• প্রত্যাবর্তন না পরিবর্তন? সোম দুপুরের মধ‍্যেই স্পষ্ট হয়ে যাবে আগামী পাঁচ বছর কাদের হাতে পশ্চিমবঙ্গ, নজরে বাকি ৪ রাজ্য
    আনন্দবাজার | ০৪ মে ২০২৬
  • পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছিল গত ১৫ মার্চ। তার পর গত ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল দু’দিন পরীক্ষা দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। সোমবার সেই পরীক্ষার ফলপ্রকাশ। সকাল ৮টা থেকে জেলায় জেলায় শুরু হবে ভোটগণনা। মোটামুটি দুপুরের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যাবে আগামী পাঁচ বছর পশ্চিমবঙ্গ থাকবে কার হাতে। নীলবাড়ি নবান্নের ১৪ তলায় প্রত্যাবর্তন হবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের? নাকি দেড় দশক পরে আবার ‘পরিবর্তন’ দেখবে পশ্চিমবঙ্গ? যে পরিবর্তনের ফলে প্রশাসন আবার নিয়ন্ত্রিত হবে লালদিঘির পাড়ের লালবাড়ি থেকে?

    গত ২৩ এপ্রিল রাজ্যের ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়েছিল। তার পরে দ্বিতীয় দফায় ভোটগ্রহণ হয় দক্ষিণবঙ্গের সাত জেলার ১৪২টি আসনে। ২৯৪টি আসনের ভোটগ্রহণ হয়ে গেলেও সোমবার ভোটগণনা হবে ২৯৩টি কেন্দ্রের। কারণ, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা আসনে নির্বাচনে ‘অনিয়মের অভিযোগে’ গোটা ভোটই বাতিল বলে ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। আগামী ২১ মে ফলতায় নতুন করে ভোটগ্রহণ হবে। ২৪ মে হবে সেই ভোটের গণনা। যখন সেই ভোট হবে, তখন পশ্চিমবঙ্গ পরিচালনা করবে নির্বাচিত নতুন সরকার।

    মোট আসন ২৯৪ থেকে কমে ২৯৩ হয়ে যাওয়ায় সরকার গঠনের জাদুসংখ্যাও একটি কমেছে। সরকার গড়তে হলে আগে পেতে হত ১৪৮টি আসন। এখন পেতে হবে ১৪৭টি।

    প্রথম দফায় যে ভোটগ্রহণ হয়েছিল, তার বেশির ভাগ জেলা বিজেপির ‘শক্ত ঘাঁটি’ বলে পরিচিত। আবার দ্বিতীয় দফায় ভোটগ্রহণ হয়েছিল তৃণমূলের ‘দুর্গ’ বলে পরিচিত দক্ষিণবঙ্গে। কে কার দুর্গে ফাটল ধরাবে বা আদৌ ধরাতে পারল কি না, সোমবার তা বোঝা যাবে। ফলাফল নিয়ে দুই শিবিরই ‘আত্মবিশ্বাসী’। দুই শিবিরের তরফেই দাবি এবং পাল্টা দাবি রয়েছে। দ্বিতীয় দফার ভোট শেষ হতেই বিভিন্ন সংস্থা যে বুথফেরত সমীক্ষা প্রকাশ করেছিল, তার বেশির ভাগেই ইঙ্গিত মিলেছিল রাজ্যে ‘পরিবর্তন’ হতে চলেছে। ক্ষমতায় আসতে চলেছে বিজেপি। পাল্টা তৃণমূল দাবি করেছে, ২০২১ এবং ২০২৪ সালের ভোটেও বুথফেরত সমীক্ষা মেলেনি। এ বারও মিলবে না।

    এসআইআর-এর কারণে এ বার মোট ভোটারের সংখ্যা অনেকটা কমে যাওয়ায় প্রত্যাশিত ভাবেই ভোটদানের হার বেড়েছে। কিন্তু সরল পাটিগণিতের বাইরেও এ বার ভোটদাতার সংখ্যা ২০২১-এর তুলনায় ৩০ লক্ষেরও বেশি। ফলে দু’য়ে মিলিয়ে ভোটদানের হার রেকর্ড গড়ে ফেলেছে। সেই ভোটের অভিমুখ কোন দিকে, তৃণমূলের দিকে থাকা সংখ্যালঘু ভোটের সমর্থনে ফাটল ধরেছে কি না, হিন্দু ভোট ঐক্যবদ্ধ ভাবে বিজেপির দিকে গিয়েছে কি না বা বিপুল সংখ্যক মহিলা ভোট গিয়েছে কোন দিকে, এ নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে নানা বিশ্লেষণ চলেছে। সোমবার দুপুরের পরে স্পষ্ট হয়ে যাবে পশ্চিমবঙ্গ কেমন পরীক্ষা দিয়েছে।

    ২০২৬ সালের ভোটে সবচেয়ে আলোচিত কেন্দ্র ভবানীপুর। যা এ বারের ভোটের ‘নন্দীগ্রাম’ হয়ে উঠেছিল। ২০২১ সালের নির্বাচনে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম শুভেন্দু অধিকারীর লড়াই হয়েছিল। জিতেছিলেন শুভেন্দু। এ বার ভবানীপুরে দু’জনের সম্মুখসমর। তবে নন্দীগ্রামের থেকে ভবানীপুর গুণগত ভাবে এগিয়ে। তার কারণ, পাঁচ বছর আগের লড়াই ছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতার সঙ্গে বিজেপি নেতা শুভেন্দুর লড়াই। কিন্তু ভবানীপুরে লড়াই মুখ্যমন্ত্রী বনাম বিরোধী দলনেতার। যা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে ঘটেনি। সেই কারণেই, সারা রাজ্যের সঙ্গে পৃথক ভাবে সকলের নজর থাকবে দক্ষিণ কলকাতার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের দিকে। সেখানেই হবে ভবানীপুরের ভোটগণনা।

    এ বারের ভোটে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে গোড়া থেকেই আলোচনা ছিল। বস্তুত, ভোট এপ্রিলে হলেও গত নভেম্বর থেকেই এসআইআর-এর মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের ভোট শুরু হয়ে গিয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ের নজিরবিহীন ভোট দেখেছে এই রাজ্য। সেই অর্থে বড় কোনও গোলমাল, বোমাবাজি, বুথদখল, ছাপ্পা, হানাহানি হয়নি। সব পক্ষই মেনে নিয়েছে, মানুষ তাদের ভোট দিয়েছেন। তবে প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষকে ‘বিনা বিচারে’ ভোটের বাইরে রাখা নিয়েও প্রশ্নের মুখে পড়েছে কমিশন।

    ফলাফলের আগে যদিও জনমানসে ভোট পরবর্তী হিংসা নিয়ে উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা রয়েছে। কারণ পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্মৃতিতে এখনও টাটকা ২০২১ সালের ভোট পরবর্তী সন্ত্রাসের রক্তাক্ত স্মৃতি। এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে যুযুধান দুই শিবিরের নেতাদের ধারাবাহিক আগ্রাসী বক্তব্য। বিজেপির তরফে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যেমন হিসাব করার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন প্রচারে, তেমন অমিত শাহ বলেছিলেন, যারা অত্যাচার করেছে, তাদের উল্টো করে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। আবার তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কখনও বলেছেন, রবীন্দ্র সঙ্গীতের সঙ্গে ডিজে বাজবে, কখনও বলেছেন ঝান্ডার সঙ্গে ডান্ডাটাও শক্ত রাখতে হবে।

    যদিও ফলঘোষণার আগের দিন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘‘হিংসার পুনরাবৃত্তিতে প্রতিহিংসা চায় না বিজেপি। এর আগের নির্বাচনগুলির পরে বিজেপি কর্মীরা যে অত‍্যাচারের শিকার হয়েছিলেন, এ বার যেন বিজেপি কর্মীরা তার পাল্টা পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা না করেন।’’ তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেন, ‘‘যাঁরা ভোটের আগে উল্টো করে ঝুলিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন, তাঁরা এখন শান্তি-শান্তি করছেন। তাঁরা ভাবছেন না, এই পৃথিবীতে আইজ্যাক নিউটন নামের এক ভদ্রলোক জন্মেছিলেন। তাঁর একটি সূত্র ছিল। তবে আমরা কোনও হিংসা চাই না। আমরা শান্তি চাই। তৃণমূল আবার ক্ষমতায় এসে সেই শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে।’’ কুণাল যা-ই বলুন, রবিবার তৃণমূলের অনেক নেতার হোয়াটস্অ্যাপ স্টেটাসে দেখা গিয়েছে অভিষেকের ভিডিয়ো। যেখানে তিনি বলছেন, ‘‘৪ তারিখ বিকালের পর থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে হাল্কা করে ডিজে-ও বাজবে।’’ কংগ্রেস নেতা তথা বহরমপুরের প্রার্থী অধীর চৌধুরীর বক্তব্য, ‘‘তৃণমূল অনেক জায়গায় হাঙ্গামা করার চেষ্টা করবে। তাদের কৌশল হবে গণনাপ্রক্রিয়াকে বিচারব্যবস্থার আওতায় নিয়ে যাওয়া। সেটা নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’’ সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘মানুষ নিজেদের মত প্রকাশ করেছেন। যা-ই ফল হোক, রাজ্যে যেন সম্প্রীতি বজায় থাকে, সেটাই সকলের দেখা উচিত।’’

    পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে অসম, তামিলনাড়ু, কেরল এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতেও ভোটগণনা সোমবার। কেরলে বাম সরকারের প্রত্যাবর্তন হবে কি না সেই প্রশ্নে জাতীয় রাজনীতিতে বামেদের অস্তিত্ব জুড়ে রয়েছে। কেরলের রেওয়াজ ভেঙে পর পর দু’বার সেখানে সরকার গড়েছিল সিপিএম নেতৃত্বাধীন এলডিএফ। এ বার একাধিক বুথ ফেরত সমীক্ষা ইঙ্গিত দিয়েছে, কেরলে পরিবর্তন হতে চলেছে। ১০ বছর পরে ক্ষমতায় ফিরতে চলেছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ। বাস্তবে তা-ই হলে গত ৪৯ বছরের মধ্যে এই প্রথম বামহীন হয়ে যাবে ভারতের মানচিত্র। ১৯৭৭-২০২৬— এই ৪৯ বছরে এমন কখনও ঘটেনি। কেরলে ক্ষমতা থেকে বামেদের যাতায়াত চললেও পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরা ধরে রেখেছিল। অসমে হিমন্ত বিশ্বশর্মা বা তামিলনাড়ুতে এমকে স্ট্যালিনের প্রত্যাবর্তন নিয়েও কৌতূহল রয়েছে। তবে এ বার ভোটের আগে থেকে যে আবহ তৈরি হয়েছিল, তাতে পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ফলাফলেই নজর থাকবে গোটা দেশের।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)