• ‘ট্রাবল মেকার’ বলে দাগিয়ে ঢালাও গ্রেফতারি নয়! কমিশন এমন সিদ্ধান্ত নিলে তাতে স্থগিতাদেশ, জানাল হাই কোর্ট
    আনন্দবাজার | ২৩ এপ্রিল ২০২৬
  • গোলমাল সৃষ্টি করতে পারে (ট্রাবল মেকার) বলে দাগিয়ে দিয়ে ঢালাও গ্রেফতারি চলবে না। সতর্কতামূলক ভাবে কাউকে আটক করতে গেলেও তা আইনের নির্দিষ্ট বিধি মেনেই করতে হবে। বুধবার এমনটাই নির্দেশ দিল কলকাতা হাই কোর্ট। একই সঙ্গে জানাল, কমিশন যদি ঢালাও গ্রেফতারি সংক্রান্ত এমন কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তার উপরেও স্থগিতাদেশ জারি হচ্ছে।

    হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতিপার্থসারথি সেনের বেঞ্চ জানিয়েছে, সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদের ক্ষমতা সীমাহীন নয়। অন্যআইন থাকলে সেটার অধীনেই কাজ করতে হবে। যদি আইন কোনও কাজ নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে করতেবলে,তবে সেটাই মানতে হবে। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের মন্তব্য, “শুধুমাত্র‘ট্রাবল মেকার’ বলে চিহ্নিত করে ঢালাও নির্দেশ দেওয়া প্রাথমিক ভাবে ভুল। নাগরিকেরস্বাধীনতা শুধুমাত্র আইন অনুযায়ীই সীমিত করা যায়। কেউ যদি অপরাধ করে, পুলিশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে। সতর্কতামূলক ভাবে কাউকে আটক করতেহলেও নির্দিষ্ট বিদি মেনেই করতে হবে।” আদালত জানিয়েছে, এ ক্ষেত্রে কমিশন এমন কোনওসিদ্ধান্ত নিয়ে থাকলে, তাতে স্থগিতাদেশ দেওয়া হল।

    রাজ্যের শাসকদলের আশঙ্কা তাদের কর্মীদের গ্রেফতার করা হতে পারে। তৃণমূলের প্রায় ৮০০ কর্মীকে গ্রেফতার করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে তারা। এই নিয়ে গত সোমবারই হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয় তৃণমূল। বুধবার মামলাটি শুনানির জন্য ওঠে প্রধান বিচারপতি পালের এজলাসে। তৃণমূলের হয়ে কোর্টে সওয়াল করেন আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন একটি রাজনৈতিক দলের সদস্যদেরই চিহ্নিত করে ‘ট্রাবল মেকার’ বলা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তৃণমূলের করা এই মামলায় বুধবার রাজ্য সরকারও আদালতে জানায়, বর্তমানে রাজ্যে সেই পরিস্থিতি নেই যে, ‘প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন’ বা সতর্কতামূলক ভাবে আটক করতে হবে।

    হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির এজলাসে কল্যাণের সওয়াল, একটি রাজনৈতিক দলের সদস্যদের কেন ‘ট্রাবল মেকার’ বলা হচ্ছে? তাঁর কথায়, ‘‘কিসের ভিত্তিতে ট্রাবল মেকার বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে। কলঙ্কজনক বিষয়। তাঁদের নাম প্রকাশ্যে আসছে, সংবাদমাধ্যমে বলা হচ্ছে।’’ কল্যাণ আরও বলেন, ‘‘কাউকে গ্রেফতারের অধিকার কমিশনের নেই, তা পুলিশের রয়েছে। একজন ম্যাজিস্ট্রেট গ্রেফতারের নির্দেশ দিতে পারেন। কমিশন কি স্বাধীনতা কাড়তে পারে মানুষের? কোনও গুরুতর অপরাধ হলে পুলিশ গ্রেফতার করবে। কমিশন কি ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব নিতে পারে?’’

    রাজ্যের হয়ে আদালতে সওয়াল করেন অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্ত। তিনি এজলাসে বলেন, ‘‘মামলাকারীদের সমর্থন করি। কমিশন দাবি করেছে, ভোটারদের ভয় দেখানো হচ্ছে বলেই অশান্তি সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আগাম পদক্ষেপ করা হচ্ছে। ট্রাবল মেকার শব্দ কোনও দণ্ডবিধিতে কি ব্যবহৃত হয়েছে? জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে কি বলা হয়েছে এই শব্দ? সেখানে এ রকম শব্দের উল্লেখ নেই। অপরাধ হচ্ছে অপরাধ, তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হবে। কিন্তু এই শব্দ আইনের পরিভাষায় নেই।’’ তিনি সওয়াল করে আরও বলেন, ‘‘যদি প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন বা অ্যারেস্ট করতে হয়, তার জন্য নির্দিষ্ট আইন থাকতে হবে। তা ছাড়া হবে না। প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন তখনই হয়, যখন ভারতের অখণ্ডতা, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়ে। এখানে এই ধরনের পরিস্থিতি নেই। কাউকে প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন করতে হলে জানাতে হবে, কী অপরাধ করেছেন তিনি। আইন ভাঙলে হেফাজতে নেবে আপত্তি নেই।’’

    অন্য দিকে কমিশনের আইনজীবী সওয়াল করেন, ‘‘আমাদের দায়িত্ব শান্তিপূর্ণ ভাবে নির্বাচন করানো। আইনে যা বলা রয়েছে, সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ করছি। এই রাজ্যে (প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন) প্রথম বার ঘটছে না। সময় দিলে পুরো বিষয় আদালতে হলফনামা দিয়ে জানাতে রাজি। গণতন্ত্র সুরক্ষিত করতে আমাদের সতর্কতামূলক পদক্ষেপ করতে হয়। যে সব অভিযোগ করা হচ্ছে তা গুরুতর। তাই আমরা সে সব প্রশ্নের জবাব দিতে চাই।’’ এর পরে কমিশনের তরফে আরও বলা হয়, ‘‘বিহারে ভোটের সময়ে কী ব্যবস্থা নিয়েছিলাম, দেখুন। সেখানেও একই ব্যবস্থা নিয়েছি কি না, দেখা হোক। কোনও রাজ্যকে আলাদা নজরে দেখি না। যে প্রথা রয়েছে, তা মেনে কাজ করি।’’
  • Link to this news (আনন্দবাজার)