সকাল থেকে মেঘলা আকাশ, তাতে ভ্যাপসা গরম একটুও কমেনি।
বেলা ৮টা নাগাদ ছোট আন্দুলিয়া বাসস্ট্যান্ডের এক চায়ের দোকানে আড্ডা জমেছে। গত বার বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের টিকিট না পেয়ে চাপড়ার বিধায়ক রুকবানুর রহমানের বিরুদ্ধে নির্দল প্রার্থী হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন জেবের শেখ। এ বার সেই জেবেরই প্রার্থী, রুকবানুরকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে পলাশিপাড়ায়। এই নিয়েই হাসি-ঠাট্টা, কৌতূহলী প্রশ্নসবই চলছে।
এরই মধ্যে কথা উঠল, গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে অনেকেই নিজের ভোট দিতে পারেননি। ২০২১ সালের বিধানসভা এবং ’২৪ সালের লোকসভা ভোটে বেশ কিছু বুথে ভোট দিতে পারেননি সিপিএম সমর্থকেরা। প্যান্ট গুটিয়ে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে আক্ষেপ করেন এক প্রৌঢ়, “আমি ওই গ্রামেরই মানুষ, সিপিএম করি। কয়েক বছর ধরে ভোটই দিতে দেওয়া হচ্ছে না। বুথে যাওয়ার আগেই শুনছি, আমার ভোট হয়ে গিয়েছে।”
কৃষ্ণনগর-করিমপুর রাজ্য সড়ক ধরে খানিকটা গেলে বাঁ দিকে ‘স্বাধীনতা সড়ক’— বাংলাদেশে যাওয়ার রাস্তা তৈরি হচ্ছে। সড়ক ধরে এগোতেই হৃদয়পুরের রাস্তার বাঁ দিকে জলের কলের কাছে মহিলাদের জটলা। চলছে ভোটের কথাই। এক জন বলছেন, “সে দিন জাকির ভাই (আইএসএফ প্রার্থী জাকির হোসেন মণ্ডল) বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।”
শুনেই আর এক বলে ওঠেন, “যা-ই হোক, দিদিকেই চাই।” বোঝা যায়, লক্ষ্মীর ভান্ডার, কন্যাশ্রী, রূপশ্রীর সুবিধা পাচ্ছেন অনেকেই এবং প্রার্থী নয়, প্রতীক দেখেই ভোট দেবেন তাঁরা।
ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হল। বৃষ্টির মধ্যে তখনও ব্যস্ত চাপড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মানুষের আনাগোনা বিন্দুমাত্র কমেনি। জেবের শেখের কার্যালয়ের অদূরে এক ছাউনিতে মাথা গুঁজে কানে এল কথোপকথন।
এক জন বলছেন, “জাকির কিন্তু ভাল ভোট টানবে। শুক্লা সাহাও (এজেইউপি প্রার্থী) কিছু ভোট পাবে।” আর এক জন নিচু গলায় বলেন, “আস্তে বল এ সব কথা ! ভোট ভাগাভাগি হলে কিন্তু বিজেপির লাভ।”
২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে এই কেন্দ্রে তৃণমূল প্রায় ৫৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। জেবেরের প্রায় ৬৩ হাজার ভোট কাটার সৌজন্যে ২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৩৪ শতাংশে। গত লোকসভা নির্বাচনে ফের ৫৬ শতাংশ ভোট পায় তৃণমূল। ফলে গোষ্ঠী কোন্দলে অন্তর্ঘাত না হলে পঞ্চাশ হাজারের বেশি ভোট তৃণমূলের থাকারই কথা। কিন্তু এসআইআরে বাদ গিয়েছে প্রায় ৩০ হাজার ভোটারের নাম। রুকবানুর-অনুগামীদের ভোট কোন দিকে যাবে তা নিয়েও জল্পনা চলছে।
গত বিধানসভা নির্বাচনে বাম-কংগ্রেস জোট সমর্থিত সিপিএম প্রার্থী মাত্র ৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, লোকসভা নির্বাচনে তা বেড়ে হয় প্রায় ১২ শতাংশ। তাদের ভোট জোটসঙ্গী আইএসএফ পাবে বলেই দাবি বাম কর্মীদের। বিজেপি গত লোকসভা নির্বাচনে প্রায় ২৮ শতাংশ ভোট ছিল। গত বিধানসভা নির্বাচনে পায় প্রায় ২৭ শতাংশ ভোট। এ বার ভোট অনেক বাড়বে বলে তাদের প্রার্থী সৈকত সরকার আশাবাদী। সেই সঙ্গে ময়দানে আছে হুমায়ুন কবীরের দল এজেইউপি এবং কংগ্রেসও।
শ্রীনগর পেরিয়ে এজেইউপি-র দলীয় কার্যালয়ে পৌঁছনো গেল, তখন বৃষ্টি ধরেছে। দলের প্রার্থী শুক্লা সাহা প্রচার গাড়ি এসে পৌঁছল। সকালে ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টিতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়েছে বড় বালিডাঙা এলাকায়। খানাখন্দে ভরা রাস্তা ধরে যেতে যেতে চোখ পড়ে বিজেপির প্রচার-টোটো। ঝড়ে ঝরে পড়া আম কুড়িয়ে যাচ্ছিল দুই কিশোর। তাদের কাছ থেকে একটা আম নিয়ে খেতে খেতে চায়ের দোকানে বসে থাকা এক বৃদ্ধ বলেন, “বিজেপির প্রার্থী ভূমিপুত্র হলে তাদের ভোটবাক্স ভরে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা ছিল।” তা শুনে দোকানি বলেন, “ভূমিপুত্র না হলেই বা কী? দুর্নীতি-অপশাসন থেকে রাজ্যকে বাঁচাতে বিজেপিই পারে।”
বেশ কয়েক কিলোমিটার উজিয়ে শিমুলিয়া তিনমাথার মোড়। টোটো চালকদের আড্ডায় কান পেতে শোনা গেল এক জন বলছেন, “দুর্নীতি আর ভাতার ছড়াছড়ি, এ দিকে চাকরি নেই!” আর এক জন যোগ করেন, “আমাদের এলাকায় উন্নয়নই বা কী হয়েছে!” তবে মোদ্দা কথাটা হল, সংখ্যালঘুদের বেশির ভাগ কাকে ভরসা করছেন? তৃণমূলের গড়ে ভোট কাটাকুটি সম্বল করে বিরোধীরা কত দূর যেতে পারবে? নদিয়ার সর্বাধিক সংখ্যালঘু-প্রধান কেন্দ্রে এটাই লাখ টাকার প্রশ্ন।