এসআইআর-এর প্রক্রিয়া কিছু দিন আগেই শেষ হয়েছে। প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই একটি রাজনৈতিক ভাষ্য জোরালো ভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল— পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ বড় সমস্যা, এখানে প্রচুর রোহিঙ্গা এসে গেছে ইত্যাদি। তাই ভোটার তালিকা সংশোধন জরুরি। গণতন্ত্রের স্বার্থেই বৈধ ভোটার বাদ পড়া উচিত নয়, যেমন অবৈধ ভোটারও তালিকায় থাকা উচিত নয়। আর এই তালিকা সংশোধনের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। আমরা জানি, ভারতের নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান— অন্তত আমাদের সে কথাই বার বার মনে করিয়ে দেওয়া হয়, ঠিক যেমন অ্যান্টনি বার বার ব্রুটাসের সম্মাননীয়তার কথা বলেছিলেন।
কিন্তু সমস্যার গুরুত্ব স্বীকার করা আর সেই সমস্যার সমাধানের নামে এমন একটি প্রক্রিয়া দাঁড় করানো, যা লক্ষ লক্ষ মানুষের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়— এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি। বর্তমান তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া সেই পার্থক্যটাকেই ধোঁয়াটে করেছে। বিষয়টি ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে নাগরিকত্ব আর স্বীকৃত অবস্থা নয়, বরং ক্রমাগত প্রমাণ-সাপেক্ষ অবস্থা। ভোটাধিকারের সঙ্গে নাগরিকত্বের সরাসরি সম্পর্ক আছে; ভোটাধিকারের উৎসই নাগরিকত্ব। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, দুর্গাপুজোর জন্য প্যান্ডেল বাঁধার জন্য যেখানে চার-পাঁচ মাস সময় নেওয়া হয়, সেখানে ওই একই চার মাস সময়সীমার মধ্যে— ২৮ অক্টোবর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি— এই কাজ সম্পন্ন করা, এবং এই দুর্বল প্রশাসনিক পরিকাঠামো ও প্রস্তুতি নিয়ে তা করা কি বাস্তবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
তা হলে কী দাঁড়াল? আপনি আছেন কি না, তা আপনার দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক পরিচয় বা দীর্ঘকালীন উপস্থিতি দিয়ে নির্ধারিত হচ্ছে না; নির্ধারিত হচ্ছে আপনি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে, নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে, নির্দিষ্ট কাগজপত্র হাজির করতে পারছেন কি না, তার উপরে। কাগজ অবশ্যই দরকার। মাছে-ভাতে বড় হয়ে, ঋত্বিক ঘটক আর সত্যজিৎ রায় দেখে, রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দ পড়ে, রবিশঙ্কর-আলী আকবর খান শুনে বাড়ি ফিরলেই কি বাঙালি হওয়া যায়? আগে হয়তো যেত। কিন্তু এটা ‘নয়া ভারত’। আমরা তো এখন বিশ্বগুরু। ওয়টস্যাপে কানাঘুষো— ইউনেস্কোও নাকি সে কথাই বলেছে। তাই সমস্ত নিয়ম মেনে আমিও ফর্ম জমা দিয়েছিলাম। আমার বাবা যে আমার বাবা, আমার ঠাকুরদা যে আমার বাবার বাবা, নতুন ঠিকানায় থাকা আমি-ই যে পুরনো ঠিকানার আমি, আমার অনেক দিনের পাসপোর্ট— সব কিছু প্রমাণও জমা করেছিলাম। তবু দেখলাম, ৩০ মার্চ আমার নাম বাদ পড়ে গেল।
লক্ষ লক্ষ নামের যাচাই, অসংখ্য নথিপত্র পরীক্ষা, বাড়ি বাড়ি গিয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা— এই সমস্ত কাজ কয়েক দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব কি না, সেই প্রশ্ন প্রথম থেকেই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এর ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। বাদ পড়া মানুষকে বলা হয়েছে— আপিলের সুযোগ থাকবে, ট্রাইবুনাল বিচার করবে, এবং সেই বিচারের মধ্য দিয়েই ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার করা যাবে। কিন্তু ট্রাইবুনাল যে নির্বাচনের আগে এই বিপুল সংখ্যক আপিল শোনার সময় পাবে না, তা এখন স্পষ্ট। ট্রাইবুনাল কোথায়, কী ভাবে কাজ করবে, কেউ জানে না। সেই অজানা প্রক্রিয়ার উপরে নির্ভর করছে কয়েক জন নয়, প্রায় ৩৪ লক্ষ নাগরিকের মৌলিক অধিকার।
পুরো এসআইআর ঘিরে অনিশ্চয়তার ভার কেবল নাম বাদ যাওয়া নাগরিকের উপরে পড়ছে না; তার প্রভাব পড়েছে নির্বাচন কমিশনের কর্মীদের উপরেও। ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়ার মধ্যে অন্তত ৩০ জন নির্বাচনকর্মীর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে একাধিক আত্মহত্যার ঘটনাও রয়েছে। ফলে এখানে প্রশাসনিক অদক্ষতার পাশাপাশি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাবও স্পষ্ট।
এই অবস্থায় একটি মৌলিক দ্বিধা তৈরি হয়। যদি প্রক্রিয়াটি এতটাই তাড়াহুড়োর হয় যে ভুল অনিবার্য, এবং সেই ভুল সংশোধনের ব্যবস্থাটিও যদি হয় অস্পষ্ট ও সময়সাপেক্ষ, তবে সেই প্রক্রিয়ার উপরে নাগরিকের অধিকার নির্ভর করানো কতটা যুক্তিযুক্ত? আরও একটি কথা। এমন প্রক্রিয়ার সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতা সবার সমান নয়। কারও কাছে নথিপত্র সংগ্রহ করা, প্রশাসনিক দফতরে যাওয়া, আপিল করা সম্ভব। আবার অনেকের কাছে তা প্রায় অসম্ভব— প্রতি দিনের জীবিকা, দূরত্ব, অজ্ঞতা বা ভয়ের কারণে সেই পথ কার্যত বন্ধ। ফলে আপাতদৃষ্টিতে যে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ, তা বাস্তবে অত্যন্ত অসম হয়ে ওঠে। তার আঘাত সবচেয়ে বেশি পড়ে সমাজের দুর্বল অংশের উপরে। রাষ্ট্র যদি নাগরিককে চেনার বদলে নাগরিকের উপরেই নিজের পরিচয় প্রমাণের দায় চাপিয়ে দেয়, তা কি কোনও ভাবেই ন্যায্য হতে পারে?
এই প্রক্রিয়াটি নিজেরই লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি বা যৌক্তিক অসঙ্গতি হাজারো রকমের। অনলাইন ব্যবস্থা বার বার ভেঙে পড়ছে। ভোটার সার্ভিস পোর্টাল খুলছে না; খুললেও লগ-ইন করা যাচ্ছে না; ওটিপি আসছে না; ফর্ম জমা দিতে গেলে মাঝপথে টাইম-আউট হচ্ছে; ক্যাপচা কাজ করছে না। এক দিকে সর্বোচ্চ আদালত বলেছে, আধার বাধ্যতামূলক নয়। অন্য দিকে দেখা যাচ্ছে, আপিল দাখিল করতে গেলে আধার-সংযুক্ত ওটিপি যাচাইয়ের প্রয়োজন পড়ছে, এবং সেই যাচাইয়ের জন্য নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব পোর্টাল থেকে অন্য একটি ওয়েবসাইটে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কাগজে আধার ঐচ্ছিক, কিন্তু প্রক্রিয়ার ভিতরে তা কার্যত অপরিহার্য। এটা কি যুক্তিগত অসঙ্গতি নয়? প্রযুক্তিগত নির্ভরতাও এক ধরনের অদৃশ্য বাধা তৈরি করে, যা বহু নাগরিকের পক্ষে অতিক্রম করা অসম্ভব।
এই অবস্থায় এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। নাগরিকের উপর চাপানো হচ্ছে নির্ভুলতা, সময়ানুবর্তিতা এবং প্রমাণের দায়; কিন্তু সেই দায় পালনের জন্য যে পরিকাঠামো দরকার, সেটিই নির্ভুল নয়, দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন নয়, বরং অনিশ্চিত, অস্থির এবং বহু ক্ষেত্রে অকার্যকর। ফলে প্রশ্নটা কেবল প্রশাসনিক ত্রুটির নয়। প্রশ্নটা এই— একটি প্রক্রিয়া নিজেই যদি নির্ভরযোগ্য না হয়, তবে সেই প্রক্রিয়ার উপরে নাগরিকের অধিকার নির্ভর করানো কতটা যুক্তিসঙ্গত?
ভারতের নির্বাচন কমিশন কোনও সাধারণ প্রশাসনিক দফতর নয়; এটি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যার উপরে ন্যস্ত রয়েছে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মূল দায়িত্ব। স্বাধীনতার পর বহু চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এই প্রতিষ্ঠান নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করেছে। নব্বইয়ের দশকে টি এন শেষনের সময় নির্বাচন কমিশনের চরিত্র নতুন ভাবে তৈরি হয়েছে। তিনি নির্বাচনী দুর্নীতির রূপ চিহ্নিত করে কঠোর ভাবে মডেল কোড অব কন্ডাক্ট প্রয়োগ করেন, ভোটার পরিচয়পত্র চালু করেন, প্রার্থীদের ব্যয়ের সীমা কার্যকর করেন, এবং প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে দূরে রাখতে একাধিক পদক্ষেপ করেন। তাঁর সময়েই সাধারণ মানুষ প্রথম অনুভব করেছিল, নির্বাচন কমিশন কেবল নির্বাচন পরিচালনাকারী সংস্থা নয়; এটি এমন এক প্রতিষ্ঠান, যার সামনে রাজনৈতিক ক্ষমতাও জবাবদিহি করতে বাধ্য।
সেই সময়ে আর একটি নৈতিকতাও স্পষ্ট ছিল— ভোটাধিকারকে বিস্তৃত করা দরকার, সীমাবদ্ধ করা নয়। দেশের দুর্গম পাহাড়ে, অরণ্যের গভীরে, যেখানে হয়তো এক জন মাত্র ভোটার আছেন, সেখানেও বুথ স্থাপনের ঐতিহ্য কেবল প্রশাসনিক দক্ষতার নিদর্শন নয়; এটি একটি গভীর বিশ্বাসের প্রকাশ— প্রতিটি নাগরিকের কণ্ঠস্বর সমান ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক মনোভাবই ছিল ভারতের গণতন্ত্রের গর্ব। যে প্রতিষ্ঠান এক সময় এক জন ভোটারের জন্যও পথ তৈরি করত, সেই প্রতিষ্ঠানই এখন এমন এক প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে, যেখানে লক্ষ লক্ষ নাগরিক অন্যায় ভাবে বাদ পড়ছেন।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এসআইআর প্রক্রিয়া এমন বীভৎস রূপ নিল কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলা কেবল একটি প্রদেশ নয়; এটি এমন এক ঐতিহাসিক পরিসর, যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক চেতনা মিলেমিশে এক ধরনের স্বাতন্ত্র্য তৈরি করেছে। সেই ইতিহাসের ভিতরে নাগরিকত্বের ধারণা ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক। সেই পরিসরে আজ যদি এমন একটি প্রক্রিয়া তৈরি হয়, যেখানে বার বার নাগরিককে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, এবং বিশেষত এমন এক ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষকে, সেখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে— এ কি কেবল প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, না কি এক ধরনের পরিচয়কে ক্রমশ সঙ্কুচিত করে দেখার প্রবণতা? এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূলে আঘাত করার জন্যই কি এই প্রশাসনিক আক্রমণ? প্রশ্নটিকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। কারণ গণতন্ত্রের শক্তি কেবল তার প্রক্রিয়ায় নয়, তার স্মৃতিতেও নিহিত।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা মনে পড়ে— “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।” যাঁরা তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন, আশা রাখি তাঁরা মনে রাখবেন সেই নাগরিকদের কথা, যাঁরা ভোটাধিকার হারিয়েছেন। এই ভোটের সিদ্ধান্ত কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে হতে হবে এমন নয়। এ বারের নির্বাচনে ভোট গণতন্ত্রের পক্ষে না বিপক্ষে— শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি সেখানেই।
নন্দিতা রায়
ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট, কলকাতা