• পূর্ব-পশ্চিমের লড়াইয়ে পাঁজা বনাম চক্রবর্তী
    আনন্দবাজার | ২৭ এপ্রিল ২০২৬
  • চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ের পূর্ব প্রান্তে পেল্লায় বাড়িতে কাঠের ফলকে অধুনাপ্রয়াত বাসিন্দার নাম জ্বলজ্বল করছে। ‘অজিত পাঁজা’! একদা কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং পরে তৃণমূলের সাংসদ। বঙ্গ রাজনীতির অন্যতম ‘প্রবাদপ্রতিম’ নেতারনামের পাশে দরজার ক্ষতচিহ্নও চোখ এড়ায় না।

    রাজ্যে ভোট ঘোষণার প্রাক্কালে এই পাঁজাবাড়ির সামনেই তৃণমূল-বিজেপি সংঘর্ষ দেখেছিল রাজ্য। বিজেপি কর্মীদের ছোড়া ইট-পাথরের ঘায়ে দরজা, জানলার কাচ ভেঙে যায়। এ-ও অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীর সমাবেশমুখী বিজেপির মিছিলে পাঁজাবাড়ি থেকেই নাকি প্রথম ইট ছোড়া হয়েছিল। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ যা-ই হোক না কেন, শ্যামপুকুর কেন্দ্রের ভোটে বার বার ঘুরেফিরে আসছে ওই ঘটনার কথাই।

    গনগনে আঁচ ঝরানো দুপুরে সদ্য প্রচার সেরে বাড়িতে ফিরেছেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা শ্যামপুকুরের তৃণমূল প্রার্থী শশী পাঁজা। কপালে চন্দনের ফোঁটা। ঘাম মুছতে মুছতে অজিতের পুত্রবধূ চেয়ারে বসেই বললেন, ‘‘দরজায় গায়ে দাগ দেখলেন তো?’’ এলাকার তৃণমূল কর্মীরাও বলছেন, চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ের পূর্ব দিকের পাড়াগুলি জোড়াফুলের শক্ত ঘাঁটি। ওই তল্লাটের বাসিন্দারা অজিত পাঁজার বাড়িতে হামলার জবাব ইভিএমে দেবেন। এ ছাড়াও, এই কেন্দ্রের একটা অংশে নিম্নবিত্ত মানুষের বাস। সেখান থেকেও অতীতে প্রচুর ভোট তৃণমূলেরঝুলিতে এসেছে।

    শ্যামপুকুর কেন্দ্রে ১৯৯১ থেকে ২০০৬— বাম প্রার্থীরাই একচেটিয়া জিতে এসেছিলেন। ২০১১ সালে অজিত পাঁজার পুত্রবধূ শশী জেতেন। রাজ্যের মন্ত্রীও হন। তার পর থেকে তিন বারের বিধায়ক তিনি। ২০২১ সালেও ২২ হাজারেরও বেশি ভোটে জিতেছিলেন। কিন্তু হাওয়া ঘুরে যায় ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে। কলকাতা (উত্তর)-এর বিজেপি প্রার্থী তাপস রায় শ্যামপুকুর কেন্দ্র থেকে প্রায় ১৬০০ ভোটে লিড পান। উল্লেখ্য, কলকাতা পুরসভার ১, ২ ও ৪ নম্বর বরোর ১১টি ওয়ার্ড নিয়ে শ্যামপুকুর কেন্দ্র। ১১ জনই তৃণমূল পুরপ্রতিনিধি, যাঁদের মধ্যে শশী-কন্যা পূজাপাঁজাও আছেন।

    তৃণমূলের এমন গড়ে লোকসভা ভোটের ‘লিড’ বিজেপির মনে জেতার আশা জাগিয়েছে। তাদের প্রার্থী পূর্ণিমা চক্রবর্তীও মনে করেন, ‘‘লোকসভার থেকে এ বার লিড আরও বাড়বে। এ বার শ্যামপুকুর পরিবর্তন দেখবে। মানুষ পরিবর্তন চাইছে।’’ রাজনীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল লোকজন অবশ্য বলছে, পূর্ণিমা প্রার্থী ঠিকই, তবে শ্যামপুকুরে ভোট টানতে বিজেপির ‘অস্ত্র’ চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ের পশ্চিম পাড়ে থাকা জোড়াবাগানের সাবেক বাসিন্দা আর এক চক্রবর্তী— গৌরাঙ্গ থুড়ি মিঠুন। শ্যামপুকুরের বিজেপি প্রার্থীর সব প্রচার-ফ্লেক্সে বম্বের এই বাঙালি সুপারস্টারের মুখ জ্বলজ্বল করছে। প্রার্থীর সমর্থনে আহিরিটোলায় সভাও করেছেন তিনি। শ্যামপুকুরে ‘রোড-শো’ করেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও। দলের খবর, পূর্ণিমার প্রার্থী পদে সমর্থন ছিল মিঠুনেরও।

    এলাকার রাজনৈতিক সচেতন লোকজন বলছেন, চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ের পূর্ব দিকের পাড়াগুলি থেকে তৃণমূলের বেশি ভোট পাওয়ার আশা আছে। তবে পশ্চিমের ওয়ার্ডগুলি থেকে ভোট টানবে বিজেপি। অবাঙালি মহল্লায় তৃণমূলের থেকে বিজেপির প্রভাব যে বেড়েছে, তা-ও মেনে নিচ্ছেন জোড়াফুলের বহু কর্মী। শশী অবশ্য সেই তত্ত্বমানতে নারাজ। অন্তত প্রকাশ্যে। ভোট চাইতে জোড়াবাগান, কুমোরটুলি, বাগবাজারের দোরে-দোরে ঘুরছেন তিনি। বলছেন, লক্ষ্মীর ভান্ডার, কন্যাশ্রী, উন্নয়ন প্রকল্পের কথা। উল্লেখ্য, এই ভোটে এ বার বামফ্রন্টের প্রার্থী ফরওয়ার্ড ব্লকের ঝুমা দাস।ওই তল্লাটের অলিগলিতে তাঁরপ্রচার, পোস্টার চোখে পড়ছে।বহু বছর পরে এ বার ভোটে একক ভাবে লড়ছে কংগ্রেসও। শ্যামপুকুরে তাঁদের প্রার্থী পূর্ণ ঘোষওময়দানে নেমেছেন।

    দুয়ারে-দুয়ারে প্রচারের ফাঁকে শশী বললেন, ‘‘লোকসভা ভোটের হিসাব অন্য। বিধানসভা ভোটে সেই হিসাব চলে না। তা ছাড়া, এ বার এসআইআর-এ বহু মানুষ হেনস্থার শিকার হয়েছেন। তাঁরা ভোটে সেই হেনস্থার জবাব দেবেন।’’ শ্যামপুকুর কেন্দ্রে প্রথম দফায় (অনুপস্থিত, মৃত, স্থানান্তরিত, ডুপ্লিকেট) ৪২ হাজার ভোটার বাদ গিয়েছিল। তার পরেও প্রায় ৩৬০০ ভোটার বাদ গিয়েছেন। তৃণমূল কর্মীদের অনেকেই মেনে নিচ্ছেন, এই বাদ যাওয়া ভোটারের সংখ্যা ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। উপরন্তু, কলকাতা (উত্তর)-এর অন্তর্গত বিধানসভাগুলির মধ্যে শ্যামপুকুরেও সব থেকে বেশি ‘অতি স্পর্শকাতর’ বুথ আছে। তারও ‘তাৎপর্য’ আছে।

    এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, উত্তর কলকাতার এই তল্লাটে প্রোমোটিং, অবৈধ নির্মাণের অভিযোগ আছে। বস্তি এলাকার সমস্যা আছে। জোড়াবাগানের বাসিন্দা, রাধামাধব মন্দিরের ‘সেবিকা’ পূর্ণিমা সে সব অভিযোগ এবং আশ্বাস নিয়ে সদলবলে অলিগলি, বাড়ি-বাড়ি ঘুরছেন। আটপৌরে ঘরের মেয়ের মতোই মিশছেন। নিম্নবিত্ত মানুষদের অনেকের কাছেই ‘ঘরের মেয়ে’ ভাবমূর্তি গড়ে নিয়েছেন তিনি। তবে পূর্ণিমাকে নিয়েও ‘ক্ষোভ’ আছে দলের একাংশের।

    বিজেপির রাজ্য কমিটির সদস্য তথা জোড়াবাগানের নেতা নারায়ণ চট্টোপাধ্যায় প্রকাশ্যেই বলছেন, ‘‘শ্যামপুকুরে প্রার্থী মোটেও ভাল হয়নি। আরও ভাল প্রার্থী দলের হাতে ছিল। কাউকে অন্য কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে, কেউ টিকিট পায়নি।’’ তাঁর দাবি, বিজেপির অনেক কর্মীই শ্যামপুকুরের ভোটে নামেনি। নারায়ণকেও মানিকতলা ও রাসবিহারী কেন্দ্রে প্রচারের কাজে পাঠিয়েছে।

    গ্রীষ্মের দুুপুরে উত্তর কলকাতার হরি ঘোষ স্ট্রিটের দলীয় অফিসে আলাপচারিতার ফাঁকে দলের অন্দরের ক্ষোভ নিয়ে কথা উঠতেই পূর্ণিমা সটান বললেন, ‘‘আমাকে নিয়ে কোনও ক্ষোভ নেই। কয়েক জন নেতাকে অন্য কেন্দ্রে কাজে লাগানো হচ্ছে। সেটা দলের সিদ্ধান্ত।’’ উল্টো দিকে তো হেভিওয়েট প্রার্থী, রাজ্যের মন্ত্রী। পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ও আছে। লড়াই কেমন কঠিন?

    মধ্যাহ্নভোজের ডাল-রুটি মুখে তোলার ঠিক আগে প্রশ্ন শুনে একটু মুচকি হাসেন পূর্ণিমা। হাতের রুটির টুকরো প্লেটে নামিয়ে রেখে বলেন, ‘‘আমি এটুকুই বলব, প্যারাশুটে চেপে শ্যামপুকুরে নেমে আসিনি। গ্রাসরুট থেকে উঠে এসেছি।’’

    লড়াই কি তবে পাঁজা বনাম চক্রবর্তী পেরিয়ে তৃণমূল বনাম গ্রাসরুটেরও?
  • Link to this news (আনন্দবাজার)