তেমন কোনও হানাহানির ঘটনা ঘটেনি। বুথ জ্যাম, ছাপ্পা ভোটের অভিযোগও সামনে আসেনি। বুধবার কার্যত হিংসামুক্ত ভোট দেখল দুই জেলা। গণতন্ত্রের উৎসবে শামিল হলেন বহু মানুষ। তবে, বেশ কিছু এলাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর অতি সক্রিয়তার অভিযোগ উঠল।
ভোটে এমন শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় কমিশনের ভূমিকার কথা বলছেন অনেকে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে রাজ্য পুলিশকেও সক্রিয় দেখা গিয়েছে বহু এলাকায়। অনেক জায়গাতেই রাস্তাঘাট ছিল শুনসান। দোকান-বাজার বন্ধ ছিল। তবে, বুথগুলিতে ছিল ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। অনেক বুথে ভোটগ্রহণে দেরি হলেও ভোটাররা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছেন।
প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানেরা ভোটারদের লাইন নিয়ন্ত্রণ করেছেন। জমায়েতের চেষ্টা হলে সরিয়েছেন। বুথের মধ্যে কার্যত মাছি গলতে দেয়নি তারা। কারও কাছে মোবাইল ফোন দেখলে যেমন পত্রপাঠ তা রেখে আসতে বলেছে, আবার রাস্তাতে টহলও দিয়েছেন। সব মিলিয়ে বুথ এবং তার ১০০ মিটারের মধ্যের এলাকা আগলে রাখতেই দেখা গিয়েছে। গ্রামীণ হাওড়ার বাগনান, আমতা, শ্যামপুর, উদয়নারায়ণপুর সর্বত্রই দেখা গিয়েছে এই ছবি। তবে, উলুবেড়িয়া দক্ষিণ বিধানসভার গৌরীপুরে মহিলাদের অভিযোগ, বাহিনী তাঁদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভয় দেখিয়ে রাস্তায় বেরোতে বারণ করে। তাঁদের মারধরও করা হয়েছে। একই অভিযোগ উঠেছে শ্যামপুরেও। এখানে বাছরি, খাড়ুবেড়িয়া প্রভৃতি জায়গায় বাহিনী গ্রামে ঢুকে বাসিন্দাদের ভয় দেখিয়েছে বলে অভিযোগ। গৌরীপুরে এবং উদয়নারায়ণপুরের কানসোনাতে তৃণমূলের দু’টি ক্যাম্প অফিস কেন্দ্রীয় বাহিনী ভেঙে দেয়।
উলুবেড়িয়া দক্ষিণের তৃণমূল প্রার্থী পুলক রায়ের অভিযোগ, ‘‘কেন্দ্রীয় বাহিনী বিজেপির এজেন্ট হয়ে কাজ করেছে।’’ গ্রামীণ জেলা তৃণমূলের তরফে জওহর রাহি রানা বলেন, "কেন্দ্রীয় বাহিনী যেভাবে গ্রামবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে, তার প্রতিবাদ করে রাজ্য নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছি।’’ উলুবেড়িয়া দক্ষিণ কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী স্বামী মঙ্গলানন্দ পুরী মহারাজের দাবি, ‘‘বাহিনী কোনও পক্ষপাতিত্ব করেনি। কোথাও কোনও অশান্তি হয়নি। শান্তিপূর্ণ ভাবেই ভোট হয়েছে।" বাহিনীর তরফে কেউ কোনও মন্তব্য করতে চাননি। ডোমজুড়ের দু’টি বুথে বাহিনীর বিরুদ্ধে ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ ওঠে। তৃণমূল কমিশনের দ্বারস্থ হয়। জগৎবল্লভপুরে ভোটদাতারে ভয় দেখানোর অভিযোগ ওঠে।
সকাল ১০টা নাগাদ সিঙ্গুরের গোপালনগর উচ্চ বিদ্যালয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিকে দেখে স্বেচ্ছায় এগিয়ে এলেন এক আধাসেনা। হাসিমুখে জানালেন, ভাল ভোট হচ্ছে। এক জওয়ান বললেন, ‘‘এই আবহাওয়ায় মানুষ ভোট দিয়ে শান্তি পাবেন।’’ লাঠি হাতে ওই স্কুলে ভোট দিতে এসেছিলেন ৯৫ পেরোনো আঙুরবালা মান্না। ভোট দিয়ে বেরোতেই হাত ধরে তাঁকে গেটের দিকে এগিয়ে দিলেন এক জওয়ান। পান্ডুয়া ও সপ্তগ্রামের যেখানেই রাজনৈতিক দলের কর্মী সমর্থকেরা ভিড় জমিয়েছেন, সেখানেই তা সরিয়েছে বাহিনী।
তবে, এই জেলাতেও বাহিনীর বাড়াবাড়ির অভিযোগ সামনে এসেছে। তারকেশ্বরে ভোটের লাইনে লাঠিচার্জের অভিযোগ ওঠে বাহিনীর বিরুদ্ধে। সেখানে কর্কট রোগে আক্রন্ত এক ভোটারও ছিলেন বলে তৃণমূলের দাবি। চুঁচুড়া বিধানসভার বেগুনতলায় পাশাপাশি থাকা তৃণমূল, সিপিএম এবং বিজেপির ক্যাম্প অফিস তুলে দেয় বাহিনী। এই বিধানসভার ৩৩২ বুথ থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে মনসাতলায় তৃণমূলের একটি ক্যাম্প অফিস ভেঙেও দেওয়া হয়। বাহিনী কয়েক জনকে লাঠিচার্জ করে বলেও অভিযোগ। ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন তৃণমূল প্রার্থী দেবাংশু ভট্টাচার্য। তাঁর অভিযোগ, সকাল থেকেই বকলমে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে তৃণমূলকে হারানোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে কমিশন। সিঙ্গুরের তৃণমূল প্রার্থী বেচারাম মান্নার অভিযোগ, সিঙ্গুর এবং হরিপালে বাহিনী খানিক বাড়াবাড়ি করেছে। হরিপালে বয়স্কদের অগ্রাধিকারদেওয়া হয়নি।
তথ্য সহায়তা: প্রকাশ পাল, দীপঙ্কর দে, সুশান্ত সরকার, অরিন্দম বসু ও সুদীপ দাস।