• বাণিজ্যে মতি ফিরছে কলকাতার? মাধ্যমিকের পর বিষয় ভাবনায় থাকছে পেশাদারিত্বের ছাপ
    আনন্দবাজার | ২৭ এপ্রিল ২০২৬
  • সেটা ২০০২। কলকাতার ভাল ফল করা সরকারি স্কুলগুলিতে বিজ্ঞান পড়ার হিড়িক। এরই মধ্যে এক সরকারি স্কুলের ছাত্রী পড়তে গেল বাণিজ্য। চারদিকে হইহই পড়ে গেল— বাণিজ্য বিভাগে পড়বে কেন? বিজ্ঞানে সুযোগ না পেলে, নিতান্ত কলা বিভাগেই পড়ুক।

    ২০২৩-এর আশপাশে কেন্দ্রের তরফে করা এক সমীক্ষায় ধরা পড়েছিল, ক্রমশ বাণিজ্য বিভাগে পড়াশোনা করার আগ্রহ হারাচ্ছে পড়ুয়ারা। ২০১২ থেকে ২০২২-এর মধ্যে করা ওই সমীক্ষায় উঠে এসেছিল বিজ্ঞান বা কলা বিভাগের প্রতি আকর্ষণের কথা। তবে তা ছিল গোটা দেশের পরিস্থিতি দেখে করা এক সমীক্ষা। কলকাতা অবশ্য অন্য কথাই বলবে। ২০০২ হোক বা ২০২২— কলকাতা ও আশপাশের অঞ্চলে বিভিন্ন সরকারি স্কুলে খোঁজ নিয়ে দেখা গিয়েছে, বাণিজ্য পড়ার হার একসময়ে বেশ কম ছিল। বিজ্ঞান ও কলা বিভাগে যে ভাবে থাকত পড়ুয়াদের ভর্তি হওয়ার টান, তার তুলনায় বাণিজ্য শাখা নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ায় যেন খানিকটা কম ইচ্ছা প্রকাশ করেছে বাঙালি পড়ুয়ারা।

    সেই ছবিতে কি বদল আনছে ২০২৬?

    ৮ মে মাধ্যমিক ফলপ্রকাশের পর যোধপুর পার্ক বয়েজ় স্কুলে শুরু হতে চলেছে উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রদের জন্য বাণিজ্য বিভাগ। ৬০ বছরের বেশি বয়স এ স্কুলের। কিন্তু এই বিভাগের পঠনপাঠন শুরু হচ্ছে এই প্রথম। একই ভাবে গত বছর বাণিজ্য বিভাগ শুরু করেছিল দক্ষিণ কলকাতারই আর একটি প্রাচীন স্কুল— যাদবপুর বিদ্যাপীঠ।

    কেন এত বছরের পুরনো স্কুলগুলিতে নতুন করে বাণিজ্য বিভাগ খোলার কথা ভাবা হচ্ছে? তবে কি উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে বাণিজ্য শাখায় পড়ার ইচ্ছা বাড়ছে কলকাতায়?

    যোধপুর পার্ক বয়েজ় স্কুলের প্রধানশিক্ষক অমিত সেন মজুমদারের কথায়, “মূলত অভিভাবক এবং পড়ুয়াদের চাহিদার কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত। মাধ্যমিকের পর স্কুলের অনেক ছাত্রই অন্যত্র চলে যায় কমার্স পড়তে। ইচ্ছা না থাকলেও ওরা বাধ্য হয়।” তাঁর মতে, মাঝে বেশ কয়েক বছর বাণিজ্য বিভাগে পড়ার চাহিদা কমেছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে পেশাভিত্তিক পাঠ্যক্রমের দুনিয়ায় ব্যাপ্তি বাড়ছে বাণিজ্যের।

    জানা গিয়েছে, আগামী পাঠ্যবর্ষে ৫০ জন ছাত্র নিয়ে শুরু হবে যোধপুর পার্ক বয়েজ় স্কুলের বাণিজ্য বিভাগ। অ্যাকাউন্টেসি-র পাশাপাশি বাধ্যতামূলক ভাবে কম্পিউটার পড়তে হবে।

    এক বছর আগে যাদবপুর বিদ্যাপীঠে চালু হয়েছে বাণিজ্য বিভাগ। সেখানকার পরিসংখ্যান বলে দেবে, জনপ্রিয়তা কতটা বেড়েছে। স্কুলের হিসাবে বলছে, প্রথম বছরই প্রায় ৩০০ আবেদন জমা পড়েছিল। অথচ, আসনসংখ্যা ছিল ৪০। পরে স্কুল কর্তৃপক্ষ ৮০ জনকে ভর্তি নিতে পেরেছিলেন। প্রধানশিক্ষক পার্থপ্রতিম বৈদ্য বলেন, “বাণিজ্যের পঠনপাঠন বৃত্তিমূলক বিষয়গুলির মতো হয়ে গিয়েছে। মাধ্যমিকে ৬০০-র বেশি নম্বর পেয়েও বিজ্ঞান না পড়ে এখন বাণিজ্য পড়ছে ছাত্রছাত্রীরা।”

    কিন্তু কেন এই প্রবণতার বদল?

    পার্থপ্রতিম বৈদ্যের মতে, বর্তমান প্রজন্মের পড়ুয়াদের ধৈর্য কম। দ্রুত কর্মসংস্থানের দিকে দৌড়চ্ছে যুবসমাজ। সেখানে বাণিজ্য বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হতে পারলে শুধুই যে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি, কোম্পানি সেক্রেটারি-র মতো পেশাদারিত্বের পথ খোলা পাওয়া যাবে তা নয়, অন্য অনেক পেশায় যোগ দেওয়াও সহজ হয়ে যাবে।

    এ দিকে, ১৯৯৫ থেকে মেয়েদের জন্য বাণিজ্য পঠনপাঠনের ব্যবস্থা করেছে টাকি হাউজ় গর্ভমেন্ট স্পনসর্ড গার্লস হাই স্কুল। স্কুলের ফল বরাবরই ভাল। ২০১২ থেকে ২০২২— ভর্তির পরিসংখ্যানেও যে খুব একটা হেরফের হয়েছে, তেমনটা নয়। স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা শম্পা চক্রবর্তী বলছেন, “পড়ুয়ারা বুঝতে পারছে দ্বাদশে বাণিজ্য পড়লে চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই বলে কলা বিভাগে কেউ ভর্তি হচ্ছে না, তেমনটা নয়। কিন্তু যারা ব্যাঙ্কে, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি বা ইউপিএসসি-তে সফল হতে চাইছে, তারা বাণিজ্যে আকৃষ্ট হচ্ছে।” নিজের স্কুলের পড়ুয়াদের দেখে তিনি বুঝেছেন, এখন যত ধরনের কাজের সুযোগ হচ্ছে, তাতে বাণিজ্য নিয়ে পড়ার ইচ্ছা বাড়ছে।

    তবে পুরো সময়টাই যে বাণিজ্য শাখায় পড়ুয়াদের সংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে, তেমন মোটেই নয়। মাঝে একটা সময় কমেছিলও। সেই পরিস্থিতি আবার বদলাচ্ছে বলে জানাচ্ছেন পার্ক ইনস্টিটিউশনের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক বাসবকুমার মুখোপাধ্যায়। তাঁদের স্কুলে ১৯৭৬ সাল থেকে বাণিজ্য পড়ানো হচ্ছে। ১০০ বছরের এই স্কুলে একসময়ে প্রায় ৩০০ ছাত্র পড়ত বাণিজ্য বিভাগে। কিন্তু এখন অত পড়ুয়া নেই। তবে বাসবকুমার মনে করেন, এর নেপথ্যে রয়েছে সার্বিক ভাবে পড়ুয়ার ঘাটতি। তিনি বলেন, “অ্যাকাউন্টেসি পড়তে হলে গণিতে ভাল হতে হয়। তার উপর এখন যে হারে এআই, সার্টিফিকেট কোর্স, ডিপ্লোমার মতো পেশাভিত্তিক কোর্সের দাপট বাড়ছে সেখানে পড়ুয়ারা আর আলাদা করে কমার্স নিয়ে পড়তে চাইছে না।” তবে কমার্স পড়লে সাধারণ মানের চাকরি পেতেও সুবিধা হবে বলে মনে করছেন অনেকে। তাই মাঝে একেবারেই পড়ার চাহিদা কমে গেলেও আবার ধীরে ধীরে ছন্দে ফিরছে বলেই মনে করছেন তিনি।

    সময় বদলেছে, পরিবর্তন এসেছে উচ্চ শিক্ষার পাঠ্যক্রমেও। ডিগ্রি কোর্সের পাশাপাশি কোনও না কোনও পেশাভিত্তিক কোর্স করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য জেন জ়ি-রা। বাণিজ্য বিভাগের বিষয়গুলিও তেমন বলেই মত যোধপুর পার্ক বয়েজ় স্কুলের প্রধানশিক্ষকের। কর্পোরেট দৌড়ে পাল্লা দিতে হলে উচ্চ মাধ্যমিকের পর বাণিজ্য বিভাগে পড়াশোনা করার কিছু সুবিধা রয়েছে বলেই মনে করছেন শিক্ষকদের একাংশ। সে ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্টেন্সি অনার্সের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি এআই ভিত্তিক কোনও কোর্স করলে যেমন চাকরির কর্মসংস্থানের সুযোগ ভাল মিলতে পারে, তেমনই নিজস্ব স্টার্ট-আপের ক্ষেত্রে লাভবান হওয়া যাবে। শিক্ষকদের অনেকেরই ধারণা, এ সব নিয়ে সচেতনতা যত বাড়বে, ততই বাণিজ্য নিয়ে পড়ার চাহিদা বাড়বে কলকাতাতেও।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)