• আবেগ, না কি পরিবারতন্ত্র! কে এগিয়ে ভোটযন্ত্রে
    আনন্দবাজার | ২৭ এপ্রিল ২০২৬
  • ‘পরিবারতন্ত্র’, না কি ‘আবেগ’!‘কার জেতা উচিত?’— প্রশ্নটা ছুড়ে দিলেন গঙ্গার পাড়ে বসে থাকা কয়েক জন বর্ষীয়ান মানুষ। কিন্তু তাঁরা তো স্থানীয়, তাই উত্তর তো তাঁরাই ভাল জানেন। কথাটা বলতেই উত্তর এল, ‘‘ভাবতে হচ্ছে।’’

    চৈতন্যদেবের স্মৃতিবিজড়িত পানিহাটি জুড়ে চলতি ভোটের হাওয়ায় এই ‘ভাবনা’ যেন বেশি মাত্রায় বইছে। যেখানে রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বড় নয়। বরং, দীর্ঘ দিন পানিহাটির ক্ষমতার অলিন্দে থাকা ‘পরিবার’, না কি আর জি করের আবেগ, কার সঙ্গে থাকা উচিত, সেই প্রশ্ন নিজেদেরই করছেন মানুষ।

    তবে এই আবেগের কেন্দ্রবিন্দু আর জি কর হলেও তা অবশ্য দু’টি ভিন্ন খাতে বইছে। কারণ, খুন ও ধর্ষণ হওয়া তরুণী-চিকিৎসকের মা পানিহাটিতে পদ্ম-প্রার্থী। প্রচারে তিনি শুধু উস্কে দিচ্ছেন তাঁর মেয়ের সঙ্গে হওয়া ঘটনার কথা। আবেদন করছেন ন্যায় বিচারের লড়াইয়ে পাশে থাকার। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সেখানে প্রাধান্য পাচ্ছে সন্তানহারা মায়ের চোখের জলের আবেগ। প্রচারে বিভিন্ন জায়গায় সেই আবেগে একাত্ম হয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে বহু মানুষকে, বিশেষত মহিলাদের। তাঁরা বলছেন, “এক জন মায়ের চোখের জল উপেক্ষা করা মুশকিল।”

    আবার, আর জি কর আন্দোলনের প্রথম সারিতে থাকা এবং আন্দোলনের জেরে জেল খাটা সিপিএম প্রার্থী কলতান দাশগুপ্তের উপস্থিতিও পানিহাটির ভোটের হাওয়ায় আলাদা আবেগ যোগ করেছে।

    যদিও বাবার পরে ‘ক্ষমতার’ মসনদে পা রাখতে ভোট-যুদ্ধে নামা, জোড়া ফুলের তীর্থঙ্কর ঘোষ মনে করেন, আলাদা কোনও আবেগ নয়। বরং উন্নয়নের আবেগেই ভাসবেন পানিহাটির মানুষ। তীর্থঙ্কর বলছেন, ‘‘কাকিমার (নির্যাতিতার মা) কষ্টে আমিও সমব্যথী। তবে কোনও ব্যক্তি আবেগ নয়, বরং মানুষ জানেন বিধায়ক কী ভাবে নির্বাচিত হন। আর কাকে কেন সেই সুযোগ দেওয়া উচিত।”

    সত্যিই কি তাই? গঙ্গার পাড়, রেললাইনের ধার, সোদপুর-বারাসত রোড, বিটি রোডের ধারে কথা বলা মানুষেরা শুধু মুচকি হাসছেন। বলছেন, ‘‘কিসের আবেগ, তা সময়ই বলবে!’’ সেই ১৯৯৬ সাল থেকে পানিহাটির বিধায়ক নির্মল ঘোষ। মাঝে ২০০৬ সালে শুধু পরাজিত হয়েছিলেন। তার পর থেকে তিনিই বিধায়ক পদে রয়েছেন। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার শীর্ষে থাকায় পানিহাটির মাটিকে কিছুটা আলাদা করেই চেনেন ওই বর্ষীয়ান নেতা। রাজনীতির ছকে কখন কী চাল দিতে হয়, সেটাও ভাল রকম জানেন। তাই, হাওয়া বুঝে তাঁর এই প্রার্থী পরিবর্তনের চাল অব্যর্থ কাজ করেছে বলেই রাজনৈতিক শিবিরের পর্যবেক্ষণ। তাতে লড়াইয়ের টিকিট থেকেছে তাঁর ঘরেই।

    আর এই পরম্পরাতেই বেঁধেছে গোলমাল। কিন্তু কেন? নির্মল ছাড়াও তাঁর ভাই দীর্ঘ দিন পানিহাটি পুরসভার প্রধান ছিলেন। বড় মেয়ে ও ছোট মেয়েও পুরপ্রতিনিধি ছিলেন। এখন ছেলে তীর্থঙ্কর চেয়ারম্যান পারিষদ। বাবার পরে আবার তিনিই প্রার্থী। তাতেই শাসকদলের অন্দরে তো বটেই, বিরোধী শিবির ও সাধারণ মানুষের বড় অংশের প্রশ্ন, ‘‘পানিহাটির রাজনীতি কেন নির্দিষ্ট একটি পরিবারের হাতে নিয়ন্ত্রিত হবে? যোগ্য কি আর কেউ নেই?’’ ভোট প্রচারে পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে সরব সিপিএম ও বিজেপি, উভয়েই। তাতে আমল না দিয়ে বরং স্থানীয় দুই মিষ্টি ব্যবসায়ীর পাঁচ প্রজন্ম ধরে ব্যবসা চালানোর উদাহরণ টেনে তীর্থঙ্কর বলছেন, ‘‘ওঁদের তৈরি মিষ্টি তো মানুষ এখনও খাচ্ছেন। কারণ, বিশ্বাস। তাই পানিহাটির মানুষও এত দিন ধরে পরীক্ষিত এবং বিশ্বস্তদের উপরেই ভরসা রাখবেন।’’

    যদিও ভরসা ও বিশ্বাসের জায়গায় বার বার ঠোক্কর খাওয়ার কথা বলছেন স্থানীয়দের একাংশ। তাঁদের মতো বিরোধীরাও অভিযোগ করছেন, দীর্ঘ সময় বিধায়ক, বিধানসভার মুখ্য সচেতক পদে নির্মল থাকার পরেও আজও সুষ্ঠু নিকাশি ব্যবস্থা গড়ে না-ওঠায় বর্ষায় ভাসে পানিহাটি। সবেমাত্র জঞ্জাল অপসারণের সমস্যা মেটানোর পদক্ষেপ শুরু হয়েছে, বার বার প্রতিশ্রুতি-শিলান্যাস হলেও স্টেডিয়াম তৈরি হয়নি, পানীয় জলের সমস্যাও তথৈবচ, পানিহাটি স্টেট জেনারেল হাসপাতালের উন্নয়ন হয়নি। বরং, অপরিকল্পিত শহরে শুধু একের পর এক বস্ত্র বিপণি ও রেস্তরাঁ গড়ে উঠেছে।

    মাস কয়েক আগে পানিহাটির ফুসফুস বলে পরিচিত অমরাবতী মাঠে প্রোমোটিংয়ের চক্রান্তের অভিযোগ উঠেছিল। তা জানতে পেরে অধিগ্রহণের নির্দেশ দেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী। সম্প্রতি প্রচারে এসে তিনি সেই অভিযোগ তুলে ধরে স্থানীয় নেতৃত্বকে সবুজ ধ্বংসের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিয়েছেন।

    যা শুনে কলতান বলছেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী নিজেও স্বীকার করলেন মাঠ বিক্রির চক্রান্ত। কিন্তু দোষীদের তো শাস্তি দিলেন না। বরং পুরস্কার দিয়েছেন।’’ মুখোমুখি অনুষ্ঠান ও কিউআর কোডের মাধ্যমে কলতান জানছেন নাগরিকদের ক্ষোভের কথা। আর জি করের ঘটনায় ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগানের মতোই কলতানের সঙ্গে একই পথে হেঁটে নির্যাতিতার মা বলছেন, ‘‘আমার লড়াই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ও মেয়েদের সুরক্ষার স্বার্থে। আর, যিনি নিজেকে পানিহাটির অভিভাবক মনে করেন, তাঁর ছড়ানো বিষ থেকে পানিহাটিকে রক্ষা করতেও লড়ছি।’’ তবে তীর্থঙ্কর ও কলতান উভয়েই প্রশ্ন তুলছেন আর জি কর কাণ্ডে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে।

    অন্য দিকে, সময়ের সঙ্গেই পানিহাটিতে শাসকদলের গোষ্ঠী কোন্দল ক্রমশ প্রকট হয়েছে। যদিও দ্বন্দ্ব সরিয়ে এখন সব গোষ্ঠীই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ময়দানে নেমেছে। কিন্তু নীচের স্তরের সংগঠনের ভিত আদৌ কতটা পোক্ত, তা নিয়ে সংশয়ও রয়েছে। রাজনৈতিক শিবিরের মতে, কিছু অযোগ্য লোককে জনপ্রতিনিধি বানানোয় বহু জায়গায় সংগঠন কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। ২০২২-এ পুরপ্রতিনিধি অনুপম দত্তকে খুনে বিজেপির দিকে আঙুল তোলা হলেও প্রচারে এক বারও শাসকদল সেই কথা তুলছে না কেন, প্রশ্ন তা নিয়েও।

    ২০২১-এর বিধানসভা ভোটে পানিহাটিতে তৃণমূল ৮৬৪৯৫টি, বিজেপি ৬১৩১৮টি এবং সংযুক্ত মোর্চা ও বাম ২১১৬৯টি ভোট পেয়েছিল। তিন বছর পরে লোকসভায় অবশ্য শাসকদল বিধানসভার নিরিখে ১৪৫৮৬টি এবং বিজেপি ১৮৪৪টি ভোট কম পায়। লোকসভা ভোটে সিপিএম-কংগ্রেস জোট প্রার্থী সুজন চক্রবর্তী বিধানসভার থেকে ১৪৬৮০টি ভোট বেশি পেয়েছিলেন।

    রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এক দিকে স্থানীয় স্তরে ‘প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা’ এবং অন্য দিকে ‘পরিবারতন্ত্র’র বিরুদ্ধে দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের খোঁচাতেই শাসকদলের ভোট কমেছিল। কিন্তু বিজেপির ভোট বিধানসভা ও লোকসভা ভোটে প্রায় ৬০ হাজারের কাছাকাছিই থেকেছে। সিপিএমের ভোট বাড়লেও, নেপথ্যে ছিল সুজনের কাছে কর্মীদের পয়েন্ট বাড়ানোর প্রচেষ্টা। সেই প্রেক্ষিতে তৃণমূল এ বার ব্যবধান বৃদ্ধির অঙ্ক কষলেও, আদৌ কি ভোট কাটাকাটিতে শাসকদলের সুবিধা হবে? না কি, আবেগের কাছে তাদের ভোট কমবে?

    কারণ, একমাত্র পানিহাটিতেই শাসকদলকে আবেগের বিরুদ্ধে নির্বাচনে লড়তে হচ্ছে!
  • Link to this news (আনন্দবাজার)