লক্ষ্মী বা অন্নপূর্ণা নয়, বাংলার চাই ষষ্ঠীর ভান্ডার! শহর, গ্রাম বা মফস্সল, পশ্চিমবঙ্গের নারী এখন আর মা হতে চাইছেন না
আনন্দবাজার | ২২ এপ্রিল ২০২৬
বার্ধক্যেবারাণসী। এতদিন তা-ই জানা ছিল।কিন্তু দিনকাল যেদিকে যাচ্ছে,একদিন আসবে, যখন বলতে হতে পারে, বার্ধক্যে কলকাতা।
কেন? কারণ,কলকাতায় জন্মহার হু-হু করে কমছে। এতটাইকমছে যে, প্রজননহার, যাজন্মহার থেকে মৃত্যুহার বিয়োগ করে পাওয়া যায়,তা নেমে এসেছে ১-এর নীচে। পৃথিবীরখুব কম শহরেই এই সংখ্যা এত কম। জনসংখ্যা স্থিতিশীল থাকার জন্য এই সংখ্যা ২.১-এথাকা প্রয়োজন।
কলকাতাতেএই সংখ্যা প্রয়োজনের অর্ধেক। অর্থাৎ, বয়স্ক লোকেদের সংখ্যা বাড়ছে আরকমে যাচ্ছে যুবক-যুবতীরসংখ্যা। এর পরিণাম কী? আজ বাদে কাল অ্যাপ্ল যদি সেক্টর ফাইভে আইফোনের কারখানা গড়তে চায়, চাকরি নেওয়ার মতো লোক কলকাতায়না-ও থাকতে পারে। আমরা যেমন তেল বা বিলিতি মদআমদানি করি, তেমনভাবে কর্মীও আশপাশের রাজ্য থেকে আনতে হবে।
এই তথ্যআমাদের নয়, ভারতসরকারের। প্রকাশিত হয়েছে গত বছর।তা সত্ত্বেও এখানে এ নিয়ে আলোচনা নেই কেন? কারণ,কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের ঘন জনবসতি। বাংলারজনঘনত্ব অন্ধ্রের তিনগুণ। হায়দরাবাদের প্রায় দেড়গুণ কলকাতায়।ফলে কেউ মনে করতে পারেন,জনসংখ্যা কমলে বাঙালির না হোক,কলকাতার অন্তত লাভ হতে পারে। এইযুক্তি অতি সরল। লাভ গোড়ার দিকে সাময়িক হতে পারে।কিন্তু আদতে ব্যবসা বা কল-কারখানায় কাজ করার লোক কমবে।সমাজে তরুণ ও কর্মক্ষমদেরতুলনায় বয়স্কদের সংখ্যা বাড়লে পেনশন এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার বোঝাও বাড়বে।
শহরের কিন্তুহুঁশ নেই। বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে শুম্ভ-নিশুম্ভেরযুদ্ধ শুরু হয়েছে নানা পক্ষে। রাজ্যবিজেপি এবং তৃণমূলের বেশ কিছু নেতাকে কমতে থাকা জন্মহার নিয়ে প্রশ্ন করেছিল আনন্দবাজারডট কম। কেউই শীর্ষনেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনানা-করে কোনও কথা বলতে চাননি।
বিষয়টি নিয়েএই সার্বিক নৈঃশব্দ্যে বিস্মিত জনসংখ্যা নিয়ে কাজ করা পণ্ডিত-গবেষকরা। ইনস্টিটিউটঅফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ়, কলকাতারঅধ্যাপক শাশ্বত ঘোষের কথায়, ‘‘পরিকল্পনা তো দূরের কথা,কোথাও কোনও আলাপ-আলোচনাও নেই।” তাঁরমতে, কলকাতারপ্রজনন হার সেই সত্তরের দশকের গোড়ার দিকেই ২.১-এরনীচে নেমে গিয়েছিল। তখন থেকেই দেশে এই হার সব চেয়েকম।তাঁর হিসাব, বর্তমানে কলকাতারহার আসলে ০.৮-এ নেমে এসেছে। একে কার্যত সর্বনিম্নস্তর বলা যায়। কেউ কেউ বলেন, এ দেশে ছোট পরিবারের সংস্কৃতিরউদ্ভব ও বিস্তারের অন্যতম আদিস্থল কলকাতা। পরিবারেএক বা দু’টি সন্তান থাকাই ‘স্বাভাবিক’, এমন ধারণা জনপ্রিয় হয়েছে পাঁচ-ছয় দশকেরও আগে। এইশতকের শুরুতেই দেখা গিয়েছিল, এক-সন্তানপরিবারের সংখ্যা অন্যান্য বড় রাজ্যের তুলনায় বাংলায় অনেকটাই বেশি।দুই বা এক সন্তান প্রথা পার হয়ে কলকাতা এবং শহুরে বাংলায় এখন দ্বৈতআয়ের সন্তানহীন দম্পতির সংখ্যা বাড়ছে।
কেন ক্রমশ স্বেচ্ছায় সন্তানহীনদম্পতির সংখ্যা বাড়ছে কলকাতা তথা রাজ্যের শহরাঞ্চলে? পণ্ডিতদের নানা মত। কলকাতারক্ষেত্রে উচ্চ নারীশিক্ষার হার, দেরিতে বিয়ে, ছোট পরিবারের জনপ্রিয়তা,পেশাজীবনের প্রতি অধিক মনোযোগ ও আর্থিক অনিশ্চয়তার ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি লক্ষ করেছেন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিকেরা।
গত এক-দেড় দশকের প্রবণতায় দেখা যাচ্ছে, কলকাতার পেশাজীবী দম্পতিরা— যাদের উভয়েরই আয় রয়েছে— ক্রমশ নিজেদের পেশাগত জীবন,ভ্রমণ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়গুলিকে অধিক অগ্রাধিকার দিয়েসচেতন ভাবেই সন্তানহীন জীবনধারা বেছে নিচ্ছেন। এছাড়া, জীবনযাত্রারক্রমবর্ধমান খরচ এবং আর্থিক অনিশ্চয়তা তো আছেই। কলকাতায়মজুরি বৃদ্ধির হার তুলনামূলক ভাবে কম। অধিকাংশইবেতনভোগী পেশাজীবী। সন্তান লালন-পালন করাটা অনেকেই আর্থিক ভাবেঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে দেখছেন। বিশেষতশিশুদের স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি অনেককেই পরিবার ছোট রাখতেউৎসাহিত করছে।
মানিকতলারঅনন্যা দাশগুপ্ত মধ্য ত্রিশ। বিয়ে হয়েছে বছর আটেক। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই চাকরিকরেন। অনন্যা বলছিলেন, “যেখানেচাকরির নিরাপত্তা নেই বললেই চলে আর আয়-সঞ্চয়ও বিশেষ বাড়ছে না, সেখানে সন্তানপালন তো অবশ্যই একটা বড় চাপ আর ঝুঁকির ব্যাপার।”তাঁরা বিয়ের আগে থেকেই নিশ্চিত ছিলেন, সন্তান নেবেন না।তাঁর সমবয়সি বন্ধু ও ভাইবোনেদের মধ্যে কেউ কেউ এখনও অবিবাহিত।বিবাহিতদেরও অনেকেই স্বেচ্ছায় নিঃসন্তান।
সামাজিক-পারিবারিক চাপ অবশ্য চলে যায়নি।আত্মীয়স্বজন এবং বয়োজ্যেষ্ঠরা অনেক ক্ষেত্রেই সন্তানগ্রহণের জন্যচাপ সৃষ্টি করে থাকেন। কসবার স্কুলশিক্ষিকা অহনা বিশ্বাসেরবক্তব্য, তাঁর মা মাঝেমাঝেই তাঁকে মনে করিয়ে দেন, তাঁর বয়স চল্লিশ হল।সন্তানধারণের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। পরেআর ইচ্ছা হলেও উপায় থাকবে না। এখনইআবার ভাল করে ভেবে দেখতে। অহনার মা তাঁকে প্রশ্নকরেন, “আমাকেতো তোরা দেখছিস। তোদের কে দেখবে?” অহনা জবাবে বলেন, ‘‘নিজেরা নিজেদের সামলাতে অসুবিধাহলে সহায়ক রাখব বা বৃদ্ধাশ্রমে চলে যাব!’’
পণ্ডিতদেরচোখে কিন্তু পড়েছে আর এক প্রবণতা। রাজ্যেপ্রজননহার জাতীয় হারের মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ। গোটা দেশে শহরাঞ্চলের গড় ১.৫, সেখানে পশ্চিমবাংলায় মাত্র ১.১। গ্রামাঞ্চলের জাতীয় গড় ২.১, পশ্চিমবাংলায় ১.৪। এর মানে ভারতে ক্রমশ বাঙালির সংখ্যাও কমবে। উদ্বেগের আরও কারণ আছে। শাশ্বতের মতে, পেশাগত কারণে যৌবন পেরিয়ে বেশি বয়সে সন্তানলাভেরচেষ্টার কারণেও অনেকে সন্তানলাভে অসমর্থ হচ্ছেন। যে কারণে বাড়ছে ফার্টিলিটি ক্লিনিকের সংখ্যা। ফলে সরকারি তরফে এ বিষয়ে উদ্যোগী হওয়া আশু প্রয়োজন।
পৃথিবীরপ্রায় সর্বত্রই জন্মহার কমতে দেখা যাচ্ছে। যা মূলত উন্নত,শিল্পায়িত, শহুরে, উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চ আকাঙ্ক্ষাসম্পন্ন অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য।ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ও শহরসন্তানধারণে দম্পতিদের উৎসাহিত করার জন্য সরাসরি হাতেনগদ টাকা দেওয়া, সন্তানপালনেবাবা-মায়েরদীর্ঘ ছুটি, পরিষেবায়ভর্তুকি ও করে ছাড়ের মত প্রকল্প নিয়েছে। চিনেরএকটি প্রদেশ সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, মহিলারা ২৫ বছরের আগে প্রথম সন্তানের জননী হলে ভারতীয় মুদ্রায়প্রায় ২০ হাজার টাকা এককালীন অনুদান পাবেন। রাশিয়া, হাঙ্গেরি ও ইতালির কিছু কিছুশহরে এই পরিমাণ আরও বেশি। জাপানে তো সপ্তাহে তিন দিন ছুটি, বাবা-মা দু’জনের জন্যই পেরেন্টাল লিভ,শিশুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে ছাড়,ডে-কেয়ারসিস্টেমে ভর্তুকি, ইত্যাদিনানা প্রকল্প আছে। টোকিয়ো শহর কর্তৃপক্ষ এর বাইরেওহাতে নগদ টাকা দেন। সিঙ্গাপুরও তাই।আমাদের দেশে অন্ধ্রে মোট প্রজনন হার ১.৫ তে নেমে আসতেই মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নায়ডু রাজ্যে দ্বিতীয়ও তৃতীয় সন্তানের জন্ম হলে এককালীন ২৫,০০০ টাকা, পাঁচ বছর ধরে মাসিক ১,০০০ টাকা ও সন্তানের ১৮ বছর বয়স পর্যন্তনিখরচায় শিক্ষার মতো প্রকল্প এনেছেন।
লক্ষ্মীরভান্ডার আছে। দ্বিগুণ খরচের ‘অন্নপুর্ণার ভান্ডার’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিজেপি।একদিন হয়তো আসবে, যখন দুধভাত থাকবে। কিন্তুসেটা ভোগ করার মতো সন্তান থাকবে না। তখনহয়তো লক্ষ্মী, অন্নপূর্ণাভুলে গিয়ে মা ষষ্ঠীর শরণাপন্ন হতে হবে।