সাফল্যের শিখরে পৌঁছোলেই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যান অনেকে, অরিজিতের জীবনযাত্রা এ ধারণা ভেঙে দিয়েছে
আনন্দবাজার | ২৫ এপ্রিল ২০২৬
অরিজিৎকে বহু দিন ধরে চিনি। আমাদের একসঙ্গে গান রয়েছে ঠিকই। কিন্তু সেই গানের রেকর্ডিং আমরা একসঙ্গে করিনি। তবে ওকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনি। খুব সুন্দর একটা সম্পর্ক ওর সঙ্গে। গান ভালবাসে, এমন দুটো মানুষের যেমন বন্ধুত্ব হয়, তেমনই বন্ধুত্ব ওর সঙ্গে আমার। বয়সে ও আমার চেয়ে ছোট। তাই ও আমার ছোট ভাইয়ের মতোই বলা যায়। ওকে অনেক ছোট বয়স থেকে দেখছি। ও সার্থক ভাবে বড় হয়েছে।
আমি কিন্তু বহু আগে অরিজিতের গান শুনেছিলাম এবং সেই গান কোনও ছবির ছিল না। ওর কণ্ঠে একটি গজ়ল শুনেছিলাম। ইন্দ্রদীপদার (ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত) জন্য সেই গান শুনতে পেয়েছিলাম। সেই গজ়লটা অরিজিৎ আজও গাইতে খুব ভালবাসে। জিয়াগঞ্জে গিয়েছি। ওঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত কেমন সম্পর্ক, তা নিয়ে অনেকেই জানতে চান। তবে সেটা ব্যক্তিগতই থাক। ও জিয়াগঞ্জে যে পরিবেশটা গড়ে তুলতে চাইছে, সেটার জন্য আমি ওর পাশে আছি।
অরিজিতের গান নিয়ে বলতে গেলে শেষ হবে না। সত্যি বলতে, অরিজিতের গান নিয়ে মানুষকে আর নতুন করে কিছু বলারও নেই। আমরা সবাই ওর গান নিয়ে কথা তো বলিই। ওর আরও একটা বিষয় নিয়ে সমান ভাবে কথা বলা দরকার। সেটা হল ওর মানবিকতাবোধ। আমাদের পৃথিবীতে বহু ভাল গায়ক, বাদক এসেছেন, আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। কিন্তু একই সঙ্গে প্রবল ভাবে সফল এবং ভাল মানুষ— এমন বোধহয় বিরল। কারণ, সাধারণত আমরা দেখি, যাঁরা কর্মজীবনে বিশেষ উচ্চতায় পৌঁছোন এবং সফল হন, তাঁরা আত্মকেন্দ্রিক হন। তাঁরা নিজেদের নিয়ে অতি সচেতন হয়ে থাকেন। কিন্তু অরিজিতের কাছে এগুলি কোনও দিনই অগ্রাধিকার পায়নি। ওর অন্তরটা খুব পরিষ্কার। যাঁরা প্রচারের আলোয় থাকেন, তাঁদের হয়তো ভিতর ও বাইরের মানুষটা আলাদা হয়। কিন্তু ও বাইরে যেমন, ভিতরেও তেমনই।
অরিজিতের সাহস আছে। মনের ভিতরটা এখনও এমন রাখতে পেরেছে ও। জগতে সাফল্যের শিখরে থেকেও এমন সাধারণ জীবনযাপন বজায় রাখতে সাহস লাগে। সাধারণ মানুষ যে ভাবে জীবন কাটিয়ে আনন্দ পান, অরিজিৎও তেমনই থাকে। ও নিজের মাটির সঙ্গে আঁক়ড়ে থাকতে জানে। ওর আত্মবিশ্বাস প্রবল। নিজের প্রতি বিশ্বাস না থাকলে এমন হওয়া সম্ভব নয়। ও সত্যিই নিজের মাটি, নিজের এলাকাকে ভালবাসে। বছরের পর বছর কারও পক্ষে ভান করা সম্ভব নয়। অরিজিতের এই গুণের আমি সত্যিই প্রশংসা করি।
অরিজিতের গান শুনে বহু মানুষ অনুপ্রাণিত। অনেকেই গানের জগতে আসতে চান ওর গান শুনে। তাঁদের বলব, গানের মতোই, ওর জীবনের পথটাকেও অনুসরণ করতে। ওর মতো মানুষ তৈরি হলে, সমগ্র ইন্ডাস্ট্রিতেই স্বাভাবিকতা আরও বাড়তে পারে। আসলে ওর মতো শিকড়ের কাছে থাকাটা জানতে হবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে চিনতে পারাটা জরুরি। চিনতে না পারলে তো নিজের সঙ্গেই আর যোগ স্থাপন করা যায় না।
সফল হতে গেলে ভাল মানুষ আর থাকা যায় না— এমন ধারণা ভাঙাও জরুরি। তাই যাঁরা ওর গানের ভক্ত, তাঁরা যেন মানুষ অরিজিৎকে দেখেও কিছু শেখেন। সফল হওয়ার পরে নির্দিষ্ট ধরনের গাড়িতে চড়তে হয়, নির্দিষ্ট ধরনের বাড়িতে থাকতে হয়— এগুলো যে গুরুত্বপূর্ণ নয়, তা বুঝিয়ে দিয়েছে অরিজিৎ।
সম্প্রতি অরিজিৎ একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ও আর প্লেব্যাক গাইবে না। তার পরে ওর সঙ্গে আমার বেশ কয়েক বার কথা হয়েছে। এটা কিন্তু কোনও দুর্ঘটনা নয়। অনেকেই বিষয়টায় দুঃখ পেয়েছেন। দুঃখের খবর হিসাবে নিয়েছেন। কিন্তু বিষয়টা তেমন নয়। আকাশে একটা গণ্ডি ছিল। অরিজিৎ সেই গণ্ডিটা মুছে দিয়েছে। ফলে ওর আকাশটা আরও বড় হয়ে গিয়েছে। এখন ওর পরিচয়টা ‘প্লেব্যাক গায়ক’ নয়। এখন ও গায়ক। ও তো সেই সঙ্গে গান বাঁধেও। গান নিয়েই থাকে। প্লেব্যাক গাওয়ায় ইতি টানার সিদ্ধান্ত অরিজিতের জীবনে উত্তরণের মতো। এ এক শিল্পীর মুক্তির বার্তা। ওকে জন্মদিনের শুভেচ্ছার পাশাপাশি এই সিদ্ধান্তের জন্যও আরও এক বার অভিনন্দন।