ভোটযুদ্ধে কোন্দলের কাঁটা শাসকের, ‘শান্তি’র পথে বিরোধীরা
আনন্দবাজার | ২৩ এপ্রিল ২০২৬
গলির মুখে চায়ের দোকানেরসামনে ঘিরে বসে মাঝবয়সিরা। খালপাড়ের দোকানের সেই ভিড়ের আলোচনায় খেলা, যুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশ ও বিশ্বের রাজনীতি— কিছুই বাদ যাচ্ছে না। তবে সেখানে ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলা রাজ্য বিধানসভার ভোট নিয়ে টুঁ শব্দটি নেই। বেলেঘাটার ভোটেরহাওয়া কেমন?— আলোচনার মাঝে প্রশ্ন ছুড়তেই গনগনে চায়ের পাত্র থেকে মাটির ভাঁড়ে চা ঢালতে ব্যস্ত দোকানি থামলেন। আড়চোখে দেখে বললেন, ‘‘এখানকার হাওয়া তো সারা বছরই ভাঁড় থেকে ধোঁয়া ওঠা চায়ের মতো। বেলেঘাটা আর কবে শান্ত হল!’’
কখনও সিন্ডিকেটের বিবাদ, আবার কখনও শাসকের এলাকা দখল ঘিরে গোষ্ঠী সংঘর্ষে একাধিক বার হাওয়া ‘গরম’ হয়েছে বেলেঘাটায়। বিবাদে বোমা, গুলি চলার অভিযোগও বাদ যায়নি। গোষ্ঠী-কোন্দলে বছরভর ‘গরম’ থাকার অভিযোগই বিধানসভা নির্বাচনের আগে হুল ফোটাচ্ছে বেলেঘাটার শাসক তৃণমূলকে। এলাকাভিত্তিক সার্বিক সমস্যা— যেমন বস্তি উন্নয়ন না হওয়া, পানীয় জলের সমস্যা, স্কুলে শিক্ষার পরিবেশ ফেরানোর সঙ্গে প্রচারে বিরোধীদের মুখে ঘুরেফিরে আসছে শাসকের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ইতিহাস। ভোটারের মন বুঝে তৃণমূল মিলেমিশে থাকার বার্তা দিলেও আশঙ্কা ঘুরছে বেলেঘাটার রাজনীতির বাতাসে।
‘হাওয়া’ বুঝে তাই এই কেন্দ্রে এ বার প্রার্থী বদলের পথে হেঁটেছে তৃণমূল। তিন বারের বিধায়ক পরেশ পালের বদলে দাঁড় করানো হয়েছে দলীয় মুখপাত্র কুণাল ঘোষকে। ‘ড্যামেজ কন্ট্রোলে’ নাম ঘোষণাহতেই বিধানসভা এলাকার পুরপ্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করেছেন প্রার্থী কুণাল। ‘এক সুতোয় বাঁধা’র বার্তা দিতে বিদায়ী বিধায়ক পরেশের সঙ্গে দেখা করে আশীর্বাদও নিয়েছেন বলে দাবি কুণালের।
কিন্তু তার পরেও কোন্দলের কাঁটা যে বিঁধবে না, সেই নিশ্চয়তা কোথায়? কুণাল যদিও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের তত্ত্ব উড়িয়ে ‘মিলেমিশে উৎসবের মেজাজে’ ভোট-বৈতরণী পার করার ব্যাপারে আশাবাদী। সিন্ডিকেট বিবাদের অতীত ইতিহাস প্রসঙ্গে তাঁর সাফাই, ‘‘যত রটে, তত সব সময়ে ঘটে না। সব কিছুর সঙ্গে রাজনীতিরও যোগ থাকে না।’’
তবে বিরোধী বিজেপি এবং সিপিএম প্রার্থী অশান্তির অতীত উদাহরণ তুলে এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাড়ি বাড়ি প্রচার সারছেন। সঙ্গে বিরোধীদের প্রচারে আসছে এলাকায় পানীয় জল,বস্তির হাল, বেলেঘাটা খালপাড়ের উন্নয়নের একাধিক প্রতিশ্রুতিও। বিজেপি বেলেঘাটা কেন্দ্রে প্রার্থী করেছে পার্থ চৌধুরীকে। সিপিএম ভরসা রেখেছে দলের মহিলা সংগঠনের সর্বভারতীয় নেত্রী পারমিতা রায়ের উপরে।
এলাকার ‘গরম’ হাওয়া পাল্টাতে ভোটে জিতলে ওয়ার্ডভিত্তিক ‘শান্তি কমিটি’র দাওয়াই দিতে চান দীর্ঘ দিনের পোড়খাওয়া নেত্রী পারমিতা। ২৮, ২৯, ৩৪ নম্বর-সহ বিধানসভা এলাকার আটটি ওয়ার্ডের বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্রচারে বস্তি উন্নয়ন, বেকার যুবকদের চাকরির সঙ্গে বার বার তাঁর মুখে আসছে ‘শান্তি’র কথা। পারমিতা বলছেন, ‘‘শান্তির কথা কেন বলব না? শহরের ভিতরে বোমা-গুলির এমন লড়াই আর কোথাও হয় বলে তো মনে হয় না। সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ।যাঁরা সিন্ডিকেটের অংশ নন, সেই সাধারণ মানুষকে কেন এর জন্য ভুগতে হবে?’’
বিজেপি প্রার্থী পার্থ চৌধুরী যদিও সিন্ডিকেটের এই বাড়বাড়ন্তের জন্য এলাকায় কর্মসংস্থানের অভাবকেই দুষছেন। তাঁর প্রচারে আসছে বেলেঘাটার পানীয় জলের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস। সঙ্গে কমবয়সিদের কর্মসংস্থানের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথাও বার বার শোনাচ্ছেন। পার্থের কথায়, ‘‘ছেলেদের হাতে কাজ নেই। তাই বাধ্য হয়ে একটা বড় অংশ সিন্ডিকেটের দলে ভিড়েছেন। হাতে কাজ থাকলে এই সমস্যা এড়ানো যেত।’’ বিজেপি প্রার্থী কর্মসংস্থানের কথা বলে বাজিমাত করতে চাইলেও বাদ সাধছে দলের গোষ্ঠীকোন্দল। প্রার্থী বদলের দাবি তুলে বিক্ষোভও করেছেন দলীয় কর্মীরা।
২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের সঙ্গে বেলেঘাটা কেন্দ্রও হাতছাড়া হয়েছিল বামেদের। জয়লাভ করেছিলেন তৃণমূল প্রার্থী পরেশ। পরবর্তী কালে তিন বার এই কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে ৬৭ হাজারের বেশি ভোটে বিজেপিকে পরাজিত করে তৃণমূল। ২০২৪-এরলোকসভার নিরিখে এই কেন্দ্রে ব্যবধান কমলেও নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ঘাড়ে নিঃশ্বাস পর্যন্ত ফেলতেপারেননি। সে বার ৪৬ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিল তৃণমূল। যদিও ব্যবধানের এই হিসাব নড়বড়ে করে দিতেপারে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)। বেলেঘাটা কেন্দ্র থেকে ৪০ হাজারেরও বেশি নাম বাদ পড়ছে এসআইআরে। নিচুতলার একাংশের কোন্দল এবংএসআইআর এই কেন্দ্রে তৃণমূলের নিশ্চিত ফলে যে একেবারেই‘প্রভাব’ ফেলবে না, সেই নিশ্চয়তা দিতে পারছে না রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
কুণাল যদিও ‘প্রভাবে’র আশঙ্কা উড়িয়ে দাবি করছেন, ‘‘সাধারণমানুষ দেখেছেন, এসআইআর-ভোগান্তিতে কোন দল প্রথম থেকে তাঁদের পাশে রয়েছে। হয়রানির প্রতিবাদে ভোটারেরা আরও ঐক্যবদ্ধ। তাঁরা বিশ্বাস করছেন, একমাত্র তৃণমূলই বিজেপি-কে হারাতে পারে। কাউন্সিলর থেকে শুরু করে সর্বস্তরের দলের নেতারা নেমে পড়েছেন। ফলাফলের দুপুরে সবাই তা বুঝতে পারবেন।’’
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বেলেঘাটা কেন্দ্রে তৃণমূলের বিধায়ক পরেশ এ বার নির্বাচনের বাইরে। নাম ঘোষণা হওয়ার পরেইতৃণমূল প্রার্থী তাঁর আশীর্বাদনেওয়ার দাবি করে ইতিমধ্যেই ঐক্যের বার্তা দিয়েছেন। কিন্তু পরেশ কী বলছেন? তাঁর গলায় খানিক উল্টো সুর। দলীয় প্রচারে এখনও তাঁর দেখা মেলেনি। এ নিয়ে যদিও বিস্তারিত কিছু বললেন না। তাঁর উত্তর, ‘‘কেউ তো এখনও ডাকেনি। ডাকলে তবে তো যাব!’’