‘আগন্তুক’ খদ্দেরের প্রশ্নের জবাবে এক বার মুখ ফিরিয়ে তাকালেন। তার পরে ফের পতাকার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘‘আমার তো বিধবা ভাতা। তবে আমার বড়-মেজো মেয়ে পেয়েছে। ছোট মেয়েটাও দিয়েছিল। ওকে অবশ্য দেয়নি।’’ মেজো এবং ছোট মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। তবে, বড় মেয়ে অবিবাহিত। দোকানি বললেন, ‘‘বড় মেয়ে কলেজ পাশ করল, নার্সিং ট্রেনিং নিল। কিন্তু চাকরি পেল না! চাকরি পেলে টাকাপয়সার একটু সুরাহা হত।’’ বলতে বলতে ভরদুুপুরেও তাঁর মুখে যেন আঁধার ঘনিয়ে এল।
রাজ্যের অন্যতম পুরনো শিল্পাঞ্চল বজবজ। এক সময়ে চটকল, কলকারখানায় গমগম করত ভিড়। এখন বেশির ভাগ কারখানাই বন্ধ। নিউ সেন্ট্রাল জুটমিলে এক সময়ে কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। সেই কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এখন তা কার্যত খণ্ডহরের মতো দাঁড়িয়ে। অভিযোগ, শ্রমিকেরা ন্যায্য পাওনাটুকুও পাননি। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল ও গ্যাস কারখানা চত্বরে ‘সিন্ডিকেট রাজ’ নিয়ে গাড়িচালক ও খালাসিদের বিক্ষোভও দেখা গিয়েছে।
বজবজ বিধানসভা কেন্দ্রে অবশ্য গ্রামীণ এলাকাও আছে। সেখানে আয় বলতে চাষবাস। সেখানেও অবস্থা সুখকর নয়। বাওয়ালিতে সাইকেল সারাইয়ের দোকানে আড্ডা চলছিল গ্রামের কয়েক জনের। ঘুরেফিরে আসে চাষের কথা। পূজালি খালে স্লুইস গেট হচ্ছে। চড়িয়াল খালেরও তথৈবচ অবস্থা। মূল খাল থেকে শাখা খাল বা খানা কাটা হয়নি। আউশ ধান চাষের জল মেলে না। তার বদলে কলাই চাষ হচ্ছে। গত বছর খালের জল আটকে রাখায় অতিবৃষ্টিতে মাঠঘাট ভেসে গিয়েছিল। অভিযোগ, সে সবের ক্ষতিপূরণও মেলেনি।
ভোটের বাজারে এ সব অভাব-অভিযোগ তুলে ধরে হ্যান্ডবিল ছাপিয়েছেন বিজেপি প্রার্থী, চিকিৎসক তরুণকুমার আদক। কলকারখানা, সেতু, খাল সংস্কার— ঢালাও প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। মেরুকরণের আবহে ভোটে জিতবেন, এই আশাও করছেন। তরুণ বলছেন, ‘‘তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক এ বার হারছেন।’’ বিধায়ক অবশ্য যে-সে লোক নন। অশোক দেব ৩০ বছর ধরে বজবজ থেকে জিতছেন। বামেদের ভরা সময়েও তিন-তিন বার জিতেছেন। প্রথমে কংগ্রেস, পরে তৃণমূল। অশীতিপর বয়সে এ বারও প্রার্থী হয়েছেন। মেরুকরণের হাওয়া কি তাঁর সপ্তম বার বিধায়ক হওয়ার পথে বাধা হতে পারে? এই কেন্দ্র থেকে এসআইআর-এ ৩০ হাজারেরও বেশি নাম বাদ গিয়েছে!
বজবজ পুরসভার চেয়ারম্যান তথা তৃণমূলের ভোটযুদ্ধের অন্যতম সেনাপতি গৌতম দাশগুপ্ত বলছেন, ‘‘আগের বার ৪৪ হাজার ভোটে জিতেছিল দল। প্রচুর উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। এ বারও হই হই করে জিতব।’’ বজবজের রাজনৈতিক মহলে কান পাতলেই শোনা যায়, অশোক নিয়মিত এলাকায় আসেন ঠিকই। তবে এই তল্লাটে ভোটের প্রধান সেনাপতি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ‘স্নেহধন্য’ এক দাপুটে নেতা। এই ভোটে তিনিও অন্য কেন্দ্রে প্রার্থী। তবে তৃণমূলের কর্মীরা বলছেন, ‘‘দাদা সশরীরে বজবজে না-থাকলেও তাঁর নির্দেশ ছাড়া গাছের পাতাও নড়বে না।’’ আর মানুষজন এবং বিরোধীরা বলছেন, ‘দাদা’-র কেরামতি তো পঞ্চায়েত এবং পুরভোটেই টের পাওয়া গিয়েছে। ‘বিরোধী শূন্য’ ভোটে হই হই করে জিতেছিল তৃণমূল। মানুষ ভোট দিতে পারলে ফল কী হত, তা তো বোঝা যায়নি। এখানেই তরুণের আশা, মানুষ তাঁকে হাত উপুড় করে ভোট দিয়ে জেতাবে।
বিজেপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবশ্য ক্ষোভ আছে দলের একাংশেরই। তাঁকে প্রার্থী করায় বিক্ষোভের আঁচ পৌঁছেছিল বিজেপির রাজ্য দফতর পর্যন্ত। দলের একাংশ বলছেন, ২০২১ সালের ভোটের ফল ঘোষণার পরে কর্মীরা আক্রান্ত হয়েছিলেন। প্রার্থীকে সে সময়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিন বছর উধাও থাকার পরে ফের দেখা মিলেছে তাঁর। তরুণ অবশ্য সেই অভিযোগ মানতে নারাজ। উল্টে বলছেন, ‘‘তৃণমূলের টাকা নিয়ে এ সব বলছে। ভাল হয়েছে, দল থেকে এ সব বেনোজল বেরিয়ে গিয়েছে।’’
তরুণ ‘প্রবল’ জনসমর্থনের আশা করলেও পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায়, ২০২১ সালে বিজেপির ঝুলিতে যাওয়া ভোটের অনেকটাই বামেদের ভোট। কারণ, ২০১৬ সালে বাম-কংগ্রেসের জোট প্রার্থী হিসেবে কংগ্রেসের শেখ মুজিবর রহমান পেয়েছিলেন ৪০.৩৭ শতাংশ ভোট। ২০২১ সালে জোটপ্রার্থী হিসেবে মুজিবর পান ৪.৯৮ শতাংশ। এ বার অবশ্য চতুর্মুখী লড়াই। তৃণমূল, বিজেপির পাশাপাশি বাম এবং কংগ্রেস আলাদা প্রার্থী দিয়েছে। বামফ্রন্ট এই আসন ছেড়েছে সিপিআই(এম-এল) লিবারেশনকে। তাঁদের প্রার্থী কাজল দত্তের প্রচারে উঠে আসছে কর্মসংস্থান, শ্রমিক ও শ্রম আইন, নারী সুরক্ষা, গণতন্ত্র, স্বাধীনতার প্রসঙ্গ।
কাজল বলছেন, ‘‘রাজ্যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। বিজেপি এবং তৃণমূল, দু’জনেই গণতন্ত্রের বিরোধী। বিজেপি শ্রমিকদের স্বার্থ নষ্ট করার পক্ষে।’’ কংগ্রেস প্রার্থী মুজিবর রহমান কয়ালের প্রচারেও উঠে আসছে এলাকার অনুন্নয়ন, দুর্নীতি, বেকারত্ব, একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়ার অভিযোগ। বলছেন, ‘‘এত বড় নিউ সেন্ট্রাল জুটমিল বন্ধ হল। রাতের অন্ধকারে যন্ত্রপাতি উধাও হল। এত বারের বিধায়ক হয়েও অশোক দেব কিছু করেননি। এখন তো উনি রীতিমতো অশক্ত হয়ে পড়েছেন। শুধু তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ঠেকাতে টিকিট পেয়েছেন।’’
কর্মসংস্থান, দুর্নীতি, দাদাগিরির অভিযোগ কিন্তু বজবজ, পূজালি, বাওয়ালির মতো তল্লাটে মানুষের মুখেও শোনা যাচ্ছে। তাঁরা বলছেন, সরকারি প্রকল্প যা হয়েছে, তার সুবিধা কতটা পাওয়া গিয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বজবজেই যেমন কর্মতীর্থ তৈরি হয়েছিল। তবে বাজার এলাকার বদলে তা হয়েছে বিডিও অফিস চত্বরে। কয়েক কোটি টাকা খরচ করা সেই বাড়ির একটা দোকানও কেউ নেয়নি। কারণ, ওই এলাকায় খদ্দের মিলত না। ‘‘তা হলে এমন জায়গায় তৈরি করা হল কেন?’’—প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় কয়েক জন যুবক।
গনগনে রোদের আঁচে আমজনতার আক্ষেপ, প্রশ্ন, চাওয়া-পাওয়ার হিসাব হাওয়ার মতো ঘুরপাক খাচ্ছে। কোন রাজনৈতিক দলের পালে সেই হাওয়া লাগবে, সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন!