলেছিল, পশ্চিমবঙ্গে লক্ষ্মীর ভান্ডার থেকে কন্যাশ্রীর মতো প্রকল্প আসলে ধারের টাকায় চলে। রাজ্যের অন্তর্বর্তী বাজেট অনুযায়ী, রাজ্য সরকারকে চলতি অর্থ বছরে ১ লক্ষ কোটি টাকারবেশি ঋণ নিতে হবে। রাজ্যের জিডিপি-র তুলনায় জমা ঋণের হার এমনিতেই ৩৮ শতাংশ।
মহারাষ্ট্রে বিজেপি সরকার মহিলাদের মাসে ১,৫০০ টাকা করে দেওয়ার জন্য ‘লাডকি বহিন’ প্রকল্প চালু করেছিল। কিন্তু সেই টাকা দিতে গিয়ে পেনশনের তহবিলে টান পড়েছে। শুক্রবার যখন অমিত শাহ কলকাতায় বিজেপির ইস্তাহারে মহিলাদের ৩ হাজার টাকা ভাতার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করছেন, সেই সময়ই বম্বে হাই কোর্ট মহারাষ্ট্রের বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারকে পেনশন তহবিলে টাকা না থাকলে ‘লাডকি বহিন’ যোজনা বন্ধ করে দিতে বলেছে। তা হলে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলে মহিলা, বেকারদের ভাতা দিতে কি আরও ঋণ করবে?
প্রশ্নের উত্তরে বিজেপির রাজ্য নেতাদের বক্তব্য, কেন্দ্রে ও রাজ্যে বিজেপি সরকার এলে রাজ্যে বিজেপি সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে পশ্চিমবঙ্গের জন্য আর্থিক প্যাকেজ নিয়ে আসবে। তা ছাড়া মমতার সরকারের দুর্নীতির ফলে রাজ্যে বহু প্রকল্পে কেন্দ্র টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। চা-বাগানের উন্নয়নের মতো বহু কেন্দ্রীয় প্রকল্পে রাজ্য সরকার কোনও টাকাই নেয়নি। বিজেপি ক্ষমতায় এলে সেই সব প্রকল্পেও রাজ্যে টাকা আসবে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির মহিলাদের জন্য দ্বিগুণ ভাতাকে শুক্রবারই মিথ্যে প্রতিশ্রুতি বলে তকমা দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়রা। মমতার প্রশ্ন ছিল, বিজেপি বিহারে মহিলাদের টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ক্ষমতায় এসে অবধি এক টাকাও দেয়নি। শনিবার বিহারের বিরোধী দল আরজেডি-র সাংসদ মনোজ ঝা বলেন, ‘‘অমিত শাহ বলছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গেরমহিলারা ৩ হাজার টাকা করে পাবেন। বিহারের মহিলারা কী দোষ করলেন? তাঁদের ভোটের আগে এককালীন ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হল। তার পরে সব শূন্য কেন? বিজেপি যে কথা দিয়েছিল, সবাইকে ২ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হবে!”
একই প্রশ্ন তুলেছেন দিল্লির আপ সরকারের নেতারাও। তাঁদের বক্তব্য, গত বছর দিল্লিতে বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, রাজ্যে তারা ক্ষমতায় এলে মহিলাদের ২৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। বছর পেরিয়ে গেলেও দিল্লির বিজেপি সরকার এখনও সেই প্রকল্পই চালু করেনি!
এক সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নগদ টাকা বিলিকে ‘রেউড়ি’ বা তিলগুড়ের মিষ্টি বিলির খয়রাতির রাজনীতি বলে এর বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। গত লোকসভা ভোটে আসন কমে যাওয়ার পরে বিজেপি সেই খয়রাতি রাজনীতিকেই আঁকড়ে ধরেছে। কিন্তু জানুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের আর্থিক সমীক্ষাই জানিয়েছে, যে হারে রাজ্যে রাজ্যে বিনা শর্তে নগদ ভাতা প্রকল্পের মাত্রা বাড়ছে, তাতে রাজ্যগুলির কোষাগারের অবস্থা করুণ হচ্ছে। নগদ টাকা বিলি করতে গিয়ে রাজ্যের জিডিপি-র ০.৯ থেকে ১.২৫ শতাংশ পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। জনমোহিনী রাজনীতি করতে গিয়ে পরিকাঠামোর মতো যে সব ক্ষেত্রে খরচ করলে আর্থিক বৃদ্ধি বাড়তে পারে, সেখানে ব্যয় কমছে। বসে বসে হাতে টাকা পেয়ে যাওয়ায় মহিলাদের কাজের বাজারে অংশগ্রহণও কমে যাচ্ছে। অনেকেই নিজেদের রোজগারের জন্য তৈরি করা বা দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন না।
২০২৪-এ মহারাষ্ট্রে ক্ষমতা ধরে রাখতে বিজেপি ভোটের আগে ‘লাডকি বহিন’ প্রকল্প ঘোষণা করেছিল। এখন প্রায় দেড় কোটি মহিলাকে মাসে ১৫০০ টাকা করে দিতে গিয়ে মহারাষ্ট্রের দেবেন্দ্র ফডণবীসের সরকার অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের পেনশন দিতে পারছে না। বম্বে হাই কোর্ট বলেছে, ‘পেনশনের টাকা না থাকলে লাডকি বহিন বন্ধ করুন। কোষাগারে টাকা না থাকলে সরকারি অফিসের চেয়ার, টেবিল, এসি, দামি গাড়ি বেচে দিন। পেনশন দিতেই হবে।’
কংগ্রেস নেতা রণদীপ সিংহ সুরজেওয়ালা বলেন, ‘‘বিজেপি মহিলাদের প্রতারণা করে চলেছে। প্রথমে মহারাষ্ট্রে ৯০ লক্ষ মহিলাকে লাডকি বহিন প্রকল্প থেকে বাদ দিয়েছিল। এখন বলছে, সরকারের কাছে টাকাই নেই!’’ মধ্যপ্রদেশেও লক্ষ্মীর ভান্ডারের অনুকরণে চালু করা লাডলি বহিন প্রকল্প শুরুর সময় যে সংখ্যক মহিলাকে এই টাকা দেওয়া হত, সেই সংখ্যা এখন বেশ কয়েক লাখ কমেছে বলে অভিযোগ কংগ্রেসের।