• ‘দিদি কিন্তু মরেনি, লড়ছে’, চক্রব্যূহে ‘ভাই’ চাইছেন ভরসা
    আনন্দবাজার | ২৮ এপ্রিল ২০২৬
  • প্রিয়নাথ মল্লিক রোডে ফুচকার এক ঠেক আছে। সে ফুচকার কদর করেন কালীঘাটের বিখ্যাত বাসিন্দা। তেঁতুল জলে কতটা টক থাকবে, আলুতে কতটুকু ঝাল হবে, বলে দেবেন। প্রথম বার মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথের অনুষ্ঠানে বকুলবাগানের ফুচকাওয়ালাও ছিলেন দিদির অতিথি। পরিবারের লোকেরা এখন দোকান চালান, দিদি তাঁদের খবর রাখেন।

    হরিশ মুখার্জি থেকে কাঁসারিপাড়ার দিকে ঘ‌োরার মুখে গুরুদ্বারের প্রায় প্রত্যেক সর্দারজি’কে নামে চেনেন। ওই পথে হেঁটে গেলে এক বার দাঁড়াবেনই। এই ভোটের মরসুমে পদযাত্রায় তিনি বেরিয়েছেন দেখে গুরুদ্বার থেকে যোগ হয়ে যাচ্ছে এক দল শিখ প্রতিনিধি। শাসক দলের প্রার্থীর জন্য নয়। তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ারপার্সনের জন্য নয়। রাজ্যের প্রশাসনিক কর্ণধারের জন্যও নয়! শুধুই দিদির জন্য!

    মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ভবানীপুরের এমন রসায়ন ধরতে গেলে এত শব্দ খরচ করতে হবে, যে চেষ্টা বৃথা! তৃণমূলের পরামর্শদাতা সংস্থার উদ্যোগে এই তালুকের নানা প্রান্তে ‘ঘরের মেয়ে’ পোস্টার পড়েছে ঠিকই। কিন্তু সে সব একেবারেই বাহুল্য। মমতার মমতা এবং মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ওঠার দীর্ঘ লড়াই চোখের সামনে দেখেছে দক্ষিণ কলকাতার এই সব পাড়া। তবে তার পরেও তারা এ বার অন্য রকম একটা লড়াই দেখছে।

    রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কাগজে-কলমে ভবানীপুরের প্রার্থী। আসলে লড়ছেন ২৯৪টি কেন্দ্রে। তা-ও ঠিক বলা হল না! লড়াইটা আসলে আরও বড়। কেন্দ্রের সরকার, কেন্দ্রীয় নানা সংস্থা এবং তার উপরে নির্বাচন কমিশন— কার্যত একটা রাষ্ট্রশক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন তিনি। নেপথ্যের নানা শক্তির প্রতিভূ হয়ে সামনে আছে বিজেপি। এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধে তাঁর ভবানীপুরের ভূমি আলগা হতে দিতে চাইছেন না তৃণমূল নেত্রী। এ বার তাঁকে দেখা যাচ্ছে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ঘুরতে, বহুতল আবাসনে গিয়ে বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলতে, রাস্তার ধারে আটপৌরে বাঙালি থেকে ভিন্ন ভাষার আবাসিকদের সঙ্গে মিশে যেতে। প্রচার শেষ করে বাড়ি ঢোকার পথে কালীঘাট মোড়ে তাঁকে বক্তৃতা করতে দেখে পটুয়াপাড়ার বৃদ্ধ বাসিন্দা বলছিলেন, ‘‘এত বছর ধরে দেখছি। অনেক আগের কথা আলাদা, ইদানিং কালে নিজের পাড়ার মোড়ে মমতার সভা দেখেছি বলে মনে পড়ে না!’’

    পাঁচ বছর আগে নন্দীগ্রামে বাজিমাত করে আসার পরে এ বার দিদির পাড়ায় বিজেপির হয়ে লড়তে এসেছেন শুভেন্দু অধিকারী। ভবানীপুরের ৮টা ওয়ার্ডেই পুর-প্রতিনিধি তৃণমূলের। কংগ্রেসের প্রদীপ প্রসাদ, সিপিএমের শ্রীজীব বিশ্বাস, এসইউসি-র অনুমিতা সাউয়ের উপস্থিতি টের পাওয়া গেলেও অন্তত ৪টে ওয়ার্ডে বিজেপির সাংগঠনিক দৃশ্যমানতা নেই। তবে ভবানীপুরে বিজেপি যে হেতু গত কয়েক বছরে ভালই ভোট পাচ্ছে, সেই উৎসাহের সঙ্গে ‘পরিবর্তনের হাওয়া’ এবং শুভেন্দুর নামের ভরসায় ময়দানে নেমেছে বিজেপি। এবং তাদের দাবি, টানা দৌড়ঝাঁপ করে শুভেন্দু তাঁর এক কালের নেত্রীকে চাপে ফেলেছেন বলেই তৃণমূল প্রার্থী, মুখ্যমন্ত্রীকে প্রায় পাড়ায় পাড়ায় ঘুরতে হচ্ছে!

    উল্টো মতও আছে অবশ্য। নন্দীগ্রামে পাঁচ বছর আগের ধাক্কা মমতার চিরকালের লড়াকু সত্তাকে একটু বেশিই খুঁচিয়ে দিয়েছে। জনসংযোগে, আম জনতার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিতে তিনি বরাবরই এই বঙ্গে আর সকলের চেয়ে দড়। খোঁচা খেয়ে তাঁর বিশ্বস্ত অস্ত্রকে মমতা আরও চুটিয়ে ব্যবহার করতে চাইছেন। ফাঁক রাখতে চাইছেন না সতর্কতায়। মমতার কথায়, ‘‘এমন একটা কেন্দ্রের প্রতিনিধিত্ব করি, যেটা সব দিক থেকে ‘কসমোপলিটান’। হিন্দু, মুসলিম, শিখ, জৈন, খ্রিস্টান সব ধর্মের মানুষ শান্তিতে আছেন, সকলের ধর্মস্থানও আছে। আর একটা বড় কথা যে, এই অঞ্চলে নানা আকারের যে দুর্গা পুজো হয়, তারা সকলেই আমাকে ডাকে। যোগাযোগ থাকে। তবে এদের (বিজেপি) কোনও বিশ্বাস নেই। নতুন নতুন অনেক বাড়ি হচ্ছে, হোটেল বা গেস্টহাউজ হয়েছে। কোথায় কে এসে যাচ্ছে, বলা যায় না। সকলকে অনুরোধ করছি, সোমবার প্রচার শেষের পরে অচেনা কাউকে দেখলেই আমাদের জানান, সতর্ক থাকুন।’’

    দিদিকে চাপে ফেলতে এসে ‘দাদা’র চাপ কি কম? হাজার হোক, নন্দীগ্রাম আর ভবানীপুর তো এক নয়! বিদায়ী বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শহরের এই কেন্দ্রে অবশ্য দাদা নয়, নিজেকে ‘ভাই’ বলেই পরিচয় দিচ্ছেন। চেতলা হোক বা পটুয়াপাড়া, তাঁকে বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘‘এই শুভেন্দু ভাইয়ের উপরে ভরসা রাখুন। পরিবর্তন হবে।’’ বিজেপি প্রার্থী মনে করেন, ‘‘এমনি এমনি এখানে লড়তে আসিনি, দল আমাকে বিনা কারণে পাঠায়ওনি। সরকারের পরিবর্তন করতে হবে, তার জন্য মাথাটা ধরতে হবে। গত ১৫ বছর ধরে যে সিন্ডিকেট-রাজ চলেছে, কালীঘাটের ৩৮টা প্লট যে ভাবে ওই পরিবারের দখলে গিয়েছে, সব কিছুর হিসেব এ বার হবে।’’ ভবানীপুরের মানুষকে তিনি বোঝাচ্ছেন, তাঁরা মুখ্যমন্ত্রী দিয়েছেন রাজ্যকে কিন্তু বিধায়ক পাননি! জিতে এলে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে তিনি বিধায়ক কার্যালয় খুলবেন বলে জানাচ্ছেন। কোন পুর-প্রতিনিধির হাতে থাকা কোন কোন লোক ভোটের দিন গোলমাল পাকাতে পারে, পাঞ্জাবির পকেটে রাখা চিরকুট বার করে নাম পড়ে দিচ্ছেন। সঙ্গে হুঁশিয়ারি, ‘‘গর্তে থাকুন, নয়তো পালিয়ে যান! সে দিন বেরোনোর চেষ্টা করবেন না। ফল ভাল হবে না!’’

    শুনতে শুনতে প্রতিদ্বন্দ্বী সম্পর্কে ক্ষিপ্ত হচ্ছেন তৃণমূলের প্রার্থী। বলছেন, ‘‘আমাদের পুর-প্রতিনিধিদের হুমকি দিচ্ছে। নিজের ভাই তো পুর-প্রতিনিধি। পরিবারে কী কী গিয়েছে, বলছি না! জানি সব।’’ নন্দীগ্রামে এক সময়ের আন্দোলনে তাঁর ডান হাত এবং পরে চক্ষুশূল, অধুনা বিজেপি প্রার্থী সম্পর্কে মমতার আরও সংযোজন, ‘‘নাম করে বলতে চাই না! সারা ক্ষণ অভিষেককে (বন্দ্যোপাধ্যায়) গালাগালি করছে। অভিষেকের নখের যোগ্য নয় ও, বলে দিলাম!’’

    ‘দিদি’ এবং ‘ভাই’ লড়বেন, আর বাগ্‌যুদ্ধ চরমে উঠবে না, এ তো হওয়ার নয়। তার মধ্যেও ক্যামাক স্ট্রিট, শেক্সপিয়র সরণি-সহ অবাঙালি মহল্লা বাদ দিলে অন্যত্র ঘুরলে যেন মনে হচ্ছে, দিদি চক্রব্যূহে ঢুকে পড়েছেন শুভেন্দু! এক পাড়ায় বিজেপি একটা সভা করলে তিন দিক দিয়ে হইহই করে মিছিল-সভা করছে তৃণমূল। আবার বিজেপি প্রার্থীর পরিক্রমার পথে বাইক বা স্কুটি থামিয়ে কেউ কেউ তাঁর কানে কানে কী সব যেন বলছেন! শুভেন্দুর দাবি, ‘‘তলায় তলায় তৈরি হচ্ছে সব। অসভ্যতা করে লাভ নেই!’’

    সারা বাংলায় শরীর পাত করেও রণক্লান্ত না-হয়ে দুই শিবিরের দুই সেনাপতি মুখোমুখি হয়েছেন ভবানীপুরের রণক্ষেত্রে। প্রথম দফায় অন্যান্য কেন্দ্রের পাশাপাশিই শুভেন্দু সময় দিয়েছেন ভবানীপুরে, তাঁর জন্য নতুন এলাকা বলে। দ্বিতীয় পর্বে দলের কাছে অব্যাহতি নিয়েছেন, অন্য কেন্দ্র অল্প ছুঁয়ে বাকিটা ভবানীপুর। তিনি স্মরণ করাচ্ছেন, ‘‘নন্দীগ্রামে ইভিএমে শুভেন্দু অধিকারী এক নম্বরে ছিল, মমতা ব্যানার্জি দু’নম্বরে। ফলও তা-ই হয়েছিল। ভবানীপুরের ইভিএমেও শুভেন্দু একে, মমতা দুইয়ে!’’

    এই কঠিন সময়ে চেনা তালুকে মমতাও তাঁর সমর্থকদের মনে করাচ্ছেন তাঁর অমোঘ বার্তা। ‘‘দিদি কিন্তু মরে যায়নি এখনও! দিদি আছে। এখনও লড়াই করছে।’’

    আর এখানে সেখানে ঝুলছে সেই প্ল্যাকার্ড, যেখানে বলা আছে ‘ভবানীপুরে এ বার পাঁঠা বলি’! কার খাঁড়া কোথায় নামে, কে জানে!
  • Link to this news (আনন্দবাজার)