• স্বজনহারারা কেউ ভোট দিলেন, কেউ পারলেন না
    আনন্দবাজার | ২৪ এপ্রিল ২০২৬
  • রাজ্যে এসআইআর চলাকালীন আতঙ্কে কারও স্ত্রী, কারও স্বামী মারা গিয়েছেন। কেউ হারিয়েছেন বাবা-মাকে। সেই স্বজনহারাদের অনেকের চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নাম না ওঠায় ভোট দেওয়া হল না। অনেকে আবার যন্ত্রণা চেপেই গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করলেন বৃহস্পতিবার। ভোটের দিনও দু’জনের মৃত্যুতে উঠেছে এসআইআর নিয়ে মানসিক চাপের অভিযোগ।

    ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়েছিল হুগলির দাদপুরের গোস্বামী মালিপাড়ার গায়ত্রী মাঝির (৬০)। এ দিন সকালে বাড়ির কাছে বাঁশবাগানে তাঁর ঝুলন্ত দেহ মেলে। তাঁর ছেলে পল্টুর দাবি, নাম বাদ যাওয়ায় গায়ত্রী অবসাদে ভুগছিলেন। পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুরের সীমাগেরিয়া গ্রামের দিঘা বুথের সামনে ভোট দিয়ে বেরিয়ে মারা যান ইসরাতন বিবি (৫৫)। তাঁর স্বামী শেখ নবাব জান আলি বলেন, ‘‘প্রবল গরমে স্ত্রী অনেকক্ষণ লাইনে ছিল। তা ছাড়া, আমাদের বাড়ির ছ’জনের মধ্যে চার জনের নামই কাটা পড়েছে। আমার নামও কাটা গিয়েছে। তা নিয়ে ও খুব উদ্বেগে ছিল।’’ কলকাতার যাদবপুরে নির্বাচনী প্রচারসভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও দাবি, “কেশপুরে এক মহিলা মারা গিয়েছেন। তাঁর নাম আছে, ছেলে ও বরের নাম নেই। দুঃখে মারা গিয়েছেন। এই জীবনগুলির দাম কে দেবে?”

    কোচবিহারের দিনহাটার ফলিমারি গ্রামের সুভাষচন্দ্র বর্মণ এসআইআর-আতঙ্কে আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ। ভোটার তালিকায় তাঁর নাম ঠিক ছিল। কিন্তু স্ত্রী সুচিত্রা রায় বর্মণের বাবার নামের জায়গায় দাদার নাম এসেছিল। পরিবারের দাবি, সে আতঙ্কেই ছিলেন সুভাষ। সুচিত্রার নাম শেষে তালিকায় উঠেছে। এ দিন ভোটও দিয়েছেন তিনি। সুচিত্রার কথায়, ‘‘স্বামীর জন্য খুব খারাপ লাগছে।’’ কোচবিহারের নাজিরহাটের বেলালউদ্দিন মিয়াঁও এসআইআর-আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। তাঁর স্ত্রী দিলবরা খাতুন বলেন, ‘‘স্বামী-স্ত্রীর নাম ভোটার তালিকায় ছিল না। স্বামী সে আতঙ্কেই মারা যান। নাম না ওঠায় আমারও ভোট দেওয়া হল না!’’

    কোচবিহারেরই দিনহাটার জিৎপুর গ্রামের খাইরুল শেখ এসআইআর শুরুর সময়ে কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। প্রাণে বাঁচলেও নাম বাতিল হওয়ায় ভোট দিতে পারেননি তিনি। এ দিন ভোটকেন্দ্রের সামনেই ঘোরাঘুরি করছিলেন খাইরুল। বললেন, ‘‘বিভিন্ন নথিতে ভিন্ন ভিন্ন নাম ছিল আমার। আতঙ্কিত হয়েই ওই ঘটনা ঘটিয়েছিলাম। ভোট দিতে না পেরে খারাপ লাগছে।’’ তাঁর স্ত্রী আমিনা বিবি অবশ্য ভোট দিয়েছেন।

    এসআইআর-আতঙ্কে পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুর ২ ব্লকের দক্ষিণ ঢেকিয়া গ্রামের যুবক বাবলু হেমব্রমের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছিল। পরিবারের দাবি, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় বাবা-মায়ের নাম না থাকায় উদ্বিগ্ন ছিলেন তিনি। তাতেই অসুস্থতায় মৃত্যু হয়। বাবলুর মা লক্ষ্মী হেমব্রমের নামও ভোটার তালিকায় ওঠেনি। তবে বাবলুর দিদি বিবাহিত পার্বতী সরেন ভোট দিয়েছেন।

    ভোট দিয়েছেন বাঁকুড়ার মৃত বিএল‌ও-র স্ত্রী এবং ছেলেও। গত ২৮ শে ডিসেম্বর রানিবাঁধের রাজাকাটা গ্রামে মাঝপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে উদ্ধার হয় ২০৬ নম্বর বুথের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএলও, ওই স্কুলেরই প্রধান শিক্ষক হারাধন মণ্ডলের ঝুলন্ত দেহ। দেহের পাশে সুইসাইড নোটে লেখা ছিল, ‘কাজের চাপ না নিতে পারা’র কথা। পরিজনও সেই অভিযোগ করেন। এ দিন ওই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বুথেই ভোট দেন মৃতের স্ত্রী মালা মণ্ডল ও ছেলে সোহম মণ্ডল।

    গত লোকসভা নির্বাচনেও স্বামীর হাত ধরে বুথে গিয়ে ভোট দিয়েছিলেন মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের গান্ধী কলোনির পিয়া সাহা। পর্যাপ্ত নথি না থাকার আতঙ্কে পিয়ার স্বামী তারক সাহা আত্মহত্যা করেন বলে দাবি। নাম বাতিল হয়েছে পিয়ার ছেলে বিজয় সাহারও। পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই পিয়া একাই ভোট দেন। তাঁর ক্ষোভ, ‘‘সর্বনাশা এসআইআর আমার পরিবার ছারখার করেছে! এ বারের ভোট আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’’
  • Link to this news (আনন্দবাজার)