• তৃণমূলের জয়ের পথেও কি কাঁটা কোন্দল
    আনন্দবাজার | ২৭ এপ্রিল ২০২৬
  • ভোটের দিন বিজেপি-তৃণমূল টক্কর দেখেছে রেলশহর খড়্গপুর। কার্যত জমি আঁকড়ে পড়ে থেকেছেন দুই দলের প্রার্থী। শেষবেলায় দেখা গিয়েছে দুই প্রার্থীর সৌজন্যও। দু’জনেই জয়ের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী। তৃণমূলের অন্দরের চর্চায় অবশ্য ঘুরেফিরে আসছে দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। নেতা-কর্মীদের কতজন ‘আন্তরিক’ হয়ে কাজ করেছেন— সেই প্রশ্নকে সঙ্গী করেই ওয়ার্ড ধরে ধরে ‘লিড’ খুঁজছে তৃণমূল। এই আবহে সমাজমাধ্যমে ভিডিয়ো দিয়ে ভোট নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় খড়্গপুরের বাসিন্দা যুব তৃণমূলের এক জেলা নেতা ধার করেছেন নচিকেতার গানের লাইন। বলছেন, ‘কে যে কখন কার পিছনে বুঝি না কে খাঁটি’। সঙ্গে জুড়ছেন, ‘আজকে যিনি তেরঙ্গাতে কাল ভক্ত রামের’।

    খড়্গপুর শহরে ওয়ার্ড ভিত্তিক ফল কেমন হবে তা নিয়ে জোর চর্চা চলছে তৃণমূলের অভ্যন্তরে। নজরে রাখা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের নেতা-কর্মী থেকে পুর প্রতিনিধিদের ভূমিকা। এই শহরে দীর্ঘদিন ধরেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জেরবার তৃণমূল পুরসভা নিয়ে নিজেদের মধ্যে বার বার অশান্তিতে জড়িয়েছে। বছর কয়েক আগে পুর প্রতিনিধিদের একাংশের ক্ষোভে পুরপ্রধানের পদ থেকে সরতে হয়েছিল প্রদীপ সরকারকে। সেই প্রদীপই এ বারের বিধানসভা ভোটে খড়্গপুরের প্রার্থী হন। ফলে ভোট পরবর্তী হিসেবে এই কেন্দ্রের জন্য অনেক সমীকরণই মাথায় রাখতে হচ্ছে তৃণমূলকে। উল্লেখ্য, এই প্রদীপের হাত ধরেই ২০১৯ সালের বিধানসভা উপ-নির্বাচনে প্রথমবার খড়্গপুর শহরের বিধানসভা আসন দখল করেছিল তৃণমূল। এ বার কী হবে! তৃণমূলকে ভাবাচ্ছে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বই। মঞ্চে ঐক্য দেখা গেলেও প্রদীপ ‘বিরোধী’ বলে পরিচিত তৃণমূলের নেতা-কর্মী ও পুরপ্রতিনিধিদের ভূমিকা ভোটের দিনে কি ছিল তার খোঁজ চলছে।

    শনিবার রাতেও একদফা বৈঠক হয়েছে তৃণমূলে। ছিলেন শহরের ৩৫টি ওয়ার্ডের সভাপতি ও দলের পুরপ্রতিনিধিরা। সেই বৈঠকে অধিকাংশ ওয়ার্ড ‘লিড’ দেওয়ার কথা জানালেও কয়েকটি ওয়ার্ডের নেতা-কর্মী ও পুরপ্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গিয়েছে। তৃণমূল প্রার্থী প্রদীপ সরকার বলছেন, “আমাদের বৈঠকে যেটুকু উঠে এসেছে তাতে আমরা শহরে সার্বিকভাবে লিড পাচ্ছি। রেলের দু’তিনটি ওয়ার্ড-সহ কয়েকটি ওয়ার্ডে একটু খারাপ হতে পারে। খড়্গপুরে আমরা সবাই এক হয়েই নেমেছিলাম। এক-একটি ওয়ার্ডের নেতা-পুরপ্রতিনিধিরা তো প্রচুর পরিশ্রম করেছেন।’’ তিনি জুড়েছেন, ‘‘কয়েকটি ওয়ার্ডের নেতা-পুরপ্রতিনিধিরা যদি আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতেন তাহলে ফল আরও ভাল হত।”

    তৃণমূলের একটি সূত্রে খবর, কয়েকটি ওয়ার্ডে দলের পুরপ্রতিনিধিরা সেই ওয়ার্ডের কয়েকজন কর্মীর প্রতি বিশ্বাস ধরে রাখতে পারেননি। তাঁদের ধারণা ওই কর্মীরা নিজের পার্টে ভাল ফল করানোর চেষ্টা চালালেও পুরপ্রতিনিধির উপরে ক্ষোভে বাকি পার্টে অন্তর্ঘাতের চেষ্টা করেছেন। শহরের উত্তর দিকে থাকা একটি ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধির স্বামী (যিনি নিজেও তৃণমূল নেতা) বলছেন, “আমার ওয়ার্ডে আমার মাথার উপর এক কর্মীকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই কর্মী যে কী করেছে তা আমিই জানি। নিজের পার্ট বাঁচিয়ে বাকি পাঁচটি পার্টে ‘ঘাপলা’ করার চেষ্টা করেছে। তাতে লিড নিয়ে সংশয় থাকছেই।” ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা তৃণমূলের জেলা নেতা দেবাশিস চৌধুরীর কথায়, “ভোট শান্তিপূর্ণ য়েছে। আমার ওয়ার্ডে তো বিগত কয়েকটি নির্বাচনেই আমরা পিছিয়ে ছিলাম। তাই এ বার মার্জিন সমান-সমান করার দিকে জোর দিয়েছিলাম। তবে লড়াই খুব শক্ত ছিল।” আইএনটিটিইউসি-র খড়্গপুর শহর সভাপতি আয়ুব আলি ও যুব তৃণমূল নেতা অসিত পাল বলছেন, ‘‘দলের সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করায় তৃণমূল জিতবে।’’

    শেষ পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ লড়াই কতটা হয়েছে সেই নিয়ে প্রশ্ন থাকছে তৃণমূলের মধ্যেই। এই আবহে সমাজমাধ্যমে নচিকেতা চক্রবর্তীর গানের লাইন ব্যবহার করে ভিডিয়ো বার্তায় কে ‘খাঁটি’, কে ‘তেরঙ্গা’ থেকে ‘রামভক্ত’, তা নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করছেন ১০ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা, যুব তৃণমূলের জেলা সহ-সভাপতি শান্তনু দাস। তিনি বলছেন, “ভোট ভাল হয়েছে। তবে ভোটের দিনে অনেককে নজরে রেখেছিলাম। কয়েকজনকে বিজেপির ক্যাম্পেও দেখেছি। তাঁদের জন্য নচিকেতার গানের এই লাইনগুলি প্রযোজ্য।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘তেরঙ্গা মানেই যে শুধু তৃণমূল তা নয়, কংগ্রেসও হতে পারে!”
  • Link to this news (আনন্দবাজার)