‘পহেলা’ আনন্দে মেতেছে ও পার বাংলা! মেলা-আলপনা-গানে কেমন হবে বর্ষবরণ, জানালেন তারকারা
আনন্দবাজার | ১৪ এপ্রিল ২০২৬
পান্তা ভাত আর রকমারি ভর্তা। সঙ্গে ইলিশ মাছ। আর পায়েস-পিঠা। বাড়ির মেয়েদের যেন দম ফেলার ফুরসত নেই! একদিকে মেজেঘষে, সাফসুতরো করে ঝকঝকে করে তুলতে হবে বাড়িঘর। যেন কোথাও মালিন্যের ছোঁয়া না থাকে। অন্যদিকে, নতুন পোশাক কেনাকাটি। বাড়িতে বাঙালি রান্নাবান্নার আয়োজন।
বাংলাদেশে এ ভাবেই প্রতি বছর পয়লা বৈশাখ আসে। তাকে ঘিরে একাকার বাংলা ও বাঙালিয়ানা। মিলেমিশে যান সাধারণ থেকে তারকা।
এটা যদি প্রত্যেক অন্দরমহলের ছবি হয়, তা হলে গোটা দেশের ছবিটা কেমন? ও পার বাংলার মানুষদের দাবি, তিন দিন ধরে উৎসবমুখর বাংলাদেশ। চৈত্রসংক্রান্তি থেকে উদ্যাপনের শুরু। সারা রাত গান হয়। ভোরের সূর্যকে সাক্ষী রেখে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে ফের গানের আয়োজন। পয়লা বৈশাখ বা নববর্ষ যে তাঁদের জাতীয় উৎসব।
তিন ধরে উৎসবের আয়োজন কি ছোটখাটো ব্যাপার? কী ভাবে তিনটি দিন তাঁরা সব নেতিবাচকতা সরিয়ে ইতিবাচকতায় মেতে ওঠেন?
যাঁরা বাংলাদেশের পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন দেখেছেন, তাঁরা জানেন, শহর আর গ্রামে উদ্যাপনের আয়োজন সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার পরেও সবচেয়ে বড় মিল, দুই জায়গাতেই বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে মেলা বসে। রকমারি পসরা সাজিয়ে। সেখানে থাকে টিয়াপাখির ভবিষ্যদ্বাণী থেকে হাওয়া মিঠাই। রকমারি পোশাক, গানবাজনা এবং জিভে জল আনা খাবারের সম্ভার।
নিজের বাড়িতে তেমনই এক ‘মেলা’র আয়োজন করে ফেলেছেন জয়া আহসান। “মেলায় যা যা থাকে, সব সাজিয়ে ফেলেছি আমার বাড়ির আঙিনায়। গান, খাওয়াদাওয়া থেকে নানা জিনিসের পসরা— কী নেই সেখানে!” আনন্দের চোটে দু’বেলা নতুন পোশাকে সেজে উঠছেন জয়া! তাঁর বাড়িতে গানের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন জয়ার মতোই দুই বাংলার খ্যাতনামী অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। বাড়িতে আয়োজিত সেই উদ্যাপনের ছবি জয়া ভাগ করে নিয়েছেন আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে।
রঙিন কাগজের শিকল, ঘুড়ি আর পতাকা দিয়ে সাজানো গোটা বাড়ি। আনাচেকানাচে ফুলের টব, দেওয়ালে ফুলের ঝাড়, লতাপাতা। তাতে শোভা আরও বেড়েছে। মুড়ি, মুড়কি, মোয়া, বাতাসা, গজা হয়ে রকমারি ফল। সঙ্গে পান্তা, ইলিশ, ভর্তা— আরও কত কী! বাগানের এক কোণে টিয়াপাখি নিয়ে বসে ভবিষ্যদ্বক্তা। তাঁর কাছে ভিড় জমিয়েছেন অনেকে। জয়া বলেছেন, “এই তিন-চারটি দিন নিজের দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ভাবতেই পারি না। কত আনন্দ করি আমরা, এ দেশে না এলে বুঝবেন না।” যা কিছু বাঙালিয়ানায় ভরপুর, সে সবই উদ্যাপনে শামিল, জানালেন দুই বাংলার নায়িকা। “আমরা নববর্ষে পান্তা ভাত খাই এই জন্যই। কৃষিপ্রধান দেশ আমাদের। কৃষকদের প্রিয় খাবার পান্তা ভাত। এ দিন তাঁদের সম্মান জানিয়ে ঘরে ঘরে তাই পান্তার আয়োজন।”
‘বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু বাংলার ফল’ কিংবা ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’র মতো গানে আকাশবাতাস মুখরিত। ঢাকা শহরের মানিক মিঞা অ্যাভেনিউয়ের রাস্তা আলপনায় রঙিন। চৈত্রসংক্রান্তির দিন সারারাত জেগে আলপনা আঁকেন ‘ভার্সিটি’র পড়ুয়ারা। সাধারণ মানুষও যোগ দেন। সেজে ওঠে পথঘাট। রমনা বটবৃক্ষের নীচে একজোটে বাংলা নতুন বছরের শপথগ্রহণের পালা। সকাল সকাল ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বেরিয়ে পড়ে দিকে দিকে। চৈত্রসংক্রান্তির দিন বর্ষবিদায়ে ফানুস ওড়ান অনেকে। এত রঙিন আয়োজনের সাক্ষী দুই বাংলার আর এক জনপ্রিয় নায়িকা তাসনিয়া ফারিণ। “ছোটবেলার কথা খুব মনে পড়ে এই দিন। তখন শহরেও মেলা বসত। আমি মায়ের সঙ্গে গিয়ে দোকান দিতাম। কখনও মুড়ি-বাতাসা, কখনও স্কুলের বৈশাখী অনুষ্ঠানে আচার বা পিঠে বিক্রি।” অভিনেত্রীর বাড়ি থেকে রমণা বটবৃক্ষ পায়ে হাঁটা পথ। নতুন পোশাকে সেজে বাড়ির বড়দের হাত ধরে পৌঁছে যেতেন সেখানে। সকলের সঙ্গে বুঁদ হয়ে গান শুনতেন। প্রতি বছর রমণা বটবৃক্ষের নীচে ‘ছায়ানট’ নাচ-গান পরিবেশন করে। কচি মনে ছাপ ফেলত সেই সব গান। কাঁটা দিত তাসনিয়ার গায়ে।
দিনকাল বদলেছে। চাইলেই তিনি জনতার সঙ্গে পা মেলাতে পারেন না। “বদলে যেখানে থাকি, সেখানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিই। আমার কিন্তু লাল পাড় সাদা শাড়ি কেনা হয়ে গিয়েছে। মা রকমারি পিঠে বানাচ্ছেন”, খুশি গলায় বলেছেন তিনি। জানিয়েছেন, ইদের থেকেও বুঝি বেশি উদ্যাপন বাংলা নতুন বছরকে কেন্দ্র করে। গত কয়েক বছর ধরে দুঃসময়ের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে বাংলাদেশ। এ বছরের নববর্ষের আগে দুর্যোগের ছায়া সরে গিয়েছে। নববর্ষের আয়োজন নিশ্চয়ই এ বছর আরও জোরালো? তাসনিয়ার জবাব, “গত কয়েক বছর ধরে ইদের আগের রোজা পড়েছে এই সময়ে। আমরা তেমন ভাবে উদ্যাপন করতে পারিনি। এ বছর সেটা হবে।”
শহরে যখন শিক্ষিত মানুষদের সাড়ম্বরে বর্ষবরণের আয়োজন, ছোট ছোট গ্রাম সেই আড়ম্বর থেকে দূরে। নিজেদের মতো করে মেতে ওঠে উদ্যাপনে। গ্রামের মূল আকর্ষণ মেলা। “বরিশালের উদ্যাপন কিন্তু ঢাকা শহরের মতো নয়”, বললেন দুই বাংলার জনপ্রিয় অভিনেতা মোশাররফ করিম। তাঁর কথায়, “বাংলাদেশের গ্রামে মেলা বসে। সেই মেলা নাগরদোলা, জিলিপি, ভালমন্দ রান্না, ছোটদের জন্য রঙিন পুতুল আর গৃহস্থালির সরঞ্জামে সাজানো। আমার গ্রামের বাড়ির পাশে নদী। সন্ধ্যায় যখন মেলা ভাঙে, নৌকোয় ভরে যায় সেই নদী। মেলা থেকে কেনা জিনিস নিয়ে নৌকোয় করে নিজের নিজের বাড়ি ফেরেন সকলে। ওই দৃশ্যও চোখ ভরে দেখার মতো।”
এ পার বাংলার রাজনীতিবিদ-অভিনেতা-পরিচালক ব্রাত্য বসুর পর্দার ‘হুব্বা’ মোশাররফের কাছে ‘নববর্ষ’ নতুনের আবাহন। সব দুঃখ-কষ্ট সরিয়ে নতুনকে বরণ করার দিন। যা কিছু শুভ, তাকে আহ্বান জানানোর দিন। মোশাররফও এ দিন সেজে উঠবেন নতুন পোশাকে। তাঁর পছন্দ পাঞ্জাবি আর পাজামা।
বাংলাদেশের যে কোনও অনুষ্ঠানের প্রাণ, বাংলা গান। সেই প্রসঙ্গ না তুললে যে উদ্যাপনের বর্ণনাই বৃথা। “চৈত্রসংক্রান্তিতে রাত জাগে বাংলাদেশ। সারারাত আমরা গানে গানে পুরনো বছরকে বিদায় জানাই।” রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা নিজেও যোগ দেন এই বিশেষ অনুষ্ঠানে। “পোশাকে, খাবারে, সংস্কৃতিতে সারা বছরের থেকেও এ দিন যেন আরও বেশি বাঙালিয়ানায় ভরপুর”, বললেন দুই বাংলার প্রিয় গায়িকা। রেজওয়ানা রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া অন্য গান করেন না। তবে অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়াও নজরুলগীতি, দ্বিজেন্দ্রগীতি, অতুলপ্রসাদ সেনের গান পরিবেশিত হয়। শোনা যায় ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’, ‘হে নূতন দেখা দিক আর বার’, ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’ কিংবা ‘ওই আসে ওই অতি ভৈরব হরষে’র মতো গান। বর্ষবরণে গানের সঙ্গে শোনা যায় শঙ্খধ্বনি, ঢাক, ঢোল।
নতুন বছরের নতুন সূর্য ওঠে। নতুন আলোয় ঝলমলিয়ে ওঠে বাংলাদেশের গ্রাম, নদী, সবুজ ঘাস, শস্যখেত। কংক্রিটে ঘেরা শহরের আনাচকানাচ। তখন আবার গান ধরেন শিল্পীরা। নববর্ষ মুখরিত হয়ে ওঠে রবিগানে ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’।