• ‘গুড় বাতাসা’র হুমকি ছেড়ে কেষ্টর মুখে মিছরি
    আনন্দবাজার | ১৩ এপ্রিল ২০২৬
  • চেহারায় এক। চরিত্রে আলাদা।

    হাঁকডাক, হম্বিতম্বি নেই। গলা যতটা সম্ভব মিহি করে জনসভায় ক্ষমা চাওয়া আছে। গুড়-বাতাসা, নকুলদানা, চড়াম চড়াম ঢাক বাজানো, ভ্যানিশ করে দেওয়া নেই। ‘আবদার’ হিসেবে ভোট চাওয়া আছে। বীরভূমে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা আড়ালে-আবডালে বলছেন, তিহাড় ফেরত অনুব্রত মণ্ডল অনেকটা মিয়োনো মুড়ির মতো। একবার কড়া কথা বলে ফেলেই পরের বার মিছরি ঢালছেন। তাঁদের আশঙ্কা, এই দো-আঁশলা অবস্থায় লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি। যারা ভয় পেত, তাদের সাহস বাড়ছে। যারা সমালোচনা করত, তারাবিদ্রুপ করছে।

    এমন পরিবর্তন কে আনল? তিহাড়? বোলপুর থানার আইসি’র সঙ্গে কু-কথার ভাইরাল হওয়া অডিয়ো ক্লিপ, না কি নির্বাচন কমিশনের গণশাসানি? বোলপুরে দলীয় কার্যালয়ে এক রাত ছোঁয়া সন্ধ্যায়, নির্বাচনী প্রচারসভা ফেরত ‘দমহীন’ অনুব্রতকে এই প্রশ্নটা করতেই উত্তর এল, ‘‘কে বলেছে দম নেই? আমি কাপুরুষ নই। কাপুরুষ হলে বিজেপিতে চলে যেতে পারতাম। আমাকে জেল খাটতে হত না।’’

    দম রয়েছে, তো ‘দমদার’ স্লোগান কই? ‘চড়াম চড়াম’ (কু)খ্যাত নেতা বলেন, ‘‘এ বার সভায়-সভায় বলছি, মেরা জবান মেরা শাসন হ্যায়।’’ এ আবার কেমন স্লোগান? বাংলা ছেড়ে হিন্দিই বা কেন? অনুব্রত মন দিয়ে মোবাইলের চার্জার খুঁজতে থাকেন।

    পর পর তিনটি বিধানসভা ভোটের অনুব্রতর সঙ্গে এই অনুব্রতের অমিল অনেক। শরীরে মেদ খানিক কমেছে। আচরণে অনেকখানি জড়তা। দলের ‘স্টার ক্যাম্পেনার’-এর তালিকায় ঠাঁই পেয়েছেন। গড়ে প্রতি দিন তিন-চারটে করে সভা। কিন্তু কী যেন একটা নেই ! ‘‘বহু বছর আগে একবার মুখ ফসকে বোম মারব বলে ফেলেছিলাম। এখন আর ও-সব নোংরা কথা বলি না। এখন আগের চেয়ে ভাল বক্তব্য রাখি।’’ এই ‘এখন’-টার শুরু কবে থেকে? তিহাড়ের অভিজ্ঞতা? অনুব্রত বলেন, ‘‘ও বিষয়ে কোনও কথাই বলব না।’’ নোংরা কথা বলেন না দাবি করছেন। তা হলে আইসি-কে কদর্য কথাগুলো বললেন কী ভাবে? প্রশ্ন শুনে অসহিষ্ণু দেখায় অনুব্রতকে। আমতা আমতা করে যা বলার চেষ্টা করেন, তার কোনও অর্থই দাঁড়ায় না।

    এক সময় বীরভূমে তৃণমূলের একক ক্ষমতার ভরকেন্দ্র ছিলেন। ক্রমশ সেই ছবিতে ঢুকে পড়ে পাঞ্জা লড়া শুরু করেন কাজল শেখ। অনুব্রত জেলে থাকাকালীন ক্ষমতার একাধিপত্য অনেকটাই চলে যায় কাজলের দখলে। বীরভূম জেলা পরিষদের সভাধিপতি কাজল এ বারের ভোটে হাঁসন কেন্দ্রের টিকিটও পেয়েছেন। শোনা যায়, প্রার্থী তালিকা ঘোষণার দিন একটা শব্দও উচ্চারণ করেননি কেষ্ট। থমথমে মুখে ছিলেন আগাগোড়া। পরের দিন থেকে বলতে শুরু করেন, “আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে ভোট করি। আর কাউকে নিয়ে মাথা ঘামাই না।” সাংবাদিকের সঙ্গে কথোপকথনেও সে কথাই এল। সঙ্গে যোগ হল, “কে আমার নামে কী বলল, তাতেও আমার কিছু যায় আসে না।”

    রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এ বারের ভোট অনুব্রতর কাছে নিজেকে প্রমাণ করার লড়াই। তিনি যে ফুরিয়ে যাননি, সে কথা দলকে বোঝানোর লড়াই। এ বারের ভোটে কোথাও কোনও ঝুঁকি নিতে না চাওয়া দলনেত্রী বা তাঁর ভাইপোও অনুব্রতর পুরনো ক্যারিশমা যতটুকু ব্যবহার করা যায়, তার সবটাই করার চেষ্টায় রয়েছেন। জেলাকে যে অনুব্রত হাতের তালুর মতো চেনেন, সে কথা এ বারেও প্রচারে উল্লেখ করেছেন মমতা।

    ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটেও তৃণমূলের অন্যতম তারকা ছিলেন কেষ্ট মণ্ডল। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় তিনি জেলে।

    গরু পাচার মামলায় ২০২২ সালের অগস্টে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। প্রথমে আসানসোল সংশোধনাগারে, পরে ২০২৩ সালের মার্চে তাঁর ঠাঁই হয় দিল্লির তিহাড় জেল। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সুপ্রিম কোর্ট তাঁর জামিন মঞ্জুর করে। প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়ে ওই বছরের সেপ্টেম্বরের শেষে তিহাড় থেকে মুক্তি পান তিনি।

    ফিরে এসে দেখেন, জেলায় তাঁর একাধিক চেনা মুখই অচেনার মতো আচরণ করছে।

    অনুব্রত এখন জেলায় দলের কোর কমিটির আহ্বায়ক। জেলা পরিষদের সভাধিপতি হয়ে কাজলের দাপিয়ে বেড়ানোটা তাঁর গলায় বিঁধছে। তাই জিতে এসে কাজল বিধায়ক হিসেবে কিংবা ছোটখাট দফতরের মন্ত্রিত্ব পেয়ে ব্যস্ত থাকলে জেলায় নিজের পুরনো প্রতিপত্তি যদি ফেরানো যায়, খানিকটা সেই চেষ্টায় তিনি ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করছেন বলে ঘনিষ্ঠদের মত। গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে তাঁর পুরনো সংগঠনের একটা অংশ এখনও সক্রিয়। বুথ সামলাতে তাঁর নেটওয়ার্ক এখনও কাজে লাগে। দলের বহু পুরনো কর্মী এখনও কেষ্টদার অনুগত। কিন্তু নিয়ন্ত্রকের চাবি তাঁর হাতছাড়া। তাই এখন অবলীলায় কেষ্টর চেলাদের পিটিয়ে দেয় কাজলের চেলারা।

    ভুবনডাঙার বাজারে, কোপাইয়ের ধারের চায়ের দোকানে, সোনাঝুরি হাটে— যেখানে যার সঙ্গেই কথা বলেছি, জেলার রাজনীতির কথা তুলতেই উঠে এসেছে কেষ্ট-কাজলের দ্বৈরথের কথা। সেখানে শেষ হাসি কে হাসবে, সেটাই যেন এলাকার রাজনীতির মূল চর্চা।

    অনুব্রত জেলে থাকাকালীন শীর্ষ নেতৃত্ব বিকল্প মুখের সন্ধান করেছিলেন। তখন কাজল নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। কেষ্টর ঘনিষ্ঠদের একাংশকে ভাঙানোর কাজটাও করেছেন নিপুণ ভাবে। নানুর ব্লকের পাপুড়ি গ্রামে কাজলের বাড়ির এলাকার লোকজন মনে করছেন, তাঁদের দাদা এক ধাপ এগিয়ে আছেন। বাস স্ট্যান্ডে বাসের অপেক্ষায় থাকা প্রৌঢ়া বা মাংসের দোকানের বৃদ্ধ দোকানি ভোট আসার আগেই যেন কাজলকে জিতিয়ে বসে আছেন। “হাঁসনের লোকও দাদার সঙ্গে বেইমানি করবে না, আমরা জানি।”

    কেষ্ট-কাজল দ্বন্দ্বের ছাপ কি কোনও ভাবেই ভোটে পড়বে না? কাজল বলেন, “ভোট এলে আর কোনও অন্তর্দ্বন্দ্ব নয়। তখন সবাই এক জায়গায়।” আপনার নিজের দলের লোকেরাই তো সে কথা শুনে হাসতে থাকে। আপনার হাসি পায় না? কাজল বলেন, “আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেত্রী হিসেবে মেনেছি। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেতা হিসেবে মেনেছি। তাঁরা যে ভাবে চলতে বলেছেন, সেই ভাবে চলেছি। এর বাইরে কাউকে নিয়ে আমি ভাবিই না। ও প্রচারে যাচ্ছে। আমিও যাচ্ছি। আমি আমার মতো। ও ওর মতো।” অনুব্রতর উপস্থিতি কি তাঁর প্রচারে বাড়তি কোনও মাত্রা যোগ করছে? উত্তর, “এ বিষয়ে কিছু না বলাই ভাল।”

    কাজলের বিরুদ্ধে এই মুহূর্তে ৬টি মামলা। তার মধ্যে খুনের চেষ্টা থেকে শুরু করে সাম্প্রদায়িক অশান্তি সৃষ্টি— সবই আছে। কাজল ঘনিষ্ঠরা খোলাখুলিই বলেন, “মামলা ৬টা। কিন্তু আসল ঘটনা যে কতগুলো, তার হিসাব করা মুশকিল।” আসল ঘটনা মানে? সেই প্রশ্নের আর কোনও জবাব মেলে না।

    বীরভূমের আনাচেকানাচে প্রশ্ন, হাইকমান্ডের হাত কেষ্ট-কাজল দু’জনের উপরেই কি সমান দরাজ? কেষ্টর অনুগামীরা বলছেন, “আমাদের দাদা গেমচেঞ্জার। দেখুনই না কী হয়!” আর কাজল? তাঁর জবাব, “কোথায় হাত আছে, কোথায় সরে গেছে, এ সব নিয়ে বলার আমি কে? মানুষ সব দেখছে।”

    ইলামবাজারের রাস্তায়, চায়ের দোকানের আড্ডায় এক প্রবীণ স্কুল শিক্ষক বলছিলেন, “ফ্যালফ্যাল করে দেখা ছাড়া আমাদের আর কাজটা কী? পাল্লা যার দিকেই ভারী হোক না কেন, আমাদের অবস্থা জ্বলন্ত উনুন থেকে গরম তেলের কড়ায় গিয়ে পড়ার মতো। ভাল কিছুর আশা করতে অনেক দিনই ভুলে গেছি।”
  • Link to this news (আনন্দবাজার)