ভোটের আগে অশান্তির চেনা ছবিই দেখা গেল জগদ্দল, ভাটপাড়ায়। এমনকি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শেষ নির্বাচনী জনসভার আগেই নির্বাচন কমিশনের তালিকায় থাকা ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের এই দুই ‘অতি স্পর্শকাতর’ এলাকায় বোমাবাজি, গুলি চালনা, তৃণমূল-বিজেপি সংঘর্ষ হয়েছে। আর এই আবহের মধ্যেই সোমবার ভাটপাড়ায় জিলিপির মাঠে বিজেপির ‘বিজয় সঙ্কল্প সভা’য় এসে মোদীর প্রতিশ্রুতি, “আগে এখানে বাইরে থেকে লোক কাজ করতে আসতেন। এখন ভয়ে পালাচ্ছেন। তৃণমূল ১৫ বছরে সিন্ডিকেট করল। উন্নয়নের রিপোর্ট কার্ড নেই। চটকলগুলি বন্ধ। শুধু গুলি, বোমা শিল্পের রমরমা। ব্যারাকপুরে আইনের শাসন ফেরাবে বিজেপি। অপরাধীদের বেছে বেছে হিসাব নেওয়া হবে।”
তবে মোদীর সভা শেষের পরেও রাতে ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের হালিশহরে মোটরবাইকে করে এসে এক তৃণমূলকর্মীকে তাক করে তিন রাউন্ড গুলি করার অভিযোগ উঠেছে। জখম ওই যুবক চিকিৎসাধীন। পুরো বিষয়টি নিয়ে শাসক-বিরোধী তরজা শুরু হয়েছে। জগদ্দল, ভাটপাড়ায় ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল রবিবার, প্রধানমন্ত্রীর সভার প্রচারকে কেন্দ্র করে। বিজেপির অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী আসার আগে প্রস্তুতিসভায় ব্যানার, ফ্লেক্স লাগাতে গেলে তৃণমূল বাধা দেয়। তৃণমূলের পাল্টা অভিযোগ, দলের দু’জনের গায়ে প্রথমে হাত তোলা হয়েছে। এর কিছু ক্ষণ পরে জগদ্দলের বিজেপি প্রার্থী রাজেশ কুমার স্থানীয় থানায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ‘কুকথা’র অভিযোগ জানাতে পৌঁছন। সেখানে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে সরব হন তিনি। ইতিমধ্যে পৌঁছে যান ব্যারাকপুরের প্রাক্তন সাংসদ তথা নোয়াপাড়ার বিজেপি প্রার্থী অর্জুন সিংহ এবং তাঁর লোকজনেরাও। কিছু ক্ষণের মধ্যেই থানার সামনে তৃণমূল-বিজেপি ধুন্ধুমার বাধে। পর্যাপ্ত পুলিশ না-থাকায় দু’তরফে ইট বৃষ্টি চলে। একটা সময়, থানার গেট বন্ধ করে দিতে হয়। এরই মধ্যে অর্জুনের নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে পুলিশের মল্লযুদ্ধও দেখা যায়! অভিযোগ, এর পরে গভীর রাতে অর্জুন-পুত্র ভাটপাড়ার বিজেপি প্রার্থী তথা বিদায়ী বিধায়ক পবন সিংহের বাড়ির সামনে বোমাবাজি হয়েছে। পবনের অভিযোগ, তাঁকে খুন করতেই এই ঘটনা। অশান্তির সময়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন তাঁর দেহরক্ষী, সিআইএসএফ জওয়ান যোগেশ শর্মা। অর্জুনের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীর সভা ভেস্তে দিতেই অশান্তি করেছে তৃণমূল। অশান্তির অভিযোগে এ দিন ভাটপাড়া পুরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের পুর-প্রতিনিধি গোপাল রাউত-সহ চার জনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। অর্জুন এনআইএ তদন্ত দাবি করেছেন।
অশান্তির রেশের মধ্যেই এ দিন ভাটপাড়ায় সভা করতে এসেছিলেন মোদী। সেখান থেকে ব্যারাকপুরে আইনের শাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সঙ্গেই মোদীর বক্তব্য, “রাজ্যে সরকার বদলালে গঙ্গা-পারের শিল্পাঞ্চলের উন্নতি হবে।” কারখানায় কর্মসংস্থান থেকে মাছ চাষিদের একগুচ্ছ সুবিধার ‘গ্যারান্টি’ দিয়েছেন তিন। এই এলাকারই নৈহাটি রাজেন্দ্রপুরে দেশের অন্যতম বড় মাছের মীন কেনাবেচার বাজার রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এখানে কাঁচামালের সঙ্কটে উৎপাদন কমার কারণে একের পর এক চটকল মুখ থুবড়ে পড়েছে। মাস চারেক আগে কাঁকিনাড়া চটকল বন্ধ হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে শিল্পাঞ্চলবাসীর উদ্দেশে মোদীর আশ্বাস, “এখানে শ্রমিক সকালে গিয়ে দেখছেন কারখানায় তালা ঝুলছে। চটকল, কাগজ ও কাপড়ের কল একের পর এক বন্ধ হয়েছে।”
প্রধানমন্ত্রীর সভা শেষে পাল্টা সরব হয়েছে তৃণমূলও। জগদ্দলের বিদায়ী বিধায়ক তথা এই বারেও তৃণমূল প্রার্থী সোমনাথ শ্যাম একটি লাল ফাইল দেখিয়ে বলেছেন, “প্রধানমন্ত্রী এখানে এসে যাঁকে ভোট দেওয়ার জন্য কাতর আর্জি জানালেন, তাঁদের অনেকেই ‘ক্রিমিনাল’। এখানে যে প্রাক্তন পুলিশকর্তা প্রার্থী হয়েছেন, তাঁর কাছে আমাদের দশটি প্রশ্ন আছে। অনেক বেআইনি ও হিসাব বহির্ভূত আয়ের উৎস-সহ বেশ কিছু প্রামাণ্য তথ্য রয়েছে। উনি (রাজেশ) সৎ হলে জনতাকে উত্তর দেবেন।” বিজেপি প্রার্থী রাজেশের পাল্টা মন্তব্য, “লোহাচোরের কথার উত্তর আমি দিই না। মোদীকে দেখে উজ্জীবিত এখানকার মানুষ। ভোট-বাক্সেই জবাব মিলবে।”