• বিয়ের পরে জানতে পারি, রাহুল দেব বর্মণ আমাদের আত্মীয়! সেই থেকে আশা ভোসলে আমার বৌদি
    আনন্দবাজার | ১৩ এপ্রিল ২০২৬
  • আমার স্বামী ভরত দেব বর্মণ ত্রিপুরার রাজবাড়ির ছেলে। ওঁর কাকা শচীন দেব বর্মণ। তাঁর ছেলে রাহুল দেব বর্মণ । অর্থাৎ, ভরত আর রাহুল আত্মীয়তাসূত্রে ‘তুতো’ ভাই। আমরা যখনই মুম্বইয়ে যেতাম, তখনই আমার স্বামীর জন্য রান্না করা মাছ আসত দেব বর্মণ বাড়ি থেকে! যত্ন করে টিফিন ক্যারিয়ারে নিজের হাতে ভরে দিতেন আশাজি।

    কালের নিয়মে শচীন দেব বর্মণ চলে গেলেন। যে দিন চলে গেলেন সে দিন ওঁদের বাড়িতে আমাদের সপরিবার নিমন্ত্রণ ছিল।

    এর পর আশাজি এলেন কলকাতায়, আমাদের বাড়িতে। একাই এলেন। ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন গোটা বাড়ি। আমাদের বাড়িতে শচীন দেব বর্মণের ছবি সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা ছিল। সে সব দেখতে দেখতে উনি বলে উঠলেন, “পঞ্চম কেন শচীন দেব বর্মণের ছবি তোমাদের মতো করে সাজিয়ে রাখেনি! তোমরা কত সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছ।” কিছু বলিনি সে দিন। ওই দিন থেকে সম্পর্কটা যেন আরও গভীর, আরও আন্তরিক হয়ে গেল। ওই একটা দিনের কিছু কথা বদলে দিল আমার সম্বোধন। আমি আশাজিকে ‘বৌদি’ বলে ডাকা শুরু করলাম।

    আমাদের প্রায়ই দেখা হত। মুম্বই গেলে কিংবা বিমানে চড়ে যাতায়াতের সময়েও। একবার আশা বৌদি বলেছিলেন, “দুবাইয়ে আমার ভারতীয় রেস্তরাঁ আছে। তুমি নিশ্চয়ই আসবে।” আজ পর্যন্ত সেই নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যেতে পারিনি। তার পর লম্বা সময় আমাদের সাক্ষাৎ বন্ধ। যে দিন রাহুল চলে গেলেন, সে দিন কাকতালীয় ভাবে আমি মুম্বইয়ে। খবর পেয়ে দেখা করতে গিয়েছিলাম আশা বৌদির সঙ্গে। শোকস্তব্ধ বৌদি যেন পাথরপ্রতিমা। কারও সঙ্গে কথা বলার মতো অবস্থাতেই নেই। সবাই আসছিলেন, দেখা করে যাচ্ছিলেন। উনি নীরবে সব দেখে যাচ্ছিলেন। যেন বাহ্যজ্ঞানরহিত!

    সেই শেষ দেখা আশা বৌদির সঙ্গে। আজ সকাল থেকে খুব ব্যস্ত ছিলাম। কিছু কাজ ছিল। খবরটা শোনার পরে মনে হল, একটা যুগ নিয়ে চলে গেলেন আশা ভোসলে। ওঁর গাওয়া গান আমার মা সুচিত্রা সেনের ছবিতেও হিট। পরবর্তী কালে আমার ছবিতেও। আরও বড় ব্যাপার, সেই সব গানের অনেকগুলোই রাহুল দেব বর্মণ বা পঞ্চমের সুর করা। যদিও কোনও দিন সামনে বসে ওঁর গান শোনার সৌভাগ্য আমার হয়নি।

    আমার বৌদি খুব সাদামাঠা। খুব জ্ঞানী। সেই জ্ঞানের দার্ঢ্য কখনও-সখনও প্রকাশ পেত তাঁর কথায়, তাঁর আচরণে। সাদা শাড়ি পরতে ভালবাসতেন খুব। সব অনুষ্ঠানে খুব সুন্দর করে শাড়ি পরতেন। ওঁর ফ্যাশন নিয়েও সে সময়ে কম আলোচনা হয়নি। আমার অবশ্য সে সব ছাপিয়ে ওঁর মুখ, ওঁর গানের কথাই মনে পড়ে। এই যে এত গান গেয়েছেন, সেই সব সুর, যেন আঁচলে বেঁধে চলে গেলেন! সেই সুর, সেই সময়কে আর তো খুঁজে পাব না। আর ফিরে পাব না আমরা।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)