ভোট এলেই যেন বাংলা প্রবাদের নারদ মুনি ওভারটাইম খাটতে শুরু করেন। ভোটের সঙ্গে ‘অশান্তি’র এই সম্পর্ক আজকের নয়। ঠিক একশো বছর আগে, ১৩৩৩ বঙ্গাব্দে স্টার থিয়েটারের জন্য লেখা দ্বন্দ্বে মাতনম্ হাসির নাটকে রসরাজ অমৃতলাল বসু লিখেছিলেন—
তেত্রিশ কোটীর ওপর ঠাকুর তুমি ভোটেশ্বরীনারদ ঋষির মানস-কন্যা দম্ভে লম্বোদরীআত্ম বন্ধু প্রীতি যথা থাকে গলাগলি,তোমার দৃষ্টি সৃষ্টি তথা করে দলাদলি।
ভোট প্রক্রিয়াকে ব্যঙ্গ করে লেখা নাটকটিতে লোভ ও ভয় দেখিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করার যে ছবি ধরা পড়েছে, তা আজও প্রাসঙ্গিক। তবে রসরাজ প্রথম নন। তাঁরও কয়েক দশক আগে, ১২৮৯ বঙ্গাব্দে গিরিশচন্দ্র ঘোষ কলকাতা পৌরসভার ভোটের প্রেক্ষাপটে লিখেছিলেন ভোটমঙ্গল। মাঠের জায়গায় নতুন বাড়ি তোলা বন্ধ করা, চব্বিশ ঘণ্টা জল বা রাস্তার আলো দেওয়ার মতো চেনা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর পাশাপাশি, প্রার্থীদের জনসেবার চেয়ে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার প্রবণতাও লেখা ছিল তাতে।
তবে অতীতে রাজনৈতিক কদর্যতার পাশে সৌজন্যের অনন্য দৃষ্টান্তও দুর্লভ ছিল না। আজকের রাজনীতিতে মতান্তর মানেই যেখানে মনান্তরেরও শামিল, সেখানে সেকালের কিছু ঘটনা আমাদের অবাক করে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের রাজনীতির বিরোধী ছিলেন তাঁর জেঠতুতো ভাই, আর এক নেতা সতীশরঞ্জন। দু’জনেই ছিলেন নামী আইনজীবী। এক বার সতীশরঞ্জন বড়বাজার এলাকা থেকে আইনসভায় প্রার্থী হলেন। তাঁর বিপক্ষে অনামী সাতকড়িপতি রায়কে দাঁড় করালেন চিত্তরঞ্জন। ভোটের দিন চিত্তরঞ্জন প্রত্যেকটি পোলিং বুথের সামনে নীরবে হাতজোড় করে দাঁড়ালেন অল্প সময়ের জন্য। ভোটাররা শুধু চিত্তরঞ্জনের মুখ দেখে ভোট দিয়ে এলেন। শুধু চিত্তরঞ্জনের ব্যক্তিগত প্রভাব ও উপস্থিতিতেই সতীশরঞ্জন পরাজিত হন বড় ব্যবধানে। কিন্তু এই লড়াই তাঁদের পারিবারিক সম্পর্কে কোনও ফাটল ধরাতে পারেনি; পৈতৃক গ্রামের উন্নয়নেও দুই ভাই আজীবন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন।
অনুরূপ ঘটনা ঘটেছিল বিধানচন্দ্র রায়ের জীবনে। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রথম বার নির্বাচনে লড়ছেন বিধানবাবু; প্রচারের এক পর্যায়ে গেলেন সুরেনবাবুর প্রবল সমর্থক, পানিহাটির জমিদার শিবচন্দ্র রায়চৌধুরীর বৈঠকখানায়। বিধানচন্দ্রের পরিচয় শুনে ক্রুদ্ধ শিবচন্দ্র বলেন, “আপনি এম ডি নন, আপনি আসলে ম্যাড ডগ!” বিধানচন্দ্র বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে উত্তর দেন, “আমার পাগলামির ওষুধ তো আপনাদের হাতেই, দয়া করে ভোটটা দেবেন।” এমন রসবোধ ও সৌজন্যে জমিদারের রাগ পড়ে যায়, তিনি বিখ্যাত গুঁপো সন্দেশ দিয়ে বিধানবাবুকে আপ্যায়ন করেন। গত দেড়শো বছরে ভোটের রণকৌশল বিশেষ না বদলালেও, রাজনীতির সেই সৌজন্য আজ ফিকে। অতীতের এই ঘটনাগুলোই প্রমাণ, রাজনৈতিক মতভেদ সত্ত্বেও ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা ও রসবোধ বজায় রাখা সুস্থ গণতন্ত্রের অলঙ্কার। ছবিতে দশ বছর আগে, ২০১৬-র কলকাতায় বিধানসভা নির্বাচন।
ফিরে দেখা
প্রতিদ্বন্দ্বী ছবির সময় বা পটভূমি বুঝতে অসুবিধা হয়নি ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়ের। তখন ষাট-সত্তর দশকের সন্ধিক্ষণ, “ওই সময়টা আমার খুবই চেনা, আমি নিজে প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র,” সেখানে দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু অসীম চট্টোপাধ্যায় ও সুদর্শন রায়চৌধুরীর সঙ্গে ওঠাবসা-আড্ডা-রাজনীতি। ১৯৭০-এ মুক্তি পায় ছবিটি। তাতে প্রথম অভিনয়সূত্রে তিনি যেমন জড়িয়ে গেলেন সত্যজিতের সঙ্গে, তেমনই জড়িয়ে ছিলেন টিনু আনন্দও, সহকারী হিসেবে। ধৃতিমান-টিনু সখ্য আজও অটুট। দু’জনের আড্ডা হবে নন্দনে, প্রসাদরঞ্জন রায়ের কথামুখের পর, ১ মে বিকেল ৫টায়। পরে দেখানো হবে প্রতিদ্বন্দ্বী, ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভস-কৃত রেস্টোর্ড ভার্সন, জানালেন সন্দীপ রায়: “যে ভাবে ছবি বানাতেন বাবা তা থেকে এটি ভিন্ন, ‘ডিপারচার ফিল্ম’ বলা যায়।” উপলক্ষ সত্যজিৎ রায়ের ১০৫ বছর পূর্তির জন্মদিন (২ মে), আয়োজক সোসাইটি ফর দ্য প্রিজ়ারভেশন অব সত্যজিৎ রায় আর্কাইভস। সঙ্গে পোস্টারের ছবিটিও তাদের সৌজন্যে।
একা কুম্ভ
“অপারেশনে যাবি না গৌর?” কানের কাছে বলে কে। একদা পার্টির ‘হোলটাইমার’, বৃদ্ধ গৌরহরি কুণ্ডু একটা ভগ্নপ্রায় ভূতুড়ে বাড়ি আগলে রাখেন, একদা যা ছিল তাঁর পার্টির লোকাল অফিস, এখন প্রায় কেউ আসে না। বর্গা আন্দোলনের নেতা কমরেড ধরণীধর এ-বাড়ি দিয়ে গেছেন পার্টিকে, কিন্তু আজও তাঁর উপস্থিতি বাড়িময়। এই বাড়ি-জমির উপর নজরও কম নয় লোকের। একা কুম্ভ হয়ে লড়েন গৌরহরি, সমসময়ের সমাজ ও রাজনীতির বিরুদ্ধস্রোতে। স্বপ্ন ছেড়ে গেলেও যে মানুষেরা স্বপ্ন ছাড়তে চান না, তাঁদেরই জীবনকথা নিয়ে ‘সায়ক’ নাট্যদলের নতুন নাটক কুণ্ডুবাবু। অরিজিৎ বিশ্বাসের রচনা, মেঘনাদ ভট্টাচাৰ্যের নির্দেশনায় প্রথম অভিনয় আগামী ৩ মে অ্যাকাডেমি মঞ্চে, দুপুর ৩টে ও সন্ধে সাড়ে ৬টায়।
অনন্য নিবেদন
‘শতকণ্ঠে সহস্রকণ্ঠ’। এই ভাবনাসূত্রেই রবীন্দ্রজন্মোৎসব উদ্যাপন করবে ‘সঙ্গীত ভারতী মুক্তধারা’। অরুন্ধতী দেবের পরিকল্পনা ও পরিচালনায় প্রতি বছর পঁচিশে বৈশাখের আবহে এই নিবেদনের অপেক্ষায় থাকেন কলকাতা আর বর্হিবঙ্গের বাঙালিরা। এই আয়োজনের অনন্যতা: একই দিনে, একই সময়ে, একই মিউজ়িক ট্র্যাক-সহযোগে একই গান পরিবেশন করেন অগণিত কণ্ঠশিল্পী। এ বছর ‘চিরনূতন’ অনুষ্ঠানে কলকাতার সঙ্গে জুড়ে যাবে নয়াদিল্লি নভী মুম্বই বেঙ্গালুরু চেন্নাই হায়দরাবাদ রৌরকেলা ভোপাল ভিলাই জামশেদপুর শিলচর; আগামী ১০ মে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ১১টি শহরের ১১ প্রেক্ষাগৃহে ১১০০ শিল্পীর কণ্ঠে সম্মেলক রবীন্দ্রসঙ্গীত। কলকাতার অনুষ্ঠানটি হবে নজরুল মঞ্চে।
৫২ বছরে
প্রতিষ্ঠা ১ জানুয়ারি, ১৯৬৫। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে রবীন্দ্রচর্চায় নিরলস টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট। বছরভর নানা কর্মকাণ্ডের অন্যতম রবীন্দ্রগ্রন্থপ্রদর্শনী: প্রতি বছর কবিপক্ষে রবীন্দ্রনাথের লেখা ও রবীন্দ্র-বিষয়ক বই একত্র করে প্রদর্শনী, থাকে কেনার সুযোগও। প্রকাশকদের যোগাযোগ করে, এ বিষয়ে তাঁদের প্রকাশিত বই এনে রাখা হয় প্রদর্শনীতে, এ বছর ষাটটিরও বেশি প্রকাশনা সংস্থা যোগ দেবে। ১৯৮১ থেকে কালীঘাট পার্কে ইনস্টিটিউটের নিজস্ব রবীন্দ্রচর্চাভবনে হয়ে চলেছে এই প্রদর্শনী, এ বছর চলবে আগামী ১ থেকে ১০ মে, দুপুর ৩টে-রাত ৮টা। অতিমারিতে বন্ধ থাকা দু’টি বছর বাদ দিলে এ বছর প্রদর্শনীর ৫২তম বর্ষ। ১ মে শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টায় উদ্বোধন করবেন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব দেবাশিস মজুমদার।
নবরূপে
১ মে ৭৮ বছর পূর্ণ করছে ‘বহুরূপী’ নাট্যদল। তারই উদ্যাপন সেদিন সন্ধে সাড়ে ৬টায় অ্যাকাডেমি মঞ্চে। কুমার রায়কে স্মরণ করা হবে জন্মশতবর্ষে, তাঁর পরিচালিত এবং মনোজ মিত্র রচিত কিনু কাহারের থেটার-এর পুনর্মঞ্চায়ন হবে। ১৯৮৮-র ২ মে প্রথম অভিনয় হয়েছিল এ নাটকের, কিনুর ভূমিকায় অভিনয় করেন তারাপদ মুখোপাধ্যায়। নবরূপে সঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঞ্চালনায় মঞ্চে ফিরছে প্রান্তিক গ্রামের ‘থেটার মাস্টার’ কিনু ও তাঁর দল: তাঁদের নাটকের মধ্যেই তৈরি হয় নাটক, পৌরাণিক কাহিনিতে পড়ে তাঁদেরই জীবনছায়া, উপাখ্যানে আসে রাজা উজির ভাঁড় লাটসাহেব পুলিশ সান্ত্রী। প্রকাশ পাবে বহুরূপী পত্রিকার ১৩৮তম সংখ্যা, দেখানো হবে কুমার রায়কে নিয়ে সুমিতা বসুর তথ্যচিত্রও।
প্রান্তজীবন
চন্দ্র ভট্টাচার্য রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক; দীর্ঘদিন ধরে চিত্র ও আলোকচিত্র চর্চায় খ্যাত। মানুষ ও প্রকৃতির কখনও হাত-ধরাধরি, আবার কখনও বৈপরীত্যও তাঁর কাজের বিষয়। সম্প্রতি সেই চিত্রভাষ্যের পাশাপাশি, এক নীরব পর্যবেক্ষকের মতো ব্যস্ত জীবনের সমান্তরালে আর এক জগৎ দেখার চেষ্টা করেন তিনি, প্রান্তিক অবস্থানের মানুষকে নিরীক্ষণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন তাঁর সাম্প্রতিক কাজে। প্রধানত কাঠকয়লায় করা তাঁর ছবিগুলি: অপাঙ্ক্তেয়, দৃষ্টিপথের বাইরে পড়ে থাকা চরিত্র, বস্তু ও জীবন যাপনের খুঁটিনাটির উপর মৃদু আলো-ফেলা কাজ। নিত্যদিনের দৃশ্যপটকে মহাতারকার মতো যে আকৃতিগুলো ভরাট করে রাখে, তার ফাঁকফোকর দিয়ে দেখার মতো এই চিত্রমালা, দূর আকাশে মিটিমিটি তারার উপস্থিতিও তার বিষয়। উমা রায়ের কিউরেশনে প্রদর্শনী ‘আ স্টার অ্যামংস্ট টু মেনি’ চলছে বিড়লা অ্যাকাডেমির সরলা বিড়লা গ্যালারিতে, ২৪ এপ্রিল থেকে ২৪ মে পর্যন্ত, সোমবার ও সরকারি ছুটির দিন বাদে দুপুর ৩টে-রাত ৮টা।
শিল্প-আড্ডা
শিল্পকে ভালবেসে আড্ডা। প্রাণ খুলে কথা, মত বিনিময়। এমনই হয়ে আসছে গত তিন বছর, ‘আর্ট আড্ডা’র উদ্যোগে। আবার বর্ষ উদ্যাপনে বিশেষ অনুষ্ঠানও, এ বার যেমন হল পোড়ামাটির কর্মশালা, রামকুমার মান্নার স্টুডিয়োয়, তাঁরই তত্ত্বাবধানে। কর্মশালায় আঠারো জন শিল্পীর গড়া শিল্পকৃতি (ছবি) নিয়ে পোড়ামাটির ভাস্কর্য প্রদর্শনী চলছে লেক ভিউ রোডের আলতামিরা আর্ট গ্যালারিতে ২০-২৬ এপ্রিল, গ্যালারি কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায়। ভারতীয় ভাস্কর্যের একটি ধারার ছাপ রয়েছে এ-সব কাজে, তাদের আলোকচিত্ররূপও থাকছে সঙ্গে। রয়েছে ভাস্কর্য নিয়ে প্রাসঙ্গিক আলোচনাও, গত ২১ এপ্রিল বললেন বিমল কুণ্ডু, আজ সন্ধে ৬টায় কলকাতার ‘পাবলিক স্কাল্পচার’-এর অবক্ষয় প্রসঙ্গে বলবেন অলকানন্দা সেনগুপ্ত। রবিবাসরীয় সন্ধ্যায় হবে সমাপনী অনুষ্ঠান ও শিল্পী-সংবর্ধনা।
যাত্রারম্ভ
সাত দশক আগে অধ্যাপক তারকনাথ সেন প্রেসিডেন্সির গ্রন্থাগার সমৃদ্ধ করেছিলেন ইউরোপীয় রেনেসাঁসের চিত্রকলার বইয়ে। ছাত্রদের সেগুলি দেখানোর পাশাপাশি অধ্যাপক অরুণকুমার দাশগুপ্ত তাদের বলতেন ওই যুগের সাহিত্যকার, চিন্তাবিদদের কথা। সেই থেকে তিন প্রজন্ম ধরে বঙ্গভূমিতে— আর ভারতে একমাত্র এখানেই— ছাত্রেরা জেনেছে, চর্চা করেছে, তাদের ছাত্রদের বলেছে পেত্রার্কা, ফিচিনো, পিকো, এরাসমুস, লেয়োনার্দো, মিকেলাঞ্জেলোর কথা। ক্রমে বিষয়টার সংজ্ঞা, পরিধিও আমূল বদলেছে। রেনেসাঁস ও আদি আধুনিক (আর্লি মডার্ন) আজ কেবল এক বিশেষ ভূখণ্ডের বিশেষ যুগকে বোঝায় না, বোঝায় নানা যুগে নানা দেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক বিশেষ পর্যায়। এই পাঠপরম্পরার শরিকেরা, যাঁদের কেউ কেউ আজ বাংলার বাইরেও এই চর্চা প্রসারিত করছেন, এ বার স্থাপন করলেন ‘সোসাইটি ফর আর্লি মডার্ন স্টাডিজ়’। আজ এক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নতুন সমিতির যাত্রা শুরু হতে চলেছে।