• শ্রমিক যখন শিরোনামে
    আনন্দবাজার | ২৮ এপ্রিল ২০২৬
  • সমস্ত শ্রমিক আন্দোলনে, ধর্মঘটে শেষতম দাবির ঠিক আগের দাবি থাকে ‘ঠিকা, অস্থায়ী শ্রমিক-কর্মচারীদের স্থায়ীকরণ।’ সাধারণত তালিকার ২৯ নম্বর বা ৪৯ নম্বরে। আর শেষ দাবি থাকে ‘দুনিয়ায় মজদুর এক হও।’ দাবিসনদে অবস্থান দেখেই বোঝা যায় কোন দাবিকে কতখানি গুরুত্ব দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি। আন্দোলন সফল করতে ঠিকা-কর্মীদের না নিলে নয়, তাই রাখা। বিহার, গুজরাত, উত্তরপ্রদেশে হাজার হাজার ঠিকা শ্রমিকের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন এই পরিচিত খেলার দান উল্টে দিল। দেখা গেল, শ্রমিক আন্দোলন সংগঠনের দায়িত্ব, নেতৃত্বের দখল এখন ঠিকা শ্রমিক, চুক্তি শ্রমিকরাই নিয়েছেন। নয়ডা, গাজ়িয়াবাদ, পানিপথ, মানেসরের ঠিকা শ্রমিকদের মূল দাবি ছিল মাসে অন্তত ২০ হাজার টাকা মজুরি, আট ঘণ্টা ডিউটি, ওভারটাইমে ডাবল মজুরি। উঠে এসেছে কাজের পরিবেশের প্রশ্নটাও।

    পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের শিল্পাঞ্চলগুলি কিছু মৌলিক পার্থক্য আছে। নয়ডা, মানেসর বা গাজ়িয়াবাদের শিল্পাঞ্চলগুলি তুলনায় নতুন। শুরু থেকেই ঠিকা, চুক্তি শ্রমিকের প্রাধান্য। অধিকাংশই পরিযায়ী শ্রমিক। পশ্চিমবঙ্গের শিল্পাঞ্চলে স্থায়ী শ্রমিকের প্রাধান্য ছিল বহু দিন। ক্রমে শিল্পের রুগ্‌ণতা, আধুনিকীকরণ এড়ানো এবং নতুন বিনিয়োগের অভাব এই রাজ্যের শিল্প-সঙ্কট তৈরি করে। উৎপাদন খরচ কমানোর জন্য স্থায়ী শ্রমিক কমে ক্রমশই ঠিকা ক্যাজুয়াল বাড়াতে থাকেন নিয়োগকারীরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিশ্বায়ন-পরবর্তী অর্থনীতি ও রাজনীতির চাপ, শিল্পে ইউনিয়ন-বিরোধিতা এবং সর্বোপরি মালিকপক্ষের কাছে ইউনিয়ন নেতাদের আত্মসমর্পণ। যার ফলে স্থায়ী কাজ চলে যায় ঠিকাদারদের হাতে। হলদিয়া, আসানসোল, রানিগঞ্জ, দুর্গাপুর, মেটিয়াবুরুজ, হাওড়া, উলুবেড়িয়া, খড়গপুর, ডানকুনি, ধুলাগড়, ব্যারাকপুর— সর্বত্র ছবি কমবেশি এক।

    এ সব জায়গার পরিস্থিতি কি মানেসর, নয়ডা, গাজ়িয়াবাদ, পানিপথ থেকে অন্য রকম? একেবারেই না। ন্যূনতম মজুরি, আট ঘণ্টা কাজের সীমা, ওভারটাইম, কিছুই মানা হয় না। উপরন্তু এ রাজ্যের প্রায় সমস্ত শিল্পাঞ্চলে নেতা-ঠিকাদারদের এক ভয়ঙ্কর আঁতাঁত তৈরি হয়েছে। বহু ক্ষেত্রেই ইউনিয়নের নেতারাই বেনামে শ্রমিক ঠিকাদার। তাঁরাই আবার অনেক ক্ষেত্রে শাসক দলের নেতা, অথবা নেতার ডান হাত। তাঁদের কথাই আইন। এটা বাম আমল থেকেই শুরু হয়েছে। হয়তো কিছুটা নতুন স্থানীয় থানার সক্রিয় অংশীদারি। এখন মালিক-শ্রমিক বিরোধের মীমাংসা হয় থানায়। মীমাংসার জন্য নির্দিষ্ট সরকারি দফতর বা প্রতিষ্ঠানগুলি হয় কর্মী-শূন্য, নাহয় তুলেই দেওয়া হয়েছে।

    শ্রমিকদের আন্দোলন এ বার শুরু হয়েছে পানিপথের সরকারি তৈল শোধনাগারে দুর্ঘটনায় শ্রমিক মৃত্যুর প্রতিবাদে। পশ্চিমবঙ্গে এত দিন ‘কর্মস্থলে নিরাপত্তা’ বলতে মহিলাদের নিরাপত্তাই বোঝাত। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু এই ধারণায় ধাক্কা দিল। সর্বত্র, সব ধরনের পেশায় সব স্তরের কর্মীর নিরাপত্তার গুরুত্ব নিয়ে এখন চর্চা চলছে। কর্মরত শ্রমিকের দুর্ঘটনায় মৃত্যু এখন প্রাত্যহিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চটকলের কর্মী, বহুতলের নির্মাণ-শ্রমিক, রঙের মিস্ত্রি, বিদ্যুৎ কর্মী, সাফাইকর্মী— কারও মৃত্যুতে নিয়োগকারীর শাস্তি হয়েছে, এমন কদাচিৎ শোনা যায়। কিছু ক্ষতিপূরণ পাওয়াও যেন ভাগ্যের ব্যাপার। অথচ, দুর্ঘটনা ঘটলে কারা তদন্ত করবে, কে কত ক্ষতিপূরণ পাবে, সবই নির্দিষ্ট করা রয়েছে আইনে। আগে তার জন্য শ্রম দফতরের বিশেষ বিভাগও ছিল। এখন দুর্ঘটনায় মৃত্যু না-ঘটে থাকলে এফআইআর দায়ের করা দুঃসাধ্য। থানায় গেলে পুলিশ খবর দেয় শাসক দলের স্থানীয় নেতাকে। তার পর? নেতা-মালিক-পুলিশ বুঝিয়ে দেয়, নিখরচায় চিকিৎসার বন্দোবস্ত হলেই যথেষ্ট।

    সম্প্রতি হাওড়ার এক এঞ্জিনিয়ারিং কারখানায় কর্মরত এক শ্রমিকের বুড়ো আঙুল কেটে পড়ে যায়। খবর পেয়ে এলাকার মানবাধিকার কর্মীরা তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করে এফআইআর করতে থানায় যান। মুহূর্তের মধ্যে স্থানীয় নেতা দলবল নিয়ে থানায় এসে হাজির হন এবং পুরো প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নেন। বেহালার এক কারখানায় একই ধরনের পাত্রে খাবার জল এবং কারখানার প্রয়োজনীয় অ্যাসিড রাখা হত। এক শ্রমিক ভুল করে জলের বদলে অ্যাসিড খেয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রাণে বেঁচে গেলেও কর্মক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। মানবাধিকার কর্মীরা ক্ষতিপূরণের জন্য তাঁকে নিয়ে থানায় যান। ওই থানার ওসি তৎক্ষণাৎ মালিককে ডেকে পাঠিয়ে সবার সামনে প্রবল চাপ দেন। ক’দিন পরেই জানা যায়, মালিক ও পুলিশে রফা হয়ে গেছে।

    রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে চলচ্চিত্র শিল্পে নিরাপত্তার নির্দেশাবলি (এসওপি) তৈরি হচ্ছে। তারকারা প্রভাবশালী, হয়তো ক্ষতিপূরণ আদায়ও হবে কিছুটা। অন্তত শিল্পীদের জন্য। কলাকুশলীরা কতটা কী পাবেন, সন্দেহ আছে। ছত্তীসগঢ়ের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বয়লার বিস্ফোরণ দেখিয়ে দিচ্ছে, নিয়মবিধি শুধু শ্রম কোডে লেখা থাকলেই চলবে না। এ রাজ্যেও বড় বড় কোম্পানির কারখানায় বেশ কয়েক বার বয়লার বিস্ফোরণে মৃত্যু ঘটেছে। অবস্থার পরিবর্তন ঘটেনি। মালিকপক্ষ বিষয়টি ধামাচাপা দিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই ইউনিয়ন নেতাদের সহযোগিতায়। সরকার কোথাও কোনও সমস্যা দেখতে পাচ্ছে না।

    উত্তর ও পশ্চিম ভারতে শ্রমিকদের আন্দোলন বহু দিন পরে শ্রমিকদের দাবিকে শিরোনামে নিয়ে এসেছে। প্রথাগত ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণের বাইরেই ঘটেছে এই বিস্ফোরণ। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া শ্রমিকদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। রাজনৈতিক দল বা ট্রেড ইউনিয়নগুলি শ্রমিকদের বাস্তব অবস্থাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করছে, তা বোঝা গেল আরও এক বার। তাই এই শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানোর দায় এসে পড়ে নাগরিক সমাজের উপরে।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)