সুপার ওভারে জয়ী কেকেআর! পাঁচ ছক্কা, পাঁচ ক্যাচে একাই নায়ক রিঙ্কু, পর পর দু’ম্যাচ জিতে আটে উঠল কলকাতা
আনন্দবাজার | ২৬ এপ্রিল ২০২৬
কী করলেন রিঙ্কু সিংহ? পাঁচ ছক্কায় করলেন ৮৩ রান। কলকাতা নাইট রাইডার্সকে একার ব্যাটে নিয়ে গেলেন ১৫৫ রানে। তার পর ফিল্ডিং করতে গিয়ে নিলেন পাঁচটি ক্যাচ। আবার সুপার ওভারেও জয়ের রান এল তাঁর ব্যাট থেকেই। আর কী করতে পারেন একজন ক্রিকেটার! কেকেআর নয়, রিঙ্কুর কাছেই ঘরের মাঠে হেরে গেল লখনউ সুপার জায়ান্টস। পর পর পাঁচ ম্যাচ হারল তারা। ঘরের মাঠে টানা চার ম্যাচে হার ঋষভ পন্থদের। ছয় ম্যাচ জয়হীন থাকার পর টানা দুই ম্যাচ জিতল কেকেআর।
এই জয়ের ফলে আট ম্য়াচে ৫ পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্ট তালিকায় আট নম্বরে উঠল কেকেআর। নবম স্থানে মুম্বই ইন্ডিয়ান্স। ১০ নম্বরে নেমে গেল লখনউ।
চলতি আইপিএলে প্রথম ম্যাচ গড়াল সুপার ওভারে। শেষ পর্যন্ত বাজিমাত করল কলকাতা নাইট রাইডার্স। রিঙ্কুর পাশাপাশি সুপার ওভারে নায়ক সুনীল নারাইন। তিন বলের মধ্যেই লখনউয়ের দুই ব্যাটার নিকোলাস পুরান ও এডেন মার্করামকে আউট করলেন তিনি। কেকেআরের সামনে লক্ষ্য ছিল ১ রান। সেটা করতে সমস্যা হয়নি রিঙ্কুর। প্রথম বলেই চার মেরে দলকে জিতিয়ে দিলেন তিনি।
প্রথমে ব্যাট করে ২০ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে ১৫৫ রান করে কেকেআর। রিঙ্কু করেন অপরাজিত ৮৩ রান। তাড়া করতে নেমে শুরুতে চাপে পড়লেও শেষ পর্যন্ত লখনউ ২০ ওভারে ৮ উইকেটে ১৫৫ রান করে। ফলে খেলা সুপার ওভারে গড়ায়। সেখানে জেতে কেকেআর।
আবার ব্যর্থ কেকেআরের টপ অর্ডার
আরও একটি ম্যাচে রান পেল না কেকেআরের টপ অর্ডার। আবার পাওয়ার প্লে-তে পর পর উইকেট পড়ল। শুরুটা হল টিম সেইফার্টকে দিয়ে। পর পর দু’ম্যাচে শূন্য রানে ফিরলেন তিনি। মহসিন খানের বল কভারে মারার চেষ্টা করেন। কিন্তু সরাসরি মুকুল চৌধরীর হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। ১৫ বলে ১০ রান করে ফিরলেন অধিনায়ক রাহানে। ‘অবস্ট্রাক্টিং দ্য ফিল্ড’-এর অপরাধে আউট হন অঙ্গকৃশ রঘুবংশী। তিনি করেন ৯ রান। পাওয়ার প্লে শেষ হওয়ার ঠিক পরের বলেই ১ রানে আউট হন রভম্যান পাওয়েল। ৩১ রানে ৪ উইকেট হারায় কেকেআর।
রঘুবংশীর বিতর্কিত রান আউট
কেকেআরের ইনিংসে রঘুবংশীর উইকেট নিয়ে নাটক হয়। পঞ্চম ওভারের শেষ বলে ঘটনাটি ঘটে। প্রিন্স যাদবের বল মিড অনের দিকে ঠেলে রান নিতে ছুটেছিলেন অঙ্গকৃশ। তিনি কিছুটা দৌড়ে আসার পর ফেরত পাঠান ক্যামেরন গ্রিন। অঙ্গকৃশ সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়িয়ে ক্রিজ়ের দিকে ছুটতে শুরু করেন। শেষ মুহূর্তে ডাইভ দেন। তার আগেই মহম্মদ শামির থ্রো তাঁর পায়ে লাগে।
এর পরেই শামি-সহ লখনউয়ের ক্রিকেটারেরা আবেদন করতে থাকেন যে, ইচ্ছা করে বলের সামনে এসে রান আউট থেকে বাঁচতে চেয়েছেন অঙ্গকৃশ। অন-ফিল্ড আম্পায়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার দেন তৃতীয় আম্পায়ারকে। তৃতীয় আম্পায়ার জানান, ক্রিজ়ে ফেরার আগে নিজের গতিপথ বদল করেন অঙ্গকৃশ। বৃত্তাকারে ঘুরে গিয়ে ক্রিজ়ে ফেরার চেষ্টা করেন। সেই সময় তাঁর চোখও ছিল বলের দিকে। ফলে তিনি যে ইচ্ছা করে বলের সামনে আসার চেষ্টা করেছেন সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সে সব বিবেচনা করেই তাঁকে আউট দেওয়া হয়।
অঙ্গকৃশ এই সিদ্ধান্তে একেবারেই খুশি হতে পারেননি। কিছু ক্ষণ মাঠের আম্পায়ারদের সঙ্গে তর্ক করেন। সাজঘরে ফেরার সময় মাটিতে সজোরে ব্যাট আছড়াতে দেখা যায় তাঁকে। ছুড়ে ফেলে দেন গ্লাভসও। ডাগআউটে বসে থাকা কোচ অভিষেক নায়ার এবং সহকারী কোচ শেন ওয়াটসনও এই সিদ্ধান্ত বিশ্বাস করতে পারেননি। পরে অভিষেককে দেখা যায় হাত-পা নেড়ে উত্তেজিত ভাবে চতুর্থ আম্পায়ারের সঙ্গে কথা বলতে। তবে লাভের লাভ কিছুই হয়নি।
মহসিনের ৫ উইকেট
কেকেআরের ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন মহসিন। রাহানে, সেইফার্ট, গ্রিন, পাওয়েল ও অনুকূল রায়কে আউট করেন তিনি। এ বারের আইপিএলে মাত্র চারটি ম্যাচ খেলেছেন লখনউয়ের বাঁহাতি পেসার। নিয়েছেন ৯ উইকেট। ওভার প্রতি ৬.৩৭ রান দিয়েছেন। বিশেষ করে লখনউয়ের কালো মাটির উইকেটে তাঁকে ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে। গুড লেংথে বল ফেলে উইকেট নিচ্ছেন। বলের গতির হেরফের করছেন। কেকেআরের বিরুদ্ধে পাঁচটি উইকেটই বলের গতির হেরফেরে। স্পেলের শেষ দুই বলে উইকেট নিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ, পরের ম্যাচের প্রথম বলে উইকেট নিলে হ্যাটট্রিক করবেন তিনি।
টি-টোয়েন্টিতে মেডেন ওভার খুব একটা দেখা যায় না। এ বারের আইপিএলে পাঁচটি মেডেন ওভার হয়েছে। তার মধ্যে তিনটিই মহসিন করেছেন। বোঝা যাচ্ছে, তাঁর বল খেলতে কতটা সমস্যা হচ্ছে ব্যাটারদের। চার ওভারে ২৩ রান দিয়ে ৫ উইকেট নেন তিনি।
গ্রিন-রিঙ্কুর জুটি
কেকেআরকে কঠিন পরিস্থিতি থেকে বার করেন রিঙ্কু ও গ্রিন। গত কয়েকটি ম্যাচে গ্রিন ফর্মে ফিরেছেন। এই ম্যাচেও তার ঝলক দেখা গিয়েছে। কঠিন সময়ে কয়েকটি ছক্কা মেরে রিঙ্কুর উপর থেকে চাপ কিছুটা কমান তিনি। শুরুতে ধীরে খেলছিলেন রিঙ্কু। ধীরে ধীরে তিনি হাত খোলেন। দু’জনের মধ্যে ২৮ বলে ৪২ রানের জুটি হয়। ২১ বলে ৩৪ রান করে ফেরেন গ্রিন।
রিঙ্কুর ঝড়
কেকেআরের বাকি ১১ জন ক্রিকেটারের কাছে এটি অ্যাওয়ে ম্যাচ হলেও রিঙ্কুর কাছে হোম ম্যাচ। লখনউয়ের এই মাঠে বহু ম্যাচ খেলেছেন তিনি। ইউপি টি-টোয়েন্টি লিগে এই মাঠে অধিনায়কত্বও করেছেন। তাই এই পিচকে হাতের তালুর মতো চেনেন রিঙ্কু। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগান তিনি।
রিঙ্কু জানতেন, শেষ পর্যন্ত তাঁকে খেলতে হবে। অপর প্রান্তে উইকেট পড়লেও রিঙ্কু ধরে খেলছিলেন। ১৬ ওভারের পর থেকে রান তোলার গতি বাড়ান তিনি। রিঙ্কু জানতেন, শেষ ওভারে কোনও স্পিনারের হাতে বল দিতে হবে পন্থকে। অপেক্ষা করেন তিনি। দিগ্বেশ রাঠীর সেই ওভারে পর পর চারটি ছক্কা মারেন তিনি। আগের ম্যাচে অপরাজিত থেকে কেকেআরকে জিতিয়েছিলেন। এই ম্যাচেও তাঁর ইনিংস কেকেআরকে ১৫৫ রানে নিয়ে যায়। ৫১ বলে অপরাজিত ৮৩ রান করেন রিঙ্কু।
শুরুতেই ধাক্কা বৈভবের
১৫৫ রান করে ম্যাচ জিততে হলে শুরুতেই উইকেট তুলতে হত কেকেআরকে। সেটা করেন বৈভব অরোরা। তাঁর প্রথম বলেই বড় শট মারার চেষ্টা করেন মিচেল মার্শ। বল অনেক উপরে ওঠে। শুরুতে ভুল দিকে দৌড়চ্ছিলেন পাওয়েল। কিন্তু বলের দিকে চোখ ছিল। শেষ মুহূর্তে পিছন দিকে ঝাঁপিয়ে ক্যাচ ধরেন। ২ রানে আউট হন মার্শ।
মার্করাম-পন্থের মন্থর জুটি
মার্শ আউট হওয়ার পর জুটি বাঁধেন অধিনায়ক পন্থ ও এডেন মার্করাম। রান তোলার গতি কম থাকলেও উইকেট বাঁচিয়ে খেলছিলেন তাঁরা। যত ক্ষণ তাঁরা ক্রিজ়ে ছিলেন স্বস্তি পাচ্ছিলেন না রাহানে। দু’জনের মধ্যে ৫৭ রানের জুটি হয়। কিন্তু তার জন্য ৫৫ বল নেন তাঁরা। জুটি ভাঙেন গ্রিন। তাঁর বলে বড় শট মারতে যান মার্করাম। বাউন্ডারিতে ছিলেন রিঙ্কু। তিনি ক্যাচ ধরে শরীরের ভারসাম্য রাখতে পারেননি। কিন্তু বাউন্ডারির বাইরে যাওয়ার আগে বল ভিতরে ছুড়ে দেন। তার পর আবার ভিতরে এসে বল ধরেন। ২৭ বলে ৩১ রান করে আউট হন মার্করাম। সুনীল নারাইনের বলে রিভার্স সুইপ মারতে গিয়ে উইকেটরক্ষকের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন পন্থ। ৩৮ বলে ৪২ রান করেন তিনি।
কেকেআরের বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিং
লখনউয়ের মাঠে বোলারেরা সুবিধা পান। সেই সুবিধা কাজে লাগান কেকেআরের বোলারেরাও। যে বৈভব প্রতি ম্যাচে ৪০ রানের বেশি দেন, সেই বৈভবই এই ম্যাচে চার ওভারে ২৪ রান দেন। নেন ২ উইকেট। নারাইন চার ওভারে ২৩ রান দিয়ে ১ উইকেট নেন। বরুণ, গ্রিন, অনুকূলেরা নিয়ন্ত্রিত বল করেন। বলের গতির হেরফের করছিলেন তাঁরা। উইকেট লক্ষ্য করে বল করছিলেন। লখনউয়ের ব্যাটারদের হাত খোলার সুযোগ দিচ্ছিলেন না। ফলে চাপে পড়ে লখনউ।
কেকেআরের ভাল ফিল্ডিং
এই ম্যাচে ভাল ফিল্ডিং করেছে কেকেআর। অল্প রান থাকায় অতিরিক্ত রান দেওয়ার বিলাসিতার জায়গা ছিল না। প্রতিটি বলের জন্য ফিল্ডারেরা ঝাঁপান। বেশ কয়েকটি ভাল চার বাঁচান রিঙ্কুরা। ক্যাচ ফেলেনি কেকেআর। পাওয়েল, রিঙ্কুরা ভাল ক্যাচ ধরেছেন। ফিল্ডিং ভাল হওয়ায় চাপ বেড়েছে লখনউয়ের ব্যাটারদের উপর।
প্রায় হারিয়ে দিয়েছিলেন ত্যাগী
শেষ দিকে লড়াই করল লখনউ। আয়ুষ বদোনি, জর্জ লিন্ডে, মহম্মদ শামিরা ব্যাট চালান। কয়েকটি বড় শটও আসে। শেষ ওভারে জয়ের জন্য দরকার ছিল ১৭ রান। বল করতে আসেন ত্যাগী। স্নায়ুর চাপ ধরে রাখতে পারেননি তিনি। পর পর দু’টি নো বল করেন। তা কাজে লাগায় লখনউ। শেষ বলে দরকার ছিল ৭ রান। ত্যাগীর বলে ছক্কা মারেন শামি। ফলে খেলা গড়ায় সুপার ওভারে। সেখানে জেতে কেকেআর।