কত সাল হবে সেটা? সম্ভবত আশির দশকের মাঝামাঝি। কারখানা অধ্যুষিত এক মফস্সল। কালীপুজো শেষ হয়েছে। বাতাসে তখন খানিক হিমেল ছোঁয়া টের পাওয়া যেত। তেমনই হিম আর জ্যোৎস্নায় মাখামাখি একটা রাত। তথাকথিত ভদ্রাঞ্চল যেখানে শেষ, সেই সীমানায় এক পল্লিতে মঞ্চানুষ্ঠান। তখন সারা রাত মাইক চললেও কারওর কিছু বলার ছিল না। সেখানে সারা রাত্রি ব্যাপী বিচিত্রানুষ্ঠান। তখন জমানা কণ্ঠ-কণ্ঠীদের। মানে বিখ্যাত গায়কদের গানের কভার ভার্সন গাইতেন যাঁরা, তাঁদের। রাত দশটা নাগাদ রফিকন্ঠী মঞ্চে উঠে এগারোটাতেই নেমে পড়লেন। কিশোর-কণ্ঠীর আবির্ভাব অনেক দেরিতে। এমন সময়েই মঞ্চে আগমন মিস লায়লার। তিনি মঞ্চে প্রবেশ করলেন ‘লায়লা ম্যাঁয় লায়লা’ গাইতে গাইতে। মঞ্চে তখন ডিস্কোবর্ণালির আলোর বল হিমজ্যোৎস্নাকে প্রায় পুলকিত যামিনী করে তুলেছে। এমন সময় মিস লায়লা স্টেজে ছড়ানো কৃত্রিম ধোঁয়ার কুণ্ডলীকে দুহাতে ঠেলতে ঠেলতে গেয়ে উঠলেন— ‘রাত বাকি, বাত বাকি/ হোনা হ্যায় যো, হো যানে দো’। মদিরামাখানো আশাকণ্ঠের গানটি তখন যিনি গাইছেন, তিনি সেই গানের মূল গায়িকার কতখানি ধারেকাছে পৌঁছতে পেরেছিলেন, আজ বলা শক্ত। কিন্তু সেই হিমরজনীতে মধ্যরাত পার করে একের পর এক আশা ভোসলে আছড়ে পড়ছিলেন মাঠে। কখনও ‘একটা দেশলাই কাঠি জ্বালাও’, কখনও বা ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে জিস দিল কো’, কখনও বা ‘ইয়ে মেরা দিল প্যার কা দিওয়ানা’। ঘড়ির কাঁটা পার করে দিচ্ছিল আশাকণ্ঠ। কখনও বা রাহুলদেব বর্মণের কড়ামিঠে গলায় ‘মনিকা, ও মাই ডার্লিং’-গোছের ঠেকা দিয়েছেন সহশিল্পী কেউ। কিন্তু সেই রাত তখন আশা ভোসলের। মুম্বই থেকে সহস্র যোজন দূরত্বে, বলিউডের রোশনাইয়ের ঝিম আলোটুকুও যাঁদের কোনও দিন গায়ে পড়বে না, সেই সব মাথার ঘাম পায়ে ফেলা মানুষের দল, দেশি মদ আর বিড়ির গন্ধের মধ্যেই খুঁজে পাচ্ছিলেন এমন কিছুকে, যা হয়তো মিস লায়লা নাম্নী সে দিনের সেই শিল্পী কল্পনাও করতে পারবেন না। শ’দুয়েক মানুষের চোখের সামনে তখন ভেসে বেড়াচ্ছেন পারভিন ববি বা জিনত আমন, সেই ভাসমান পরাবাস্তবের আড়ালে স্থগিত রয়েছেন আশা ভোসলে নামের এক কিন্নরকণ্ঠী মানবী, যাঁকে কোনও দিনই চর্মচক্ষে দেখা হবে না এই সব মানুষের। সেই রাতে কিশোর-কণ্ঠী গায়কের মঞ্চে উঠতে বেশ দেরিই হয়ে গিয়েছিল। ‘আশা’-কে মঞ্চ থেকে নামাতে গেলেই উদ্যোক্তারা হুড়ো খাচ্ছিলেন জনতার। বেশ কসরত করে, আসছে বছর আবার হবে-টবে বলে গায়িকাকে স্টেজ থেকে নামাতে হয়।
বিষয়টা ভাবার। নব্বইয়ের দশকে যখন এফএম প্রচারতরঙ্গ চালু হল আকাশবাণীতে, উপস্থাপক উপস্থাপিকারা বারংবার একই অনুরোধ পেতেন ফোনে— “দাদা/ দিদি, একটা কিশোর কুমারের গান শোনাবেন?” আসমুদ্র হিমাচলে যখন কিশোর কুমার নামক কিংবদন্তির ছায়া লম্বমান, তখন পুরুষ শাসিত বলিউডে, মহাপৌরুষ দেখানো একের পর এক সিনেমায় কোণঠাসা নায়িকা বা নেহাত আইটেম ললনাদের ওষ্ঠে উঠে আসা সেই সব গানের চাহিদা কি তবে ছিল অন্তঃসলিলা? এক বার সেই ফল্গুস্রোতকে বাইরে নিয়ে আসতে পারলেই যাবতীয় ম্যাস্কুলিনিটি উধাও? আশা ভোসলে নামক কণ্ঠটির জাদু বোধহয় এইখানেই।
আশা ভোসলের জন্ম ১৯৩৩ সালে তৎকালীন দেশীয় রাজ্য সাঙ্গলির গোয়ার নামে এক জনপদে (পরে মহারাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত)। বাবা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতশিল্পী পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর এবং মা শেবন্তী দীননাথ। আশার বয়স যখন ৯, তখনই তাঁর পিতৃবিয়োগ ঘটে। বিভিন্ন শহর ঘুরে মঙ্গেশকর পরিবার এসে পড়ে তৎকালীন বোম্বাইয়ে। পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব এসে পড়ে আশা ও তাঁর প্রতিভাময়ী দিদি লতা মঙ্গেশকরের উপর। ১৯৪৩-এ মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি প্রথম প্লেব্যাক করেন মরাঠি ছবি ‘মাঝা বল’-এ। ১৯৪৮ সালে প্রথম হিন্দি ছবিতে গান গাওয়া। ছবির নাম ‘চুনরিয়া’, কিন্তু একেবারে একক ভাবে গাওয়ার সুযোগ আসে ১৯৪৯-এ ‘রাত কি রানি’ নামের এক ছবিতে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে আশা পরিবারের অমতে বিয়ে করেন গণপতরাও ভোসলেকে।
পঞ্চাশের দশকটি নতুন মহিলাকণ্ঠের পক্ষে মোটেই খুব মসৃণ ছিল না বলিউডে। প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে তখন মধ্যগগনে বিরাজ করছেন শামসদ বেগম, গীতা দত্ত এবং উদীয়মানা শিল্পী হিসেবে তাঁরই সহোদরা লতা মঙ্গেশকর। বড় বাজেটের ছবির দরজা তখনও আশার কাছে অধরা। খানিক কম বাজেটের ছবিতে (বোধহয় বড় শিল্পীদের পরিবর্ত হিসেবেই) আশার ডাক পড়ে। ১৯৫২ সালে ‘সঙ্গদিল’ ছবিতে ওপি নাইয়ারের সুরে ‘ছম ছমাছম’ গানটিই ছিল তাঁর কেরিয়ারের প্রথম সীমানা পেরোনো। এর পর ১৯৫৩-এ বিমল রায়ের ‘পরিণীতা’ এবং ১৯৫৪-এ রাজ কপূরের ‘বুট পলিশ’। গীতা দত্ত বা লতা মঙ্গেশকরের পরেই তাঁর নামটি উচ্চারিত হতে শুরু করে ইন্ডাস্ট্রিতে। ১৯৫৭-য় বি আর চোপড়ার ছবি ‘নয়া দৌড়’-এ ফের ওপি নাইয়ারের সঙ্গে কাজ। উর্দু ভাষার কবি তথা গীতিকার শাহির লুধিয়ানভির লেখা গানে মহম্মদ রফির সঙ্গে দ্বৈতসঙ্গীত। সাফল্য তখন হাতের মুঠোয়। গোটা ষাটের দশক জুড়ে একের পর এক জনপ্রিয় ছবিতে জনপ্রিয় গান। ‘ধুল কা ফুল’, ‘গুমরাহ্’, ‘হমরাজ’। ওপি নাইয়ারের এক বিশেষ স্টাইলের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে ফেলতে পেরেছিলেন আশা। নাইয়ার সাহেবের বেশির ভাগ গানেই থাকত ঘোড়ার গাড়ির দৌড়ের মতো আবহ। তাতে আশার কণ্ঠের কুহক মিশে এক নতুন রসায়ন সৃষ্টি করত, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
ক্রমে আশা নজরে পড়েন শচীন দেব বর্মণের। ১৯৬৬-তে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। বিজয় আনন্দ পরিচালিত মিউজিক্যাল থ্রিলার ‘তিসরি মঞ্জিল’-এ রাহুল দেব বর্মণের সুরে প্লেব্যাক করেন আশা। মহম্মদ রফির সঙ্গে ‘ও মেরি সোনা রে’, ‘ও হাসিনা জুলফোঁওয়ালি জানে জাহাঁ, ‘আ যা আ যা ম্যাঁয় হুঁ প্যার তেরা’ গোটা দেশের মানুষের ঠোঁটস্থ তখন। বদল এসেছে হিন্দি ছবির গানের সাউন্ডস্কেপেও। রাহুল চাইছেন দুরন্ত পরীক্ষা নিরীক্ষা। সেই গবেষণাগারে বুনসেন বার্নার হয়ে আগুন জ্বাললেন আশা। সুইং, রকাবিলি, রক অ্যান্ড রোল— বিশ্বের গানজগৎই কাঁপছে সুইঙ্গিং সিক্সটিজ-এর দাপটে। বাঁধ ভাঙছে পুরনো মূল্যবোধের। হিপি-বিটনিক আন্দোলনের ছায়া ভারতেও প্রলম্বিত। রাহুল চাইছিলেন নিরীক্ষা, আশা জোগালেন ইন্ধন। পর্দায় শাম্মি কপূর তখন ‘প্রায় এলভিস’। ট্যুইস্ট সংস্কৃতি এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল আপামর ভারতীয়কে। কলকাতার বালিগঞ্জি সংস্কৃতির আর্ট ডেকো স্থাপত্যের বাড়িতে যদি ‘বিটলস’ বাজে, তবে উত্তরের বাগবাজারের জগদ্ধাত্রীপুজোর ভাসানের মেহবুব ব্যান্ডের বাজনায় ‘আ যা আ যা ম্যাঁয় হুঁ প্যার তেরা’। রাজার ঘরের ধন আর টুনির ঘরের ধন মিলেমিশে একাকার। বিশ্বায়ন পার হয়ে, জেন আলফা-বিটা-গামাদের জমানাতেও রিমিক্সের পর রিমিক্স। গান চলতে থাকে ঠোঁট থেকে ঠোঁটান্তরে। কিন্তু শিকড় হিসেবে থেকে যান আশা।
১৯৬০-এ মারা গিয়েছেন স্বামী গণপতরাও ভোসলে। রাহুল ও আশা তখন চর্চিত জুটি। ব্যক্তিগত জীবন বইছিল নিজের খাতেই। রাহুলের যাবতীয় এক্সপেরিমেন্টকে সফল করতে সর্বদাই যেন তৈরি ছিলেন আশা। ১৯৭১-এর ছবি ‘ক্যারাভ্যান’-এর ‘পিয়া তু আব তো আ যা’ যেন সাফল্যের শিখরকেও টপকে যায়। কী ছিল আশার সেই সময়ের গলায়? লতা মঙ্গেশকর সময়ের দাবিতে ডিস্কো গাইলেও তাঁর খাসজমি বিরহ আর প্রেমের মন্দমধুর উন্মন থেকে বেরিয়ে আসেননি তেমন ভাবে। আশা ডিঙিয়েছিলেন সব গণ্ডিই। ১৯৭২-এ রাহুলের সুরেই ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’ ছবিতে ঊষা উত্থুপের সঙ্গে আশা গেয়েছিলেন শীর্ষসঙ্গীতের একটি ভার্সন। ঊষা তখন ভারতের উদীয়মানা পশ্চিমি গানের শিল্পী। তাঁর পাশে নিজেকে সাবলীল করে নিয়েছিলেন অনেক পথ পেরিয়ে আসা আশা ভোসলে। সেই ছবিরই সর্ববৃহৎ হিট ছিল ‘দম মারো দম’। আশা সেখানে কণ্ঠে তুলে এনেছিলেন হিপি সংস্কৃতির মূল তন্তুকে। প্রবাদ হয়ে থাকা সেই গানগুলি এখনও বিবিধ ভাবে রিমিক্স হয়ে চলেছে ডিজে থেকে ডিজ্যান্তরে। একই কথা প্রযোজ্য বাপী লাহিড়ঈর সুরে গাওয়া ‘নমক হলাল’ ছবির গানগুলির ক্ষেত্রেও।
১৯৮১। রূপসাগরের অরূপরতন হিসেবে মাঝ-আকাশে বিরাজ করছেন রেখা। মুজফ্ফর আলির ছবি ‘উমরাও জান’-এ আশা কণ্ঠ দিলেন গজলে। খৈয়ামের সুরে ‘ইন আখোঁ কি মস্তি’, ‘দিল চিজ ক্যা হ্যায়’ প্রভৃতি গানে প্রমাণ করলেন দীর্ঘ সময় পশ্চিমী সুরে যাপন করলেও ভারতীয় গানের দুনিয়াতেও তিনি সমান অধিকারিণী। কয়েক বছর বাদে আবার গজল। রাহুলের সুরে গুলজারের ‘ইজাজত’-এ ‘মেরা কুছ সামান’ জিতে নেয় জাতীয় পুরস্কার।
অর্কেস্ট্রার যুগ আস্তে আস্তে অস্তমিত হচ্ছে। দক্ষিণ থেকে এক্কেবারে অন্য সাউন্ডস্কেপ নিয়ে বোম্বাই এসে পৌঁছেছেন আল্লারাখা রাহমান। ঊর্মিলা মাতোন্ডকর অভিনীত ছবি ‘রঙ্গিলা’-য় তাঁর সুরে ‘তন্হা তন্হা’ গাইলেন ৬২ বছরের আশা। আবার সাফল্য। নতুন সুরের কাঠামোয় নিজেকে সঁপে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছিল না তাঁর। ২০০১-এর রাহমানের সুরেই ‘লগান’ ছবিতে ‘রাধা ক্যায়সে না জ্বলে’ বা ‘প্যার তু নে ক্যা কিয়া’ (২০০৪)-এ ‘কমবখ্ত ইশক’ গেয়ে মাতিয়ে রেখেছেন গোটা দেশকে।
দেশের পাশাপাশি আঞ্চলিক ভাষাতেও সমানে গেয়ে গিয়েছেন গান। রাহুল দেবের সুরে তাঁর গাওয়া বাংলা গানগুলি ছাড়া আজও পুজো প্যান্ডেল অচল। ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’, ‘আজ যাই, আসব আরেক দিন’ বা ‘একটা দেশলাই কাঠি জ্বালাও’ কেন যে এখনও পুরনো হল না, তা সম্ভবত সমাজবিদ্যার গবেষণার বিষয় হতে পারে। শুধু রাহুল নন, বাংলার সলিল চৌধুরী বা সুধীন দাশগুপ্তের সুরেও কম গান রেকর্ড করেননি আশা। বাংলা ছায়াছবির গানেও অবাধ যাতায়াত ছিল তাঁর। আশা আর লতা যে বাঙালি নন, তা মনেই রাখতেন না বাংলার শ্রোতারা। রবীন্দ্রসঙ্গীতও গেয়েছেন আশা। সেই গানও প্লাবিয়েছে পুজোপ্যান্ডেল। ‘তোমার এই ঝরনাতলার নির্জনে’ বা ‘সহে না যাতনা’ এখনও কানের মধ্যে ঘুরপাক খায় শেষ-আশি আর নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় কৈশোর পেরোনো বাঙালির।
অগণিত গান, গানের পরে গান… জীবনকে কি পিছু ফিরে দেখেছিলেন এই নারী? রাহুলের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির গুঞ্জন ইন্ডাস্ট্রির দেওয়ালে দেওয়ালে দেওয়ালে মাথা কুটেছে। কিন্তু আশা-কিশোরের ডুয়েটে ডুবে থাকা ভারতবর্ষ মেতে থেকেছে গানেই। এই জুটি তো আজও কিংবদন্তি! তার মাঝেই শোনা গিয়েছে গুঞ্জন, দিদি লতার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিত্ব সংঘাতের কাহিনি। সে সব গল্পের কতখানি সত্যি আর কতটা ফিলিম পত্রিকার পাতা ভরনোর জন্য কলমচিদের উর্বর মস্তিষ্কের ফসল, তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়ই। তবে রাহুল-আশা জুটির একান্ত ভক্তেরা তাঁদের প্রিয় সুরকার-শিল্পীর মৃত্যুর পর থেকে আশার ব্যাপারে কেমন যেন মিইয়ে গিয়েছিলেন। আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিলেন সত্তর-আশির দশককেই।
আশা কিন্তু রয়ে গিয়েছিলেন আশা-তেই। বাপী লাহিড়ী হোন বা কল্যাণজি-আনন্দজি, আশা মানেই মোহজাল, এ কথা তিনি শ্রোতাদের বুঝিয়েছিলেন। ২০০৫-এও মধুর ভাণ্ডারকরের ছবি ‘পেজ থ্রি’-র বোনাস ট্র্যাক ‘হুজুরেঁ আলা’ শুনে এক বারও মনে হয়নি, এই গায়িকা সত্তরের কোঠায় দাঁড়িয়ে তখনও মোহ বিতরণ করে চলেছেন অকৃপণ কণ্ঠে।
সারা জীবন ধরে পেয়েছেন অগণিত পুরস্কার আর সম্মান। সেরা নেপথ্য কণ্ঠশিল্পীর সম্মানের সংখ্যা অগণিত। পেয়েছেন গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের নমিনেশনও। ২০০০ সালে পান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার। ২০০৮-এ পদ্মবিভূষণ। পশ্চিমবঙ্গ সরকারও তাঁকে বঙ্গবিভূষণ সম্মান প্রদান করে ২০১৮ সালে। ‘গিনেজ বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’-এ ২০১১ সালে সব থেকে বেশি সংখ্যক স্টুডিয়ো রেকর্ডিং করা শিল্পী হিসেবে তাঁর নাম প্রকাশিত হয়। তবে সংখ্যা বা পুরস্কারের উপরে যা থাকে, সেই শ্রোতার অন্তরের আসনখানি তিনি দখল করে রেখেছিলেন বহুকাল আগেই।
‘মোহ’— শব্দটা ছোট, কিন্তু তার বিস্তার যে ভায়াবহ হয়ে উঠতে পারে, তার ব্যাকরণ আশাকণ্ঠই জানত। নবতিপর শিল্পীর শরীরে বাসা বেঁধেছিল অ্যালঝাইমার্স, কণ্ঠ নীরব বেশ কয়েক বছর। শোনা যায়, সন্তানদের সঙ্গেও সম্পর্ক তেমন ভাল ছিল না। আজ তাঁর শূন্যতার উপরে দাঁড়িয়ে তাঁরই শেষজীবনে করা এক সমাজমাধ্যমের পোস্টের ছবি মনে পড়তে পারে কারও কারও। বাগডোগরা বিমানবন্দরে উড়ানের অপেক্ষায় আশা ও তাঁর সহশিল্পীরা। আশা বাদে সকলের হাতেই মোবাইল ফোন। একা আশাই শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন কোন অপারের দিকে। কোন অসেতুসম্ভব সেই চাহনি? সংবাদমাধ্যমে মোবাইল আসক্তির প্রতি ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছিলেন গায়িকা। কিন্তু তদ্দিনে সম্ভবত খানিক দেরি হয়ে গিয়েছে। অথবা বলা ভাল, দেরি হয়ে গিয়েছে— এই কথাটুকু বুঝতেই পরবর্তী প্রজন্মের দেরি হয়ে যাচ্ছে। এই বোঝা না-বোঝার মাঝখানে আশার বসার ভঙ্গিমায় ভর করেছিল অপেক্ষা। কিসের, বলা শক্ত।
‘আভি না যাও ছোড় কর, দিল আভি ভরা নেহিঁ’ বলে হাজার ডাকলেও কিন্নরকণ্ঠ সাড়া দেবে না আজ। সমস্ত শক্তি দিয়েও যদি উচ্চারণ করা যায় ‘নেহি নেহি আভি নেহি’, তবে মায়াজগৎ থেকে উত্তর আসবে ‘নেহি নেহি কভি নেহি’। এক মহাবৈচিত্রময় সময়কে কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন। সেই কণ্ঠ আর উত্তর দেবে না ‘মোহ’ নামের শব্দটির মহিমা কী— এই প্রশ্নের। ৯২ বছর তো প্রায় শতাব্দীর সমান! তবু আশাকণ্ঠ শুনলে মনে মনে অগণিত মানুষ গেয়ে উঠবেন— “ম্যাঁয় থোড়ি দের জী তো লুঁ/ নশেঁকে ঘুঁট পী তো লুঁ’। এ নেশার নামই বোধহয় ‘মোহ’ আর তাকে ধারণ করেছিলেন আশা ভোসলে নামের এক নশ্বর মানবী। যে মোহ আর কোনও কিছু দিয়েই ফিরিয়ে আনা যাবে না।