• ভোট না দিলে যদি নাম কেটে যায়! দলে দলে ফিরছেন পরিযায়ীরা, ভিড় হাওড়া স্টেশনে, শিলিগুড়িতে বাস নিয়ে ক্ষোভ
    আনন্দবাজার | ২৩ এপ্রিল ২০২৬
  • ভোট না দিলে যদি পরের বার ভোটার তালিকা থেকে নামটাই গায়েব হয়ে যায়! পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) কারণে এ বার বাড়তি আতঙ্কে পরিযায়ী শ্রমিকেরা। বৃহস্পতিবার প্রথম দফার ভোটের আগে তাই দলে দলে তাঁরা ঘরে ফিরছেন। রুটিরুজির সঙ্গে আপোস করে, কিছু দিনের উপার্জনের মায়া ত্যাগ করে নিজেদের উদ্যোগে ভোট দিতে আসছেন তাঁরা। গত কয়েক দিন ধরে হাওড়া এবং শিয়ালদহ স্টেশনে এই পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়তি ভিড় চোখে পড়়ছে। বুধবার তা ছিল সবচেয়ে বেশি। কারও পিঠে ব্যাগ, কারও মাথায় পথ চলার সম্বল— দলে দলে জেলামুখী ট্রেনে উঠছেন তাঁরা। ভিড়কে পরোয়া করছেন না কেউ।

    পরিযায়ী শ্রমিকদের থিকথিকে ভিড় গত তিন দিন ধরে দেখা যাচ্ছে সাঁতরাগাছি স্টেশনে। সেখানে নেমে হাও়ড়া বা শিয়ালদহ থেকে ট্রেন ধরে তাঁরা নিজ নিজ জেলায় ফিরছেন। প্রথম দফার ভোটের জন্য স্টেশনগুলিতে মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুরের পরিযায়ী শ্রমিকদের সংখ্যা বেশি। বুধবার বেলা ১২টা নাগাদ হাওড়া স্টেশনে ঢোকে ডাউন ব্যান্ডেল হাওড়া লোকাল। সেই ট্রেনটিকেই কাটোয়া লোকাল হিসাবে ঘোষণা করা হয়। স্টেশনে ট্রেন ঢোকার আগেই সেখানে থিকথিক করছিল ভিড়। কারণ, জেলার গন্তব্যে পৌঁছোতে পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া অন্যতম ভরসা। ওই ট্রেনের ভিতর থেকে বাইরের ভিড় দেখে এক যাত্রী প্রশ্ন করেন, ‘‘এটা কি কাটোয়া লোকাল?’’ ভিড় থেকে উত্তর আসে, ‘‘এটা ভোট লোকাল।’’

    উত্তরদাতা ২৮ বছর বয়সি মহম্মদ আলমগির মুর্শিদাবাদের সালারের বাসিন্দা। কাটোয়া থেকে সালার যাবেন তিনি। জানান, মহারাষ্ট্রে নির্মাণকাজের সঙ্গে তিনি যুক্ত। কর্মস্থল পুণে থেকেও ৩২ কিলোমিটার দূরে। তাঁরা একই এলাকার ১৭ জন মিলে শুধু ভোট দিতে রাজ্যে ফিরেছেন। প্রত্যেকেই এসেছেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে, নিজেদের গাঁটের কড়ি খরচ করে। কেন? আলমগিরের উত্তর, ‘‘আমার পরিবারে ১১ জন সদস্য। এসআইআর-এ চার জনেরই নাম কেটে গিয়েছে। শুধু ভোট দিতে আসতাম না। কিন্তু ভোট না দিলে যদি থাকতে না দেয়! তাই এসেছি।’’

    কাটোয়া স্টেশনের ছবিটাও প্রায় এক। গত তিন থেকে চার দিন ধরে সেখানে পরিযায়ী শ্রমিকদের ভিড়। প্রত্যেককেই অজানা আশঙ্কা তাড়া করে বেড়াচ্ছে যেন, ‘‘ভোট না দিলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়তে পারে!’’ বুধবার কাটোয়া স্টেশনে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। হাওড়া থেকে কাটোয়াগামী ট্রেনগুলি থেকে নামেন শত শত শ্রমিক। অধিকাংশের গন্তব্য মুর্শিদাবাদ। ওই জেলার সংযোগকারী ট্রেনে উঠতে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন করিম শেখ। তাঁর কথায়, ‘‘কাজেই থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু শুনছি ভোট না দিলে নাকি ভোটার তালিকা থেকে নাম কেটে দেবে! আধার বা রেশন কার্ড নিয়েও সমস্যা হতে পারে। সেই ভয়েই সব ছেড়ে চলে এলাম।’’

    মুর্শিদাবাদ থেকে পেটের দায়ে ভিন্‌ রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিকের কাছে এ বারের নির্বাচন অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের মতো হয়ে উঠেছে। কেরল, গুজরাত, দিল্লি, মহারাষ্ট্র থেকে বিশেষ ট্রেন এবং বাস ভাড়া করে বহু মানুষ মুর্শিদাবাদে ফিরেছেন শুধু ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন বলে। কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদগামী বাসগুলিতে তিল ধারণের জায়গা নেই। বাসের ছাদেও উঠে পড়ছেন অনেকে। কোনও রকমে ঘরে ফেরাই একমাত্র উদ্দেশ্য। বুধবার হাজারদুয়ারি এক্সপ্রেসের বাতানুকূল কামরাতেও দাঁড়ানোর জায়গা পাননি অনেকে। এমনকি রিজার্ভেশন থাকা সত্ত্বেও ভিড়ের চাপে অনেকে ট্রেনে উঠতে পারেননি বলে দাবি। ট্রেনের টিকিট না পেয়ে বেঙ্গালুরু, মহারাষ্ট্র কিংবা দিল্লি থেকে মোটা টাকা খরচ করে কেউ কেউ বাস ভাড়া করেছেন। ডোমকলের গড়াইমারী গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসিন্দা রহমান মণ্ডল মহারাষ্ট্রে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘‘শুনছি ভোট না দিলে নাকি নাম কাটা যাবে। নাম কাটা গেলে এই মাটির সঙ্গে আমার সম্পর্ক চুকে যাবে। তাই কাজ ফেলে আগে দেশে ফিরছি।’’ একই সুর জলঙ্গির পরিযায়ী শ্রমিক বুবাই বিশ্বাসের গলাতেও, ‘‘গুজরাতে সোনার কাজ করছি ঠিকই, কিন্তু নিজের অস্তিত্বের চেয়ে দামি কিছু নেই। ভোটার তালিকায় নামটুকু না থাকলে কালকে আমাদের আর কেউ চিনবে না। সেই ভয় থেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাসে-ট্রেনে ভিড় ঠেলছি।’’

    উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতেও বৃহস্পতিবার ভোট। বহু পরিযায়ী শ্রমিক বিভিন্ন রাজ্য থেকে শিলিগুড়ি পৌঁছেছেন। তবে পর্যাপ্ত বাসের অভাবে তাঁদের কারও কারও ঘরে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। শিলিগুড়ি বাস টার্মিনাসে বুধবার ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তাঁরা। অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে ভোটের কাজে অনেক বাস তুলে নেওয়া হয়েছে। পরিযায়ী শ্রমিকদের চাপ বাড়তেই তাই বাসের অভাব প্রকট হয়েছে। উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ দফতরের টিকিট কাউন্টারে ভাঙচুরও করা হয়েছে বুধবার৷ অভিযোগ, দীর্ঘ ক্ষণ লাইন দিয়েও বাস পাওয়া যাচ্ছে না। দূরদূরান্ত থেকে রাজ্যে ফিরে ভোট দিতে বাড়ি পৌঁছোতে পারছেন না পরিযায়ী শ্রমিকেরা। জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার-সহ উত্তরের বিভিন্ন জেলায় ফেরার জন্য হাহাকার পড়ে যায় বাস টার্মিনাসে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শেষ পর্যন্ত ঘটনাস্থলে যায় কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা। জলপাইগুড়ির বাসিন্দা বিপাশা পণ্ডিতের কথায়, ‘‘বিমানে করে তড়িঘড়ি মুম্বই থেকে শিলিগুড়ি ফিরলাম ভোট দেব বলে। কিন্তু এখান থেকে জলপাইগুড়ি যেতে পারছি না। কমিশনকে এর দায় নিতে হবে।’’ কোচবিহারের তনিমা রয় কার্জি বলেন, ‘‘চূড়ান্ত অব্যবস্থার শিকার হতে হচ্ছে আমাদের। যারা অন্য জেলা থেকে এসে পড়াশোনার জন্য বা কাজের জন্য এখানে থাকি, ভোটের সময় বাড়িই ফিরতে পারছি না।’’

    দিল্লি, হরিয়ানা থেকে যে সমস্ত পরিযায়ী শ্রমিক কোচবিহারে ফিরছেন, এসআইআর-এর কারণে ভোট দেওয়ার বাড়তি তাগিদ লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাঁদের মধ্যেও। অনেকেই মনে করছেন, ভবিষ্যতে ফের যখন এসআইআর হবে, তখন ২০২৬ সালে ভোট দিয়েছিলেন কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। পরিযায়ীদের ফেরার হিড়িক রয়েছে মালদহেও। কালিয়াচক, সুজাপুর, মানিকচক, চাঁচল, রতুয়া-সহ জেলার ১৫টি ব্লকে বহু শ্রমিক ফিরে এসেছেন। মালদা টাউন স্টেশনে ভিড় উপচে পড়ছে। একাংশের দাবি, তাঁদের জানানো হয়েছে, যাঁদের নাম ভোটার তালিকায় রয়েছে তাঁরা যদি এ বার ভোট না দেন, তবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ চলে যেতে পারে।

    ভিন্‌ রাজ্য থেকে শ্রমিক ফিরেছেন পশ্চিম মেদিনীপুরেও। ঘাটাল, দাসপুর এলাকায় সংখ্যাটা সবচেয়ে বেশি। এসআইআর পর্বে এই শ্রমিকেরা বাড়িতে এসে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়ে গিয়েছিলেন। এ বার ভোট দিতে ফিরছেন। ভোট দিতে প্রতি বছরই পরিযায়ী শ্রমিকদের কেউ কেউ ফিরে আসেন। তবে এ বছর ঘরে ফেরার হিড়িক অনেক বেশি। ভুবনেশ্বরে কর্মরত বাঁকুড়ার অর্ক মাঝি অবশ্য জানালেন, এসআইআর তাঁর ঘরে ফেরার প্রধান কারণ নয়। তাঁর কথায়, ‘‘এর আগে যত ভোট হয়েছে, আমি এ রাজ্যেই ছিলাম। এ বছর প্রথম অন্য রাজ্য থেকে এসে ভোট দিচ্ছি। বাড়ির লোকজনের সঙ্গে দেখা করা আর ভোট দেওয়া, এক ঢিলে দুই পাখি মারার উদ্দেশ্যেই এসেছি।’’
  • Link to this news (আনন্দবাজার)