ঘরবাড়ি, জমি-জিরেত ডুবিয়ে পারভাঙা গঙ্গা গত কয়েক দশকে বলাগড়ের মানচিত্র খানিকটা বদলে দিয়েছে। সেই গঙ্গাপারেই নোঙর ফেলবে উন্নয়ন, হবে মিনি বন্দর— আশায় রয়েছেন গ্রামবাসী। বিজেপিও প্রচারে সে কথা তুলছে।
’২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে তৃণমূল প্রায় ছ’হাজার ভোটে জিতেছিল। তবে, গত লোকসভা নির্বাচনে তারা প্রায় পাঁচ হাজার ভোটে বিজেপির চেয়ে পিছিয়ে ছিল। সেই পরিসংখ্যান তুলে ধরার পাশাপাশি বিজেপির দাবি, তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, দুর্নীতি, দলের একাংশের বিরুদ্ধে বিদায়ী বিধায়ক মনোরঞ্জন ব্যাপারীর তোলা গঙ্গার বালি-মাটির অবৈধ কারবার মানুষ ভাল ভাবে নিচ্ছেন না। রয়েছে ‘অনুন্নয়ন’-এর প্রশ্নও। তাই তারাই জিতবেন বলে দাবি করছেন বিজেপি নেতৃত্ব।
গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব যে বিজেপির অন্দরে দেখা যায়নি, এমন নয়। বিজেপি প্রার্থী সুমনা সরকার আগে তৃণমূলে ছিলেন। তাঁকে প্রার্থী করায় বিজেপির কোন্দল রাস্তায় নেমেছিল। পদ্ম-শিবিরের দাবি, এখন সবাই এককাট্টা। সুমনারবক্তব্য, ‘‘তৃণমূল অপপ্রচার করে কিছু করতে পারবে না। বলাগড়ে পদ্ম ফুটবে। বন্দর হলে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে।’’
গত জানুয়ারিতে বলাগড়ের ভবানীপুর চরে মিনি বন্দরের ভার্চুয়াল শিলান্যাস করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। জাহাজে লোহা, আকরিক ইত্যাদি এসে সড়কপথে গন্তব্যে যাবে। মানুষের আশা, বন্দর হলে আর্থ-সামাজিক বুনিয়াদে জোয়ার আসবে। আনাচ-কানাচে শোনা যায়, ওই সব কাজ-কারবারে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও নেতাদেরও নজর রয়েছে। প্রস্তাবিত জমি কয়েক দশক আগে বন্দর, পরে সিইএসসি-র জন্য অধিগ্রহণ নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ আছে। প্রকল্প না হওয়ায় কর্মসংস্থানও হয়নি। ওই জমিতে চাষ হয়। চাষিরা চান, বন্দর হোক উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে। সৌমেন কবিরাজ, জয়ন্ত সরকারের মতো গ্রামবাসীরা বলেন, ‘‘বন্দর হোক। তাতে এলাকার উন্নতি, প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ কর্মসংস্থান হবে। চাষিদের দিকটা যেন দেখা হয়।’’
তৃণমূলের দাবি, বিজেপি দিবাস্বপ্ন দেখছে। এ বার জোড়াফুলের প্রার্থী রঞ্জন ধারা। তৃণমূলের একাংশের বক্তব্য, পরিস্থিতি অনেকটা সামলানো গিয়েছে। গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কার্যত নেই। তৃণমূলের প্রচারে লক্ষ্মীর ভান্ডার-সহ নানা প্রকল্পের কথা ফিরছে। বিজেপির বন্দরের আশ্বাস নিয়ে রঞ্জন বলেন, ‘‘আগে হোক। বিজেপি এমন অনেক প্রকল্পের শিলান্যাস করে। বহু প্রতিশ্রুতি আগেও দিয়েছে। কাজ হয়নি। গঙ্গাভাঙন রোধে কেন্দ্র সরকার কী করবে, তা তো কিছু বলছেনা।’’ বস্তুত, হুগলির এই কেন্দ্রে গঙ্গাভাঙন বড় সমস্যা। গত কয়েক দশকে বহু জমি নদীগর্ভে তলিয়ে গিয়েছে। বছরভর আতঙ্কে থাকেন বাসিন্দারা। এক তৃণমূল নেতার কথায়, ‘‘একে তো ভাঙন রোধে কেন্দ্র কিছু করেনি। তার উপরে এসআইআর নিয়ে মানুষের ক্ষোভ রয়েছে। যে পরিবারের সদস্যের নাম বাদ পড়েছে, তাদের কারও ভোট বিজেপি পাবে না।’’ বিজেপি নেতাদের পাল্টা দাবি, ভাঙন রোধে রাজ্যই উদ্যোগী নয়। কেন্দ্রের টাকাফিরে গিয়েছে।
১৭টি পঞ্চায়েতের বিধানসভায় গ্রামে গ্রামে পাকা রাস্তা হয়েছে। কিন্তু জলের সমস্যা পুরোপুরি মেটেনি আর্সেনিকপ্রবণ এ তল্লাটে। সুখসাগর প্রজাতির পেঁয়াজ সংরক্ষণের ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। গুপ্তিপাড়া-সহ কিছু এলাকার মানুষের চিকিৎসা কার্যত পাশের পূর্ব বর্ধমানের কালনা-নির্ভর। সুস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পরিষেবার উন্নতি, পথবাতি, সাঁকো বা সেতুর দাবিও মেটেনি অনেক জায়গায়। প্রধান দুই দলই জিতলে সে সব করার আশ্বাস বিলোচ্ছে। লড়াইয়ে আছে সিপিএম, কংগ্রেসও। সিপিএম প্রার্থী বিকাশ গোলদার এবং কংগ্রেস প্রার্থী অশোক বিশ্বাস কর্মসংস্থানের কথাও বলছেন। সে ক্ষেত্রেও ঘুরে-ফিরে আসছে প্রস্তাবিত বন্দরের কথা।