৫১ লক্ষ ভোটার কমল, ভোটদান বৃদ্ধি ৩০ লক্ষ! ‘চমকপ্রদ’ কাণ্ডেই রেকর্ড গড়ল পশ্চিমবঙ্গ, নিশ্চিত ভাবে প্রভাব পড়বে ভোটের ফলে
আনন্দবাজার | ২৯ এপ্রিল ২০২৬
প্রথম দফার ভোটের ধারা বজায় থাকল দ্বিতীয় দফাতেও। রাজ্যে মোট ভোটারের সংখ্যা আগের চেয়ে কমলেও অনেকটা বেড়ে গেল ভোটদাতার সংখ্যা। দুই দফাতেই প্রচুর মানুষ বুথে গিয়ে ভোট দিলেন। এমনকি, যাঁরা সাধারণত বুথমুখী হন না, তাঁদেরও এ বার ভোট দিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে দেখা গেল। রাজ্যে ভোটের হার ৯২ শতাংশের গণ্ডি ছাড়িয়েছে ইতিমধ্যেই। পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, সারা দেশে সমস্ত বিধানসভা নির্বাচনে এ যাবৎ ভোটদানের হারে এটাই সর্বোচ্চ। সর্বভারতীয় রেকর্ড।
নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে এ বার ৫১ লক্ষ ভোটার কম ছিল। তবে ভোট পড়েছে আগের বারের তুলনায় ৩০ লক্ষেরও বেশি। দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে চূড়ান্ত ভোটের হার এখনও পাওয়া যায়নি। রাত ১২টা পর্যন্ত কমিশন ৯২.৬৩ শতাংশ ভোট পড়ার কথা জানিয়েছে। দুই দফা মিলিয়ে ভোটের হার ৯২.৯৩ শতাংশ। মোট ভোটার কমে গেলে এবং প্রায় একই সংখ্যক মানুষ ভোট দিলে সাধারণ হিসাবেই ভোটের হার বেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের ভোট সেখানেই থামল না। ভোটের হার এই রাজ্যে নজির গড়ে ফেলল। এসআইআর-এর পর আরও রাজ্যে ভোট হয়েছে। ভোটারের সংখ্যা সেখানেও কমেছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের মতো ঘটনা অন্য কোথাও ঘটেনি।
পরিসংখ্যান থেকেই একটি বিষয় স্পষ্ট— নানা কারণে যাঁরা ভোট দিতেন না বা নানা কারণে যাঁরা ভোট দিতে পারতেন না, তাঁরা অনেকেই এ বার ভোট দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ভোটের ফলাফলে পশ্চিমবঙ্গের এই হিসাব বড় প্রভাব ফেলতে চলেছে। এত দিন ধরে ভোট দেননি যাঁরা, তাঁদের ভোট এ বার সব হিসাব উল্টে দিতে পারে। এই বাড়তি ভোটই হয়ে উঠতে পারে নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণকারী!
কৌতূহলের বিষয় হল, গত বারের তুলনায় যে ৩০ লক্ষাধিক মানুষ এ বার বেশি ভোট দিলেন, তার মধ্যে ২১ লক্ষই রয়েছেন প্রথম দফায়। দুই দফার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, গত বারের তুলনায় এ বছর প্রতি বিধানসভা কেন্দ্রে গড়ে প্রায় ১০ হাজার জন করে বেশি ভোট দিয়েছেন। তবে বিধানসভা ভিত্তিক হিসাবে ফারাক রয়েছে। প্রথম দফার আসনগুলিতে গড়ে ভোটদাতার সংখ্যা বেড়েছে ১৪,২৩৭ জন করে। দ্বিতীয় দফায় বিধানসভা ভিত্তিক সেই বৃদ্ধির পরিমাণ মাত্র ৬,৬১৫।
এখন প্রশ্ন, কী হতে পারে? ইতিমধ্যে একাধিক বুথফেরত সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশ্যে চলে এসেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এগিয়ে রাখা হয়েছে বিজেপি-কে। কোথাও কোথাও দাবি, তৃণমূলই ক্ষমতা ধরে রাখছে পশ্চিমবাংলায়। তবে প্রায় সর্বত্র হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত বুথফেরত সমীক্ষায় স্পষ্ট। ভারতের নির্বাচনী ইতিহাস অনুযায়ী, এই ধরনের সমীক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই মেলে না। তবে মিলে যাওয়ার কিছু নিদর্শনও রয়েছে।
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, প্রচুর পরিমাণে ভোট পড়লে তা সাধারণত স্থিতাবস্থা বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন সরকারের বিপক্ষে যায় জনতার রায়। তবে দীর্ঘলালিত এই ধারণার প্রতিযুক্তিও রয়েছে। তৃণমূলের অনেকে এই প্রসঙ্গে গত লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচনের দৃষ্টান্ত টানছেন। পশ্চিমবঙ্গে সে বারও অনেক ভোট পড়েছিল এবং ভোটের ফল রাজ্যে শাসকের পক্ষে গিয়েছিল। পাশাপাশিই প্রতিবেশী রাজ্য বিহারের দৃষ্টান্ত দিয়ে তাঁরা দাবি করছেন, এসআইআর-এর পর ভোটের হার বৃদ্ধি স্বাভাবিক। তবে বিহারেও ভোটের হার বেড়ে যাওয়ার পর ক্ষমতাসীন সরকারের ‘প্রত্যাবর্তন’ হয়েছে। বিরোধীদের তরফে অবশ্য ২০১১ সালের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে এত দিন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভোটদানের নজির ছিল ওই বছরেই। ভোট পড়েছিল ৮৪.৩৩ শতাংশ এবং সেই ভোটে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান হয়েছিল। পরিবর্তনের হাওয়ায় রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল। এ বারের পশ্চিমবঙ্গে এই বিপুল সংখ্যক বাড়তি ভোট কোন পক্ষে যায়, সেটাই দেখার।