‘আমার নামে গ্রেফতারি পরোয়ানার খবর ভুয়ো নয়, নির্বাচন কমিশন হঠাৎ কেন উত্তর দিতে এল’: শ্রীজাত
আনন্দবাজার | ২২ এপ্রিল ২০২৬
বুধবার সকালে সংবাদমাধ্যমের ফোন পেয়েই প্রথম শুনি যে, আমার নামে কৃষ্ণনগরের আদালত থেকে একটি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। তখন আমি বিস্মিতই হই। কারণ, কেন বা কোন ঘটনায় এমন কিছু হতে পারে, তা-ও ভাবতে পারছিলাম না। তার পর থেকেও যে খুব বেশি তলিয়ে বিষয়টি নিয়ে ভাবার সুযোগ পেয়েছি, তা নয়। কারণ, একের পর এক ফোন আসতে থাকে। কখনও সংবাদমাধ্যম থেকে, কখনও বা আত্মীয়-বন্ধুদের কাছ থেকে। নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। সঙ্গে নিজের কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেও হল। খবরটা সত্যি কি না, তা-ও যে জানতে হবে। কারণ, থানা থেকে এখনও যে আমাকে যোগাযোগই করা হয়নি। তবে নানা দিকে খোঁজখবর করে জানতে পারি, খবরটা ঠিকই।
প্রথমে এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করার উপায় আমার কাছে ছিল না। তাই তখন যিনিই ফোন করছিলেন, সকলকে একটাই উত্তর দিয়েছিলাম, “এখনও আমার কাছে এই বিষয়ে কোনও তথ্য নেই।” কিন্তু এই মুহূর্তে অত্যন্ত বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানতে পেরেছি যে, সত্যিই আমার নামে কৃষ্ণনগর আদালত থেকে একটি মামলার অধীনে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। সেই পরোয়ানা কলকাতার লালবাজারে এলে তার পরে আমার আঞ্চলিক থানা সেই মতো ব্যবস্থা নেবে। এটাই সাধারণ প্রক্রিয়া।
প্রথমে পুরো ঘটনাটা বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। ২০১৯ সালে করা একটি মামলার ভিত্তিতে ২০২৬ সালে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হবে। তা-ও আবার পশ্চিমবঙ্গের প্রথম দফার নির্বাচনের আগের দিন! এই কথাও শুনলাম যে, চলতি বছরের শুরুর দিকে আমার কাছে নাকি হাজিরার জন্য কৃষ্ণনগর আদালত থেকে সমন এসেছিল। কিন্তু আমি আর দূর্বা (বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীজাতর স্ত্রী) দু’জনেই এ ধরনের চিঠি বা বিজ্ঞপ্তি সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন এবং সতর্ক। আমরা অন্তত এমন কোনও সমন হাতে পাইনি। পেলে নিশ্চই তাকে গুরুত্ব দিতাম। সুতরাং আমি পুরো অঙ্কটা ঠিক মেলাতে পারছি না। তবে এটা ঠিক, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। সেটি আমার কাছে এসে পৌঁছোনোর অপেক্ষা।
এখানে আরও একটা কথা বলা দরকার বলে আমার মনে হয়। এই খবরটি ভুয়ো বলে প্রচার করাও হচ্ছে। শুনছি নির্বাচন কমিশন বলেছে, এই খবর ভুয়ো। আমি বা আমরা গ্রেফতারি পরোয়ানার জন্য কাউকে দায়ী করার আগেই কেন নির্বাচন কমিশন এই উত্তর দিতে এগিয়ে এল, সেটা আমার কাছে প্রশ্নের বিষয়। নির্বাচন কমিশন থেকে নাকি এও বলা হয়েছে, চাইলে আমি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি। আমি কেন নিজে থেকে এগিয়ে গিয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করব, সেটা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। এর জেরে বিপুল রকমের ভ্রান্তি ছড়াচ্ছে এই নির্বাচনের মুখে। তা একেবারেই কাম্য নয়।
স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের পারিবারিক অবস্থা আজ সকাল থেকে বদলে গিয়েছে। এমন নয় যে, এই ধরনের বিপন্নতার সম্মুখীন আমরা আগে কখনও হইনি। প্রায় ন’বছর আগে, আমার একটি লেখাকে ঘিরে সারা দেশে উত্তাল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। তার পরিণাম হিসাবে ভয়াবহ দিন-রাত কাটিয়েছিলাম আমি এবং আমার গোটা পরিবার। এটি সেই অধ্যায়েরই নতুন পর্বের সংযোজন। ঘটনাটিকে আমি সে ভাবেই দেখছি। এই মামলাও আমার কোনও লেখা নিয়েই হবে হয়তো। কিন্তু এটাও ভাবছি, একটা ১০ বছর পুরনো কবিতার ছায়া এখনও রাষ্ট্রকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে কী ভাবে! প্লেটো বলেছিলেন, “আদর্শ রাষ্ট্রে কবির কোনও জায়গা হয় না।” আমার প্রশ্ন, আমরা কি তা হলে আদর্শ রাষ্ট্র হওয়ার দিকে এগিয়ে চলেছি?