• ‘সতর্কতামূলক আটকের কোনও পরিস্থিতি নেই’, তৃণমূলের পাশে রাজ্য! পদক্ষেপের তথ্য কী ভাবে ফাঁস, কোর্টে প্রশ্ন তুলল কমিশন
    আনন্দবাজার | ২৩ এপ্রিল ২০২৬
  • তাদের দলের ৮০০ জন কর্মীকে গ্রেফতার করা হতে পারে বলে তৃণমূলের আশঙ্কাকে কলকাতা হাই কোর্টে সমর্থন করল রাজ্য সরকার। তৃণমূলের করা মামলার শুনানিতে তারা জানাল, রাজ্যে সেই পরিস্থিতি নেই যে, ‘প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন’ বা সতর্কতামূলক ভাবে আটক করতে হবে। কেন একটি রাজনৈতিক দলের সদস্যদের চিহ্নিত করে ‘ট্রাবল মেকার’ বলা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূলের আইনজীবী। অন্য দিকে, কমিশনের বক্তব্য, অবাধ নির্বাচনের জন্য যে পদক্ষেপ করা হচ্ছে, সেই গোপন তথ্য কী ভাবে পেল তৃণমূল। তাদের দাবি, রাজ্যে অবাধ এবং নিরপেক্ষ ভোট করানোর স্বার্থেই গ্রেফতারির পদক্ষেপ করা হচ্ছে। রাজ্য পুলিশের ডিজির তরফে জানানো হয়েছে, গুরুতর অপরাধ নথিভুক্ত না-হওয়া পর্যন্ত আইনগত পদক্ষেপ করা যায় না। অপরাধ আটকাতে প্রয়োজনীয় যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, তা নেওয়া হবে।

    গোটা রাজ্য থেকে ৮০০ দলীয় নেতা এবং কর্মীকে গ্রেফতারের আশঙ্কা করে সোমবার সকালেই কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল তৃণমূল। সেই ঘটনায় কাদের গ্রেফতার করা হতে পারে, জেলা ধরে নাম উল্লেখ করে আদালতের কাছে তালিকা জমা দেয় তারা। বুধবার হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চে মামলার শুনানি শেষ হয়। রায় ঘোষণা স্থগিত রয়েছে।

    তৃণমূলের আইনজীবীর বক্তব্য

    তৃণমূলের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশ্ন, একটি রাজনৈতিক দলের সদস্যদের কেন ‘ট্রাবল মেকার’ বলা হচ্ছে? তাঁর কথায়, ‘‘কিসের ভিত্তিতে ট্রাবল মেকার বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে। কলঙ্কজনক বিষয়। তাঁদের নাম প্রকাশ্যে আসছে, সংবাদমাধ্যমে বলা হচ্ছে।’’ কল্যাণ আরও বলেন, ‘‘কাউকে গ্রেফতারের অধিকার কমিশনের নেই, তা পুলিশের রয়েছে। একজন ম্যাজিস্ট্রেট গ্রেফতারের নির্দেশ দিতে পারেন। কমিশন কি স্বাধীনতা কাড়তে পারে মানুষের? কোনও গুরুতর অপরাধ হলে পুলিশ গ্রেফতার করবে। কমিশন কি ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব নিতে পারে?’’ এর পরেই কল্যাণ বলেন, ‘‘শুধু এ রাজ্যেই হচ্ছে প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন। অবাধ ভোট করাতে হলে টহলদারি বাড়ান। কোনও মানুষকে গ্রেফতার করা হবে, তা সঠিক নয়। মানুষের স্বাধীনতা বিঘ্নিত হচ্ছে এতে। কমিশনের এই ধরনের কাজ জোরজবরদস্তিমূলক।’’ তৃণমূলের আইনজীবীর সওয়াল, ‘‘পুলিশকে কমিশন অতিরিক্ত নির্দেশ দিলে তা পালন করা উচিত নয়। একটি রাজনৈতিক দলের সদস্যদের টার্গেট করে চিহ্নিত করেছে। ট্রাবল মেকার বলছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় গভীর ভীতি তৈরি হবে। নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’’

    কল্যাণ বলেন, ‘‘প্রয়োজন না হলে গ্রেফতার করা যায় না, আইনে বলা হয়েছে। সংবিধানে দেওয়া ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার কেউ কাড়তে পারে না। কমিশন কি এতটাই ক্ষমতাবান যে ব্যক্তিস্বাধীনতা কাড়বে? ক্ষমতার অপব্যবহার হচ্ছে। কেউ গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকলে গ্রেফতার করলে আপত্তি নেই। কাউকে টার্গেট করে গ্রেফতার করলে আপত্তি রয়েছে। ভিত্তি ছাড়াই কমিশন নির্দেশ জারি করছে, যা সংবিধানের জন্য গুরুতর হুমকি। এত বাহিনী দেওয়া হয়েছে। তার পরেও কেন অশান্তি রুখতে কাজ করতে পারছে না (কমিশন)? তার পরেও কেন কমিশনকে রাজনৈতিক কর্মীদের আটক করতে হচ্ছে? ভোট দিতে দেওয়া হচ্ছে না? কমিশনের পদক্ষেপ স্থগিত করুন।’’

    রাজ্যের আইনজীবী

    রাজ্যের আইনজীবী কিশোর দত্ত বলেন, ‘‘মামলাকারীদের সমর্থন করি। কমিশন দাবি করেছে, ভোটারদের ভয় দেখানো হচ্ছে বলেই অশান্তি সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আগাম পদক্ষেপ করা হচ্ছে। ট্রাবল মেকার শব্দ কোনও দণ্ডবিধিতে কি ব্যবহৃত হয়েছে? জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে কি বলা হয়েছে এই শব্দ? সেখানে এ রকম শব্দের উল্লেখ নেই। অপরাধ হচ্ছে অপরাধ, তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হবে। কিন্তু এই শব্দ আইনের পরিভাষায় নেই।’’ তিনি সওয়াল করে আরও বলেন, ‘‘যদি প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন বা অ্যারেস্ট করতে হয়, তার জন্য নির্দিষ্ট আইন থাকতে হবে। তা ছাড়া হবে না। প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন তখনই হয়, যখন ভারতের অখণ্ডতা, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়ে। এখানে এই ধরনের পরিস্থিতি নেই। কাউকে প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন করতে হলে জানাতে হবে, কী অপরাধ করেছেন তিনি। আইন ভাঙলে হেফাজতে নেবে আপত্তি নেই।’’

    কমিশনের আইনজীবী

    বুধবার শুনানিতে কমিশনের আইনজীবী সওয়াল করে বলেন, ‘‘আমাদের দায়িত্ব শান্তিপূর্ণ ভাবে নির্বাচন করানো। আইনে যা বলা রয়েছে, সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ করছি। এই রাজ্যে (প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন) প্রথম বার ঘটছে না। সময় দিলে পুরো বিষয় আদালতে হলফনামা দিয়ে জানাতে রাজি। গণতন্ত্র সুরক্ষিত করতে আমাদের সতর্কতামূলক পদক্ষেপ করতে হয়। যে সব অভিযোগ করা হচ্ছে তা গুরুতর। তাই আমরা সে সব প্রশ্নের জবাব দিতে চাই।’’ এর পরে কমিশনের তরফে আরও বলা হয়, ‘‘বিহারে ভোটের সময়ে কী ব্যবস্থা নিয়েছিলাম, দেখুন। সেখানেও একই ব্যবস্থা নিয়েছি কি না, দেখা হোক। কোনও রাজ্যকে আলাদা নজরে দেখি না। যে প্রথা রয়েছে, তা মেনে কাজ করি।’’

    এর পরেই কমিশনের তরফে বলা হয়, ‘‘আমাদের বক্তব্য, নির্বাচন নিশ্চিত করতে যে পদক্ষেপ করছি, সেই গোপন তথ্য কী ভাবে প্রকাশিত হল? আমাদের দায়িত্ব সংবেদনশীল। অবাধ এবং স্বচ্ছ ভোট করাতে কিছু পদক্ষেপ করতে হয়। অন্যথায় গোপনীয় নোটিস (তৃণমূল) কী ভাবে পেল? সেটা আদালতকে জানাতে হবে। আমাদের বলতে সমস্যা হলে আদালতকে জানানো হোক। পেশ করা হোক।’’ তারা আরও বলে, ‘‘বৃহস্পতিবার প্রথম দফার নির্বাচন। অশান্তি এড়াতে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিয়েছি। এখানে ইঙ্গিতপূর্ণ অভিযোগ করা হচ্ছে। স্বচ্ছ ভাবে নির্বাচন করতে জরুরি পরিস্থিতিতে পদক্ষেপ করা দরকার। অনুচ্ছেদ ১৬২-র অধীনে আমরা এ সব পদক্ষেপ করতে পারি। পাঁচ বছর আগে রাজ্যে ব্যাপক হিংসা হয়। অনেক মানুষ মারা যান। সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। তাই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা দরকার।’’

    প্রধান বিচারপতি সুজয় বলেন, ‘‘কোনও ঘটনা ঘটলে আইন রয়েছে। আপনাদের কেন এ সব পদক্ষেপ করতে হচ্ছে?’’ কমিশনের বক্তব্য, ‘‘আমাদের উদ্দেশ্য একটাই, স্বচ্ছ ভোট করানো। তার জন্য যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা যাতে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে না পারেন, তা-ই করছি।’’ কমিশন আরও বলে, ‘‘মোথাবাড়িতে বিচারকদের ঘেরাও করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট কড়া মন্তব্য করে। অর্ডার কপিতে শীর্ষ আদালত লেখে, কড়া পদক্ষেপ করবে কমিশন। তা-ই করছি।’’ এর পরেই কমিশন বলে, ‘‘মামলাকারীকে বলতে হবে, গোপনীয় তথ্য কী ভাবে পেলেন তাঁরা। রাজ্যের কাছে থাকে গোপন তথ্য, বুথের তথ্য কী ভাবে প্রকাশিত হল, তা জানাতে হবে।’’

    ডিজিপির আইনজীবীর বক্তব্য

    রাজ্য পুলিশের ডিজির আইনজীবী আদালতে সওয়াল করে বলেন, ‘‘গুরুতর অপরাধ নথিভুক্ত না-হওয়া পর্যন্ত আইনগত পদক্ষেপ করতে পারি না। অপরাধ আটকাতে প্রয়োজনীয় যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, তা নেব। আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ করা হবে। আমরা কারও স্বাধীনতা বা মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের চেষ্টা করব না। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অনুসারে কাজ করব।’’
  • Link to this news (আনন্দবাজার)