• নাম তুলতে ভরসা সংবিধানের ১৪২-এ
    আনন্দবাজার | ১২ এপ্রিল ২০২৬
  • জনপ্রতিনিধিত্ব আইন বলছে, কোনও বিধানসভা কেন্দ্রে মনোনয়ন শেষের পরে ভোটার তালিকায় আর কোনও নাম যোগ হতে পারে না। আর পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফায় ১৫২টি ও দ্বিতীয় দফায় ১৪২টি কেন্দ্রেই মনোনয়ন শেষ হয়ে গিয়েছে। নির্বাচন কমিশন ৬ এপ্রিল এবং ৯ এপ্রিল প্রথম এবং দ্বিতীয় দফার আসনগুলির চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশও করেছে।

    তবে রাজ্য সরকার এবং তৃণমূল কংগ্রেসের আইনজীবীদের বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্ট এর পরেও সংবিধানের ১৪২-তম অনুচ্ছেদে দেওয়া ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আপিল ট্রাইবুনালে ছাড়পত্র পাওয়া মানুষের নাম ভোটার তালিকায় যোগ করার নির্দেশ দিতে পারে। এই অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টকে পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আইনে কোনও ব্যবস্থা না থাকলেও সুপ্রিম কোর্ট কোনও বিষয়ে ‘সম্পূর্ণ ন্যায়’ নিশ্চিত করতে যে কোনও ডিক্রি বা নির্দেশ জারি করতে পারে।

    সোমবার সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর মামলার শুনানি। ২৩ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফায় ভোটগ্রহণ। তার ১০ দিন আগে সোমবারের শুনানি গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে বলে শাসক শিবির মনে করছে। শুনানিতে রাজ্য সরকার, তৃণমূলের মামলাকারী সাংসদদের তরফে আর্জি জানানো হবে, আইন অনুযায়ী ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার দিন ক্ষণ পেরিয়ে যাওয়ার পরে এবং ভোটগ্রহণের আগে ট্রাইবুনালে যাঁরা ছাড়পত্র পাবেন, তাঁদের ভোটার তালিকায় নাম তোলা হোক। পাসপোর্ট থাকা সত্ত্বেও ‘বিবেচনাধীন’ ভোটার তালিকা থেকে নাম খারিজ হয়ে গিয়েছে, এমন ১৩ জন ভোটারও সুপ্রিম কোর্টে নতুন মামলা করেছেন। তাঁদের তরফেও আর্জি জানানো হবে, ট্রাইবুনাল তাঁদের আর্জির ফয়সালা করে এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ দিক।

    তথ্যগত অসঙ্গতির মাপকাঠিতে ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় ৬০ লক্ষ ভোটারের মধ্যে ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম খারিজ হয়ে গিয়েছে। তাঁদের সামনে ট্রাইবুনালে আবেদনের সুযোগ রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী শ্যাম দিভান এর আগেই শুনানিতে আর্জি জানিয়েছিলেন, যাঁরা ট্রাইবুনালে ছাড়পত্র পাবেন, তাঁদের জন্য অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করে ভোটদানের সুযোগ দেওয়া হোক। আইনজীবীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা তৈরির দিনক্ষণ বাড়ানো হবে কি না, সুপ্রিম কোর্ট সে বিষয়ে বিচারের সম্ভাবনা খোলা রেখেছে। সোমবারের শুনানিতেই এই প্রশ্নের বিবেচনা হবে বলে জানিয়েছে। যাঁরা প্রথম দফার ১৫২টি বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার, তাঁদের আপিলের শুনানি যাতে আগে ট্রাইবুনালে হয়, তা-ও দেখতে বলেছে।

    মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী দিভান আর্জি জানিয়ে রেখেছেন, ভোটের আগে যাঁদের আবেদন ট্রাইবুনালে ফয়সালা হবে না, তাঁদেরও ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক। কারণ, তাঁরা সকলেই ‘ম্যাপড’ ভোটার। প্রত্যেকেই ২০০২ থেকে ভোট দিয়ে আসছেন। আইনজীবীদের একাংশের বক্তব্য, জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ২১(৩) ধারায় বলা হয়েছে, যতক্ষণ না ভোটার তালিকায় সংশোধনের কাজ শেষ হবে, তত ক্ষণ ভোটার তালিকা সংশোধন শুরু হওয়ার সময়ে যে ভোটার তালিকা ছিল, সেটাই বলবৎ থাকবে। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর এখনও শেষ হয়নি। কাজেই যাঁরা ভোটার তালিকায় এখন রয়েছেন, তাঁদের ভোট দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। অন্য আইনজীবীদের বক্তব্য, ওই আইনেই ২৩(৩) ধারায় বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পরে আর সেখানে নতুন নাম যোগ করা যায় না।

    নির্বাচন কমিশন সূত্রের বক্তব্য, তাদের তরফেও অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশে আপত্তি তোলা হবে। কারণ, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করে তা রাজনৈতিক প্রার্থী, ভোটের কাজে নিযুক্ত আধিকারিকদের হাতে দিতে হয়। ভোটগ্রহণের দু’-তিন দিন আগে পর্যন্ত ভোটার তালিকায় রদবদল করা হলে প্রক্রিয়াগত সমস্যা তৈরি হবে। তা ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা বলেছেন, পরবর্তী ভোটের জন্য ট্রাইবুনালে গিয়ে আপিল করে ভোটার হিসেবে ছাড়পত্র নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

    তা হলে কী ভাবে আগামী এক সপ্তাহে কোনও ভোটার ট্রাইবুনালে ছাড়পত্র পেলে, ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম যোগ করা সম্ভব? এ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ১৪২-তম অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে বলে আইনজীবীদের বক্তব্য। প্রবীণ আইনজীবী বিশ্বজিৎ দেব বলেন, ‘‘ভোটের অধিকার মানুষের বিধিবদ্ধ অধিকার। সেই অধিকার রক্ষা করতে সুপ্রিম কোর্ট ১৪২-তম অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করে সুবিচারদিতে পারে।’’
  • Link to this news (আনন্দবাজার)