দেবকে সমর্থন করেই বলছি, ৭২ ঘণ্টায় ‘ব্যান কালচার’ তুলে দেওয়ার যোগ্যতা আমারও নেই: প্রসেনজিৎ
আনন্দবাজার | ১২ এপ্রিল ২০২৬
৭২ ঘণ্টার মধ্যে টলিউড থেকে সরবে ‘ব্যান কালচার’। যাঁরা গত দেড় বছর ধরে ইন্ডাস্ট্রিতে ‘নিষিদ্ধ’, এ বার কাজে ফেরাতে হবে তাঁদের। ৭ এপ্রিল টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় এমনই ঘোষণা দেবের। অনুঘটক রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের অস্বাভাবিক মৃত্যু।
সে দিন দেব আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের। তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন। ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি দেখছেন তিনি।
এর পরেই দেব সমাজমাধ্যমে প্রসেনজিৎকে ট্যাগ করে পোস্ট করেন ‘৭২ ঘণ্টা’। নির্দিষ্ট সময় পেরোতেই তাঁর ঘোষণা, ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম অভিনেতা-পরিচালক অনির্বাণ ভট্টাচার্য ফিরছেন। তাঁকে দেখা যাবে দেব-শুভশ্রীর পুজোর ছবিতে। রবিবার টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় ফের বৈঠক আর্টিস্ট ফোরামের। বৈঠকের পর এ দিনের সাংবাদিক বৈঠকে প্রসেনজিৎ বলেন, “দেবকে, দেবের ভাবনাকে পূর্ণ সমর্থন করছি। তার পরেও বলব, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ইন্ডাস্ট্রি থেকে ‘ব্যান কালচার’ তুলে দেওয়ার ক্ষমতা এই প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়েরও নেই!”
এই একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে কি তা হলে প্রসেনজিৎ-দেবের মধ্যে ‘মান-অভিমান’ শুরু?
প্রসেনজিৎ অবশ্য সে কথাও মানতে রাজি নন। তাঁর কথায়, “আমার সঙ্গে দেবের প্রায় রোজই কথা হয়। আমরা এটা গোলাচ্ছি, রাহুলের যে ঘটনাটি ঘটে গিয়েছে, তার সঙ্গে কোনও ‘ডিমান্ড’ নেই। একে ঘিরে আমাদের নিজস্ব কোনও দাবিদাওয়া নেই। অভিনেতা, কলাকুশলী সবাই এক হয়েছিলেন রাহুলের জন্য। ওর অস্বাভাবিক মৃত্যু কেন হল, তার উত্তর চেয়ে। আর আর্টিস্টদের সুরক্ষা।” এ প্রসঙ্গে প্রসেনজিৎ ফিরে দেখেন সপ্তাহখানেক আগে টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় আর্টিস্ট ফোরাম-ফেডারেশন বৈঠকের দিনটিকে। ৭ এপ্রিল ওই বৈঠকের আগেপরে দেব ‘ব্যান কালচার’ তুলে দেওয়ার কথা বলেন। সে দিনই প্রসেনজিৎ দেবকে কথাটি তিন-চার দিন পরে প্রকাশ্যে আনার অনুরোধ জানিয়েছিলেন, এমনই বক্তব্য আর্টিস্ট ফোরামের কার্যকরী সভাপতির। কারণ, প্রত্যেকেই রাহুলের মৃত্যুর কারণে শোকস্তব্ধ। প্রত্যেকের মন ভারাক্রান্ত। রাহুলের মৃত্যুর কারণ জানা ইন্ডাস্ট্রির দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
এর পরেই প্রসেনজিৎ স্পষ্ট ভাষায় দাবি করেন, “এই যে ৭২ ঘণ্টা। আমার মনে পড়ে না যে, ঘণ্টার চ্যালেঞ্জ দেওয়ার মতো বা নেওয়ার মতো যোগ্যতা আমার আছে। এই যোগ্যতা বা ক্ষমতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়েরও নেই।” তিনি এ-ও জানান, তিনি যদি ফোরামের পদাধিকারী না-ও হতেন, তবুও তিনি রাহুলের পাশে দাঁড়াতেন। তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়াতেন। একজন ‘বড় দাদা’ হিসাবে। সেই অনুভূতি থেকেই দু’সপ্তাহ ধরে দিন-রাত তিনি ‘বিষয়’টি থেকে বেরোতে পারেননি। রাহুলের মধ্যেই ডুবে আছেন প্রসেনজিৎ।
‘ব্যান কালচার’ নিয়ে বলতে গিয়ে প্রসেনজিৎ ফিরে দেখেছেন তাঁর অতীত। সামনে এনেছেন তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া টুকরো ঘটনা। সে কথা বলতে গিয়েই কি অভিনেতার কণ্ঠে অভিমানের রেশ? “প্রতি পুজোয় আমার ছবি আসে। চলে সেগুলো। ‘অটোগ্রাফ’-এর পর থেকে দর্শক আরও বেশি করে আমার কাজ পছন্দ করছেন। ৪৫ বছরে ৪৫০টিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছি।” তার পরেও কোনও এক বছরে টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োর সেটে রূপসজ্জার পরেও তিনি শুটিং করতে পারেননি! কারণটা অবশ্যই অন্য ছিল, জানিয়েছেন প্রসেনজিৎ। সেই সঙ্গে এ কথাও জানিয়েছেন, ইন্ডাস্ট্রির দু’হাজার সদস্য, বা সহকর্মী শিল্পীদের সে দিন কেউ তাঁকে ডেকে জিজ্ঞেস করেননি, সে দিন তাঁর মনের অবস্থা কী হয়েছিল!
সে সময়ে সাত দিন অপেক্ষা করেও কোনও সদুত্তর না পেয়ে কলকাতা ছেড়ে বাইরে চলে গিয়েছিলেন প্রসেনজিৎ। প্রতি মুহূর্তে যুঝেছিলেন নিজের সঙ্গে। তাঁর কথায়, “রাহুল আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। ও দেখিয়ে দিয়ে গেল, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম, যাঁরা কাজ করছেন বা কাজ করতে আসবেন, তাঁদের ইমোশনাল ইমপ্যাক্টটা কী!” নিজের আবেগ সংবরণ করে পর মুহূর্তেই প্রসেনজিৎ ফিরে এসেছেন বর্তমানে। তিনি দেবকে সমর্থন জানিয়েছেন আরও একবার। বলেছেন, “দেব যে ভাবনাটা ভেবেছে, সেটা একদম ঠিক। শুধু অনির্বাণ নয়, ঋদ্ধি সেন এবং আরও পরিচালকেরাও ‘নিষিদ্ধ’ হয়ে রয়েছেন। তাঁদের সকলের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠুক, এটাই মন থেকে চাইছি।” দেড় বছর ধরে এক বা একাধিক জনের সঙ্গে কাজ না করার মনোভাবকে তিনিও সমর্থন করেন না।
এত কিছু বিচার-বিশ্লেষণের পরেও কিন্তু প্রসেনজিতের মনে হচ্ছে, এই বিষয়টি অন্য সময়ে, সবাইকে নিয়ে বৈঠক করেও ‘ব্যান কালচার’ নিয়ে আলোচনা করা যেতেই পারত। তাঁর মতে, “একটি কথা আন্দোলন করেও বলা যায়। আবার পরিবারতন্ত্রকে মেনেও বলা যায়। সেই বলার ধরনে ‘আমি যেটা বলছি, সেটাই হবে’, এই মানসিকতা না থাকাই কাম্য।” তিনি এ প্রসঙ্গে সমাজমাধ্যমে দেবের ‘৭২ ঘণ্টা’র পোস্ট নিয়েও উল্লেখ করেন। জানান, তাঁকে না জানিয়ে এই পোস্টটি করেন দেব। প্রসেনজিতের আরও মনে হয়েছে, এর পর তাঁকে ফোরামের ‘কার্যকরী সভাপতি’ রূপে সম্বোধন করে যে চিঠি পাঠান দেব, সেটিতে তাঁর পাশাপাশি সংগঠনের সভাপতি রঞ্জিত মল্লিক, সম্পাদক শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়কেও ট্যাগ করা উচিত ছিল। এবং ট্যাগ করা উচিত ছিল ফেডারেশনকেও। কারণ, যা করার এই সংগঠনই করবে।
প্রসেনজিতের আক্ষেপ, দিন বদলেছে। এখন অনেক ‘প্রফেশনাল’ ভাবে কাজকর্ম হয়। সেই জায়গায় টলিউডে এখনও পরিবারতন্ত্র রয়ে গিয়েছে। তাই দেব যখন তাঁর পাঠানো চিঠি সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছিলেন, খুব কষ্ট পেয়েছিলেন প্রসেনজিৎ। তাঁর মনে হয়েছে, তাঁকে লেখা চিঠি প্রকাশ্যে আনার আগে দেব একবার প্রসেনজিতের সঙ্গে কথা বলে নিতেই পারতেন। “হয়তো এটুকু অধিকার এখনও আমার আছে”, বক্তব্য তাঁর। তার পরেও তিনি কোনও প্রশ্ন তোলেননি।
এ দিনের সাংবাদিক বৈঠকে প্রসেনজিৎ স্পষ্ট জানান, ‘ব্যান কালচার’-এর নিষ্পত্তি ‘৭২ ঘণ্টা’য় সম্ভব নয়। তাঁর কথায়, “সামনেই বিধানসভা নির্বাচন। সে সমস্ত মিটুক। তার পর সমস্ত পক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসে সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করে যাব। তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও দেড় থেকে দু’মাস!”