• নন্দীগ্রাম না ভবানীপুর? কোন আসন রাখবেন আর কোনটি ছাড়বেন? ‘ভদ্রাসনে’ গিয়ে কী জানালেন শুভেন্দু অধিকারী
    আনন্দবাজার | ০৭ মে ২০২৬
  • ভবানীপুরের বিজেপি প্রার্থী হিসাবে যে দিন তাঁর নামঘোষিত হয়েছিল, জল্পনা সে দিন থেকেই শুরু হয়েছিল। ভবানীপুরে তিনি জিতবেন কি না, তানিয়ে কিছু লোকের সংশয় ছিল। কিন্তু নন্দীগ্রামে যে তিনি জিতবেন, তা নিয়ে নিঃসংশয় ছিলেন সকলে। ফলে নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর, দু’টি কেন্দ্রেই তিনি জিতলে কোন আসনরাখবেন, কোনটি ছেড়ে দেবেন, তা নিয়ে নানা তত্ত্ব উঠে আসছিল।

    শেষ পর্যন্ত দু’টি আসনেই জয়ী হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিদায়ী বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তার দু’দিনের মাথায় নন্দীগ্রামে বিপুল জমায়েতকে সাক্ষী রেখে তিনি জানিয়েছেন, কোন আসনটি তিনি রাখবেন।

    নন্দীগ্রামকে বরাবর নিজের রাজনৈতিক ‘ভদ্রাসন’ বলেনশু ভেন্দু। কারণ, নন্দীগ্রাম আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা তাঁকে নজিরবিহীন রাজনৈতিক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। তা ছাড়াও তাঁর প্রথম বার সাংসদ হওয়াও যে তমলুক থেকে, নন্দীগ্রাম সেই লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, পরবর্তী মন্ত্রিসভায় শুভেন্দুকে শামিল করবেন। তার জন্য সাংসদ শুভেন্দু থেকে বিধায়ক শুভেন্দু হওয়া জরুরি ছিল। শুভেন্দু বিধায়ক হয়েছিলেন সেই নন্দীগ্রাম থেকেই। ২০২১ সালে ধুন্ধুমার নির্বাচনে দ্বিতীয় বারের জন্য নন্দীগ্রামের বিধায়ক হয়েছিলেন শুভেন্দু। তা-ও আবার স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে হারিয়ে। এ হেন জনপদকে তিনি যে নিজের রাজনৈতিক ‘ভদ্রাসন’বলবেন, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি স্মরণীয় তারিখে শুভেন্দু নন্দীগ্রামে যান। যে কোনও ধর্মীয় উৎসব-অনুষ্ঠানের দিনে শুভেন্দু নন্দীগ্রাম স্পর্শ করে আসেন। সারা দিন তুমুল ব্যস্ততা থাকলে রাতে যান।

    কিন্তু শুভেন্দু এ বার ঈষৎ দোটানায়। নন্দীগ্রাম তৃতীয় বারের জন্য তাঁকে জেতাল। আর ভবানীপুরে প্রথম বার লড়লেন এবং জিতলেন। পূর্ব মেদিনীপুরের শুভেন্দু কলকাতায় এসে মমতার নিজের পাড়ায় গিয়ে মমতাকে হারিয়ে দিচ্ছেন — এ ছবি খুব সাধারণ নয়। শুভেন্দু নিজেও সম্ভবত সে কথা সবচেয়ে ভাল বুঝেছেন। তাই বারবার ভবানীপুরবাসীকে ‘ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা’ জানাচ্ছেন। ‘ঘরের মেয়ে’ বা ‘পাড়ার মেয়ে’কে প্রত্যাখ্যান করে ভবানীপুরের জনতা যে ভাবে ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটে তাঁকে জিতিয়েছেন, তা-ও শুভেন্দুর কাছে মহা মূল্যবান।

    সেই কারণেই দোটানায় শুভেন্দু। ১০ দিনের মধ্যে তাঁকে দু’টি আসনের যে কোনও একটি থেকে পদত্যাগ করতে হবে। কোনটি থেকে পদত্যাগ করবেন, কোনটির বিধায়ক রয়ে যাবেন, সে সিদ্ধান্ত কিসের ভিত্তিতে হবে, নিজের রাজনৈতিক ‘ভদ্রাসনে’ দাঁড়িয়েই বুধবার শুভেন্দু সে কথা জানালেন। শুভেন্দুর কথায়, ‘‘আমার দলের কেন্দ্রীয় নেতারা যেটা ঠিক করবেন, সেটাই হবে। আমার মতামত যা-ই হোক, সেখানেই জানাব।’’ তিনি বলেন, ‘‘আমি ভবানীপুর এবং নন্দীগ্রাম দুজনকেই বলছি, আমি আমার কর্তব্য থেকে কিন্তু সরে যাব না। দু’টি কেন্দ্রের জন্যই আমার কর্তব্য আমি করব। বাকিটা আমার হাতে নয়।’’

    বুধবার সকালে শুভেন্দু নন্দীগ্রামের রেয়াপাড়া, হরিপুর-সহ একাধিক এলাকায় যান। সর্বত্রই বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের বড় জমায়েত ছিল। শুভেন্দুকে তাঁরা অভ্যর্থনা জানান। সেখানে শুভেন্দু নাতিদীর্ঘ ভাষণও দেন। সেই ভাষণেই স্পষ্ট করেন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাঁকে যে আসন রাখতে বলবেন, সেটিই তিনি রাখবেন। অন্যটি থেকে পদত্যাগ করবেন। তবে ‘কর্তব্য থেকে সরে যাব না’ বলে মন্তব্য করে শুভেন্দু বুঝিয়ে দিয়েছেন, আনুষ্ঠানিক ভাবে যে আসনের বিধায়কই থাকুন, কার্যক্ষেত্রে দু’টি আসনের জন্যই তিনি বিধায়কের দায়িত্ব এবং কর্তব্য পালন করবেন।

    নন্দীগ্রামে জমায়েত অবশ্য দাবি তুলেছে, শুভেন্দুকে নন্দীগ্রামেই থাকতে হবে। তাঁর ভাষণ চলাকালীনই বেশ কিছু কর্মী-সমর্থক ‘নন্দীগ্রাম-নন্দীগ্রাম’ বলতে থাকেন। কেউ কেউ বলেন, ‘‘আমাদের ছেড়ে যাবেন না।’’ শুভেন্দু অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার কথা কর্মী-সমর্থকদের মনে করান। শৃঙ্খলাপরায়ণ কর্মী হিসাবেই যে নিজের আসনের বিষয়ে তাঁকে নেতৃত্বের কথা মেনে নিতে হবে, সে বার্তাও দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, ‘‘আমি ছোটবেলা থেকে খুব শৃঙ্খলাপরায়ণ। সবটা একা সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। আমি আপনাদের ঋণ শোধ করব। আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন।’’
  • Link to this news (আনন্দবাজার)