বোমার শব্দ নেই। মারপিট নেই, নেই রক্তপাত। প্রার্থীকে আটক করে রাখার ঘটনাই বা ঘটল কই! বুথ দখল, ছাপ্পা... না, কোনও অভিযোগ উঠলনা সারা দিনে।
কেশপুর আর নেই সে কেশপুর।
পুকুরে ঢিল মারলে যে হালকা ঢেউ ওঠে, কেশপুর-গড়বেতার এ বারের বিধানসভার ভোটে সে রকম ঢেউও উঠল না। বলছেন এলাকার মানুষই। তাতেই প্রশ্ন উঠেছে, তা হলে কি কেশপুর, গড়বেতায় জলের গভীরে চোরাস্রোত বইছে? ভোট শেষে তা-ই নিয়েই জল্পনা।
সকালটা শুরু হয়েছিল প্রার্থীদের বিভিন্ন কেন্দ্রে ঘোরার ব্যস্ততা দিয়ে। মেদিনীপুর-কেশপুর রাজ্য সড়কের উপর দিয়ে তীব্র গতিতে ছুটে যাচ্ছিল তৃণমূল প্রার্থী শিউলি সাহার কনভয়। শিউলি খবর পেয়েছেন, বাজুয়ারা গ্রামের প্রাথমিক স্কুলের বুথে গন্ডগোল হচ্ছে, অবাঞ্ছিত কিছু মানুষ ঢুকে পড়েছে। আরও শুনেছেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী ভোটারদের উপর লাঠিচার্জ করছে। শিউলি ওই কেন্দ্রে গিয়ে জানতে পারেন, পরিস্থিতি শান্ত হয়ে গিয়েছে। ওই ভোটকেন্দ্রের সামনে লাইনে লাঠিচার্জ করেছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। কেন ভোটারদের উপর লাঠিচার্জ করা হল, এই নিয়ে বচসায় জড়িয়ে পড়েন শিউলি। কেন্দ্রীয় বাহিনীর দাবি, বুথের ১০০ মিটারের মধ্যে কোনও ধরনের জমায়েত করতে দেওয়া যাবে না। ওখানে জমায়েত হচ্ছিল, তাই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই অভিযোগ ছিল খেজুরবনির প্রাথমিক স্কুলে। সেখানেও বাহিনী কোনও জমায়েত করতে দেয়নি। শিউলির অভিযোগ, কেন্দ্রীয় বাহিনী বাড়াবাড়ি করছে। তবে তার সঙ্গেই জুড়ে দেন, যে যা-ই করুক, তাঁরজয় স্পষ্ট।
বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু সামন্তের আবার অভিযোগ, কিছু বুথে তৃণমূলের সমর্থকরা জটলা পাকিয়ে এলাকা অশান্ত করার চেষ্টা করছে। একটি বুথে আই-প্যাক এর কর্মীরা বিডিও অফিসের কর্মী বলে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। তার পরে তিনিও পাল্টা যোগ করেন, ‘‘তবে এ সব করেও তৃণমূল এ বার হারছে।’’
কেশপুরের কাছে মুখবসান গ্রামের এক বাসিন্দা বলছিলেন, ‘‘কেশপুর-গড়বেতায় ভোটের দিন এ সব মামুলি অভিযোগ জলভাত। ১৯৯৮ সালে তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকেই এলাকা দখল নিয়ে তৃণমূল-সিপিএমের মারামারি শুরু হয়। সিপিএম আমল তো বটেই, ২০১১ সালে পালাবদলের সময়, ২০২১ সালের বিধানসভা আর ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটেও বুথ জ্যাম, রিগিং, ছাপ্পা ভোট, প্রার্থীকে আটকে রাখা, কেন্দ্রীয় বাহিনীর মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। এমনকি, গড়বেতার একটি কেন্দ্রে পুনরায় ভোট হয়। এ বারের মতো শান্তিপূর্ণ ভোট আগে দেখিনি।’’
সিপিএমের জমানায় কেশপুরে তাদের পার্টি অফিস জামশেদ আলি ভবনে ভোটের দিন কর্মী-সমর্থকে গমগম করত। এ দিন সেই বাড়ি কার্যত খাঁ-খাঁ করছে।
অনেকে বলছেন, কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়াকড়ির জন্যই এ বার কেশপুর এত শান্ত। গড়বেতার সিপিএম প্রার্থী, একসময়ের সিপিএমের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা তথা ছোট আঙারিয়ার একসময়ের প্রধান অভিযুক্ত তপন ঘোষকে দেখা গেল দুপুর ১টায় বসে আছেন নিজের পার্টি অফিসে। বুথে বুথে না ঘুরে পার্টি অফিসে কেন? তপনের জবাব, ‘‘যা নিয়ন্ত্রণ করার, মোবাইল দিয়েই করছি।’’ তাঁর কথায়, ‘‘এ বারে ভোটে শান্তি বজায় থাকার প্রধান কারণ, শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় বাহিনী কড়াকড়ি নয়। ভোটের আগে যে প্রশাসনিক কর্তাদের রদবদল হয়েছে, তার ফলেও শান্তি বজায় রয়েছে।’’ তপনের দাবি, ‘‘এই কড়াকড়িতে আমাদেরই সুবিধা। আমাদের লড়াইটা এ বার বিজেপির সঙ্গে। জিততে না পারলেও দ্বিতীয় হবই।’’
গড়বেতার একটি ভোটকেন্দ্রের কাছে কিছু তৃণমূল সমর্থক আবার জানালেন, প্রার্থীরা নিজে থেকে অভিযোগ না করলে তাঁরা কোনও কেন্দ্রে আগে বাড়িয়ে ছুটে যাচ্ছেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রাজনৈতিক দলের সমর্থক বলেন, ‘‘ভোটের দিন অতি সক্রিয় হয়ে আমাদের কী লাভ? দলের নেতাদের মধ্যে নানা কোন্দল। আমরা তো সেই একই থাকছি। আখের গোছাচ্ছেন তো নেতারা!’’
গোলমালের খবর কম। তাতেই কি লুকনো থাকছে কোনও বদলের ইঙ্গিত? স্থানীয়েরা জানাচ্ছেন, কেশপুরে প্রতিবারই জয়ের ব্যবধান থাকে ১ লাখের উপরে। সিপিএম জামানায় কেশপুর বিধানসভা কেন্দ্রে নন্দরাণী ডল এক লাখের উপর ব্যবধানে জিতেছিলেন। ২০২১ সালে তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপির ব্যবধান কুড়ি হাজার হলেও ২০২৪ সালে আবার লোকসভা ভোটে কেশপুর বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপির থেকে ১ লাখ ৩ হাজার ৩৫৮ ভোটে ‘লিড’ নেয় তৃণমূল। এ বারও কেশপুরের আনন্দপুরে সভা করতে এসে তৃণমূলে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলে গিয়েছেন, ১ লাখ ভোটের ব্যবধানে জিততে হবে। কিন্তু এ বার কি সেই ব্যবধানে দলকে জেতাতে কোন দলের ভোটকর্মীর মধ্যেই মরিয়া ভাব দেখা গেল?
সকাল থেকেই কেশপুর, গড়বেতায় ভোট দেওয়ার দীর্ঘ লাইন। মানুষের উৎসাহ প্রচুর। চুপচাপ তারা কোথায় ছাপ দিচ্ছেন, সেই নিয়ে চাপা ‘টেনশন’ থেকে গেল সব দলের মধ্যেই।