• নাম বাদ? ভোট-অফিসারদেরও হাই কোর্ট দেখাল শীর্ষ আদালত
    আনন্দবাজার | ২৫ এপ্রিল ২০২৬
  • নির্বাচন কমিশন তাঁদের নির্বাচনের কাজে আধিকারিক হিসেবে নিয়োগ করেছে। সেই নির্বাচন কমিশনই এসআইআর-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে তাঁদের নাম বাদ দিয়েছে!

    পশ্চিমবঙ্গে ভোটের কাজে নিযুক্ত এমন ৬৫ জন অফিসার শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলেন। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে তাঁদের আইনজীবী এম আর শামসাদ সওয়াল করেছেন, ‘‘এই ৬৫ জনকে নির্বাচনের কাজে নিয়োগ করা হয়েছে। সেই নির্দেশিকায় ভোটার কার্ডের নম্বরও রয়েছে। কিন্তু তাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে গিয়েছে। ফলে যাঁরা ভোটগ্রহণের দায়িত্বে থাকবেন, তাঁরা নিজেরাই পোস্টাল ব্যালটে বা ইভিএমে ভোট দিতে পারবেন না। অনেকের ক্ষেত্রে নাম বাদের কারণও জানানো হয়নি। এটা তো আপাতভাবে যথেচ্ছাচার।’’

    সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য এই ৬৫ জনের জন্য সুরাহার বন্দোবস্ত করতে পারেনি। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি বিপুল পাঞ্চোলির বেঞ্চ তাঁদের রাজ্যে এসআইআর-এর জন্য তৈরি আপিল ট্রাইবুনালে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, যা বক্তব্য, তা ট্রাইবুনালকে জানাতে হবে। তবে সে ক্ষেত্রেও যে এ বার তাঁদের ভোট দিতে পারার আশা কম, তা এক প্রকার মেনে নিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেছেন, ‘‘হয়তো এ বারের নির্বাচনে তাঁরা ভোট দিতে পারবেন না। তবে তার থেকেও মূল্যবান, ভোটার তালিকায় থাকার অধিকার। সেই অধিকার অবশ্যই সুরক্ষিত থাকা উচিত।’’

    এই ৬৫ জনের আইনজীবীরা অবশ্য বলছেন, তাঁরা ৫ এপ্রিলই ট্রাইবুনালে আবেদন করেছেন। এখনও তাঁদের আবেদনের নিষ্পত্তি হয়নি। কারণ, লক্ষ লক্ষ আবেদন ঝুলে রয়েছে। সমাজকর্মী অঞ্জলি ভরদ্বাজের মন্তব্য, ‘‘নির্বাচনী অফিসাররাই যদি পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় না থাকেন, তা হলে দু’টি কারণে হতে পারে। সুপ্রিম কোর্ট তার চোখের সামনে ভোটারদের অন্যায়ভাবে নাম বাদ হতে দিচ্ছে। অথবা, বিদেশি নাগরিকরা পশ্চিমবঙ্গের ভোট করাচ্ছেন। একেবারেই বিচিত্র পরিস্থিতি।’’

    সুপ্রিম কোর্ট গত ১৩ এপ্রিল নির্দেশ দিয়েছিল, ২৩ এপ্রিল প্রথম দফার ভোটের আগে, ২১ এপ্রিল পর্যন্ত যে সব বাদ পড়া ভোটার ট্রাইবুনালের ছাড়পত্র পাবেন, তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় যোগ হবে। বিবেচনাধীন তালিকা থেকে বাদ পড়া ২৭ লক্ষ মানুষের মধ্যে মাত্র ১৩৯ জন ছাড়পত্র পেয়ে ভোটার তালিকায় ফিরতে পেরেছেন। আজ সুপ্রিম কোর্টে তৃণমূলের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘এটা দুঃখজনক। ট্রাইবুনাল যত জনের আবেদনের নিষ্পত্তি করেছে, সেই সংখ্যাটা আমাদের আশার তুলনায় খুবই কম।’’ ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত যাঁরা ট্রাইবুনালের ছাড়পত্র পাবেন, তাঁদের ভোটার তালিকায় নাম যোগ করার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও সংখ্যাটা খুব বেশি হবে বলে আইনজীবীরা মনে করছেন না। কল্যাণ দ্রুত নিষ্পত্তির প্রয়োজনের কথা বলেছেন।

    প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ শুক্রবার বলেছে, যদি কেউ ট্রাইবুনালের সামনে জরুরি প্রয়োজন দেখাতে পারেন, তা হলে ট্রাইবুনাল তাঁর আবেদন জরুরি ভিত্তিতে শুনতে পারে। ট্রাইবুনালের প্রশাসনিক দিকে কোনও সমস্যা হলে কেউ কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করতে পারেন। ভোটার তালিকায় সমস্যা হলে, বিচারবিভাগীয় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হলেও হাই কোর্টে যাওয়া যাবে। সুপ্রিম কোর্ট এ দিন কালিয়াচকের ঘটনায় এনআইএ-কে চার্জশিট পেশ করে তদন্তের অগ্রগতির রিপোর্ট দেওয়ার জন্যও সময় দিয়েছে।

    রাজ্যের প্রথম দফার ভোটে ৯২ শতাংশের বেশি ভোট পড়া ও ভোটগ্রহণ কার্যত হিংসামুক্ত হওয়ায় সুপ্রিম কোর্ট শুক্রবার সন্তোষ প্রকাশ করেছে। প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘‘আমি নাগরিক হিসেবে খুব খুশি।’’ বিচারপতি বাগচী বলেন, ‘‘কোনও হিংসার ঘটনাও ঘটেনি।’’ কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা এ জন্য নিরাপত্তা বাহিনীকে সাধুবাদ জানান। বিচারপতি বাগচী বাংলায় বলেন, ‘‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়।’’ নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী ডি এস নায়ডুকে বিচারপতিরা বলেন, ‘ব্যতিক্রমী ঘটনা যে, সবাই আপনার মক্কেলকে সাধুবাদ জানাচ্ছে।’ কল্যাণ বলেন, কমিশন গত কয়েক দিনে কলকাতা হাই কোর্টের ভর্ৎসনার মুখে পড়েছে। নায়ডু বলেন, তাঁকে হাই কোর্টে কল্যাণেরও তোপের মুখে পড়তে হয়েছে। বিচারপতি বাগচী তখন কল্যাণকে বলেন, ‘‘উনি কলকাতায় গেলে আপনার দায়িত্ব, অভ্যর্থনা জানানো।’’ কল্যাণ বলেন, তিনি নির্বাচন কমিশনের আইনজীবীকে আগামী ৪ মে ভোটের ফল প্রকাশের দিন আগাম নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখছেন।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)