চব্বিশের লোকসভা ভোটে জেলার তিন পুরসভাতেই কার্যত বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল শাসক দল। তার মধ্যে অন্যতম ছিল পুরলিয়া পুরসভা। সেখানে ২২ হাজারের মতো ভোটে পিছিয়ে পড়েছিল তৃণমূল। ঝালদাতেও প্রায় হাজার ছয়েক ভোটে পিছিয়ে ছিল তারা। মূলত এই দুই পুরসভায় ভরাডুবিতেই পুরুলিয়া লোকসভা আসন দখলের স্বপ্ন পূরণ হয়নি শাসক দলের। এই প্রেক্ষিতে চলতি বিধানসভা ভোটে পুরশহরগুলিতে কী ফল হতে পারে, চর্চা শুরু হয়েছে জেলার রাজনৈতিক অলিন্দে। বিশ্লেষকদের একাংশের মত, পুরসভাগুলিতে ফল না শুধরোলে পুরুলিয়া, বাঘমুণ্ডি ও রঘুনাথপুর আসনে ধরাশায়ী হতে পারে শাসক দল। বিশেষ নজরে রয়েছে পুরুলিয়া পুরসভাই। সূত্রের খবর, ওই পুরসভার ২৩টি ওয়ার্ডের ১০৬টি বুথে মোট ভোটার রয়েছেন প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার। ভোট পড়েছে ৮৮ শতাংশের কিছু বেশি।
ভোটের কয়েক মাস আগে পুরুলিয়ার পুর-বোর্ড ভেঙে প্রশাসক নিয়োগ করে রাজ্য পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর। ওই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হন তৃণমূলের পুর-প্রতিনিধিদের বড় অংশ। তার পরে থেকে দলের কাজকর্মে সে ভাবে দেখা যাচ্ছিল না তাঁদের। শেষমেশ মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে প্রাক্তন ওই পুর-প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন তৃণমূল প্রার্থী সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায়। তার পরে নির্বাচনের কাজে নামতে দেখা গিয়েছিল তাঁদের।
কিন্তু নিজেদের সাংগঠনিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ভোট কতটা করিয়েছেন তাঁরা, সেই প্রশ্ন ঘুরছে দলের অন্দরে। পুরসভায় বিজেপির প্রাক্তন দলনেতা প্রদীপ মুখোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘এমনিতেই লড়াইটা ছিল তৃণমূলের বহিরাগত প্রার্থীর সঙ্গে বিজেপির শহরের নিজের ছেলের। সেখানে শহরবাসীর প্রথম পছন্দ বিজেপির প্রার্থী। তা ছাড়া শহরবাসী দেখেছেন, অপশাসন, দুর্নীতির কারণে তৃণমূলেরই পুরবোর্ড ভেঙে দিয়েছে তৃণমূলের রাজ্য সরকার। এমন নানা কারণে শহুরে ভোটারেরা ঢেলে ভোট দিয়েছেন বিজেপিকে।” পাল্টা তৃণমূলের প্রাক্তন শহর সভাপতি বিভাসরঞ্জন দাসের দাবি, সকলে একজোট হয়ে মাঠে নেমেছিলেন। পুরুলিয়া শহরে ফল অত্যন্ত ভাল হবে।
ঝালদা শহরে ফলের উপরে বাঘমুণ্ডির বিদায়ী বিধায়ক সুশান্ত মাহাতোর ভোট-ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভরশীল, মানছেন তৃণমূলের নেতাদের বড় অংশই। ঝালদার ১২টি ওয়ার্ডের ১৯টি বুথে মোট ভোটার প্রায় ১৬ হাজার। ভোট পড়েছে ১৪ হাজারের কিছু বেশি। তৃণমূলের শহর সভাপতি সোমনাথ কর্মকারের দাবি, প্রতি বুথেই প্রায় নব্বই শতাংশ ভোট পড়েছে। কিন্তু এই পুরশহরে লোকসভা নির্বাচনের ভোটের ঘাটতি শাসক দল পূরণ করতে পারবে কি না, সন্দিহান দলেরই একাংশ।
কারণ, এখানেও পুরবোর্ড ভেঙে দিয়েছিল রাজ্য পুর দফতর। পরে আদালত রাজ্যের নির্দেশ খারিজ করে দেয়। তা ছাড়া, এখানকার পুর-প্রতিনিধিদের একাংশের সঙ্গে প্রার্থী সুশান্তের সম্পর্ক ‘অম্লমধুর’ বলেই রটনা। তাই দলের ‘লিড’ আরও বাড়বে বলে দাবি করছেন বিজেপি নেতৃত্ব। তবে তৃণমূলের শহর সভাপতি সোমনাথের দাবি, ঝালদায় ফল খুবই ভাল হবে।
আর এক পুরশহর, রঘুনাথপুরে গত বিধানসভার বিশাল ঘাটতি অনেকটাই লোকসভায় মেটাতে পেরেছিল তৃণমূল। ১৩টি ওয়ার্ডের ২৩টি বুথে মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ২১ হাজার। ভোট পড়েছে ৮৭ শতাংশের কিছু বেশি। তৃণমূলের শহর সভাপতি প্রণব দেওঘরিয়ার দাবি, প্রার্থী হাজারি বাউরির হয়ে সব পুর-প্রতিনিধি ও ওয়ার্ডের সব স্তরের নেতা-কর্মীরা দিনরাত এক করে কাজ করেছেন। লোকসভার ঘাটতি মিটিয়ে ‘লিড’ দেবে রঘুনাথপুর শহর। যদিও এখানে তৃণমূলের মধ্যে ‘অন্তর্ঘাতের’ আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিজেপির শহর সভাপতি শান্তনু চট্টোপাধ্যায়ের দাবি, শহরের সনাতনীরা-সহ মহিলা ভোটের বড় অংশের সমর্থন তাঁদের দিকে এসেছে। মূলত অন্নপূর্ণা ভান্ডার ও নারী সুরক্ষায় দলের প্রতিশ্রুতির কারণেই এই পরিবর্তন। রঘুনাথপুরে তাই অভূতপূর্ব ফল হবে।